ঘুষের চক্রে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী

বিস্ফোরক অভিযোগ সি বি আই অফিসারের

ঘুষের চক্রে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী
+

নয়াদিল্লি, ১৯শে নভেম্বর- সি বি আই-র অন্তর্বিরোধকে ঘিরে বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়ে গেল উচ্চপদস্থ এক অফিসারের আদালতে আবেদনকে ঘিরে। তদন্ত সংস্থার ডি আই জি পদমর্যাদার এই অফিসার সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন জমা দিয়ে দাবি করেছেন কেন্দ্রের কয়লা ও খনি মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী হরিভাই পারথিভাই চৌধুরি মাংস ব্যবসায়ী মঈন কুরেশি মামলায় কয়েক কোটি টাকার উৎকোচ নিয়েছেন বলে তদন্ত সংস্থার কাছে অভিযোগ এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত গুজরাট থেকে সাংসদ হওয়া এই মন্ত্রীকে তদন্ত ধামাচাপা দেবার জন্য ঘুষ দেওয়া হয়েছে মধ্যস্থতাকারী মারফত। অক্টোবরে সি বি আই-এ মধ্যরাতের রদবদলে বদলি হওয়া অফিসার মণীশ সিনহার আরও অভিযোগ সি বি আই-র বিশেষ অধিকর্তা রাকেশ আস্থানার বিরুদ্ধে তদন্তে বাধা দিয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। বারংবার দোভাল আস্থানার বিরুদ্ধে তল্লাশি এবং নথিপত্র উদ্ধারে বাধা দিয়েছেন। এমনকি কুরেশি মামলায় ধৃত দুই ভাইয়ের সঙ্গে দোভালের যোগাযোগ ছিল। সিনহা যে বয়ান দিয়েছেন সেখানে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরও জড়িয়ে গেছে। 
বাধ্যতামূলক ছুটিতে যাওয়া সি বি আই-র অধিকর্তা অলোক ভার্মা এবং বিশেষ অধিকর্তা রাকেশ আস্থানা পরস্পরের বিরুদ্ধে উৎকোচ গ্রহণ এবং তদন্তে বাধা দেবার অভিযোগ করেছেন। আস্থানার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্তে জল গড়াচ্ছে দেখেই তাঁকে সরানো হয়েছে বলে ভার্মার অভিযোগ। ২৩শে অক্টোবর মাঝরাতে সি বি আই-এ বড় আকারের রদবদল এবং নতুন অধিকর্তা নিয়োগের পরে একাধিক মামলা এসেছে সুপ্রিম কোর্টে। ভার্মাও তাঁকে কার্যত অপসারণের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। আবার, ভার্মার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ভিজিল্যান্স কমিশনের তদন্ত রিপোর্ট জমা পড়েছে আদালতেরই নজরদারিতে। শীর্ষ আদালতের নির্দেশ মেনে ভার্মা মুখবন্ধ খামে সেই রিপোর্ট সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যও জমা দিয়েছেন সোমবার।
এই বিতর্কে যুক্ত হয়েছে সোমবার ডি আই জি সিনহার আবেদন। শীর্ষ আদালতে এদিন জরুরি শুনানির আরজি জানিয়ে সিনহার আইনজীবী বলেন, হতবাক করে দেবার মতো নথিপত্র আমাদের হাতে আছে। প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ অবশ্য বলেন, আমরা কোনো কিছুতেই হতবাক হচ্ছি না। ভার্মার মামলা আগে শোনা হোক, তারপর বিবেচনা করা যাবে। সিনহা বর্তমানে নাগপুরে ডি আই জি পদে কর্মরত। সিনহা নীরব মোদী এবং মেহুল চেকসির বিরুদ্ধে মামলারও তদন্তকারী অফিসার ছিলেন। 
পিটিশনে যা বলা আছে তা চাঞ্চল্যকর বটেই। উৎকোচ-তোলা সংগ্রহ- রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো- অপরাধে অভিযুক্তদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের স্তম্ভিত করার মতো ছবিই তুলে ধরা হয়েছে সেই বয়ানে। 
সিনহা বলেছেন, মাংস ব্যবসায়ী মঈন কুরেশি মামলায় অভিযুক্ত দুই ভাই মনোজ প্রসাদ এবং সোমেশ প্রসাদের সঙ্গে এন এস এ অজিত দোভালের যোগাযোগ আছে। গ্রেপ্তারের পরে মনোজ প্রসাদ দাবি করেছিল, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে সি বি আই অফিসারদের ‘শেষ করে দেবার’ ক্ষমতা তাদের আছে। দোভালের হয়ে ‘ব্যক্তিগত কাজ’ তারা করে দিয়েছে। তাঁদের বাবা এবং গুপ্তচর সংস্থা ‘র’-এর প্রাক্তন যুগ্ম সচিব দীনেশ্বর প্রসাদ দোভালের ঘনিষ্ঠ। ‘র’-এর বিশেষ সচিব সামন্ত গোয়েলের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের কথাও জানা যায়। পরবর্তীকালে এই সামন্ত গোয়েলের টেলিফোনে কথাবার্তাও সি বি আই রেকর্ড করেছে। তাতে তিনি দাবি করছেন, এই মামলা বেশিদূর গড়াবে না। ‘প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর’ স্তরে সবকিছু ঠিকঠাক করা হয়ে গেছে। এই কথাবার্তার পরপরই ২৩শে অক্টোবর মধ্যরাতে সি বি ‌আই-এ পরিবর্তন হয়ে যায়। এই বয়ান, নথিপত্র ও টেলিফোনে কথাবার্তার সমস্ত তথ্যই সংরক্ষিত রয়েছে বলে সিনহা দাবি করেছেন। 
সিনহা আবেদনে বলেছেন, রাকেশ আস্থানার বিরুদ্ধে উৎকোচ নেবার অপরাধে এফ আই আর দায়ের করা হয় ১৫ই অক্টোবর। সি বি আই অধিকর্তা ভার্মা অজিত দোভালকে তা জানান ১৭ই অক্টোবর। ওই রাতেই দোভাল আস্থানাকে এফ আই আর-র কথা জনিয়ে দেন। এই তদন্তের তদন্তকারী অফিসার এ কে বস্সি আস্থানার মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করা এবং তল্লাশি চালানোর অনুমতি চান। কিন্তু ভার্মা সেই অনুমতি দেননি। ভার্মা বলেন, এন এস এ এই অনুমতি দিচ্ছেন না। ২০শে অক্টেবর সি বি আই-র ডেপুটি এস পি দেবেন্দর কুমারের বাড়িতে তল্লাশি চলে। ভার্মা সেই তল্লাশি থামিয়ে দেন। জিজ্ঞাসা করা হলে তদানীন্তন সি বি আই অধিকর্তা জানান, দোভালের কাছ থেকে নির্দেশ এসেছে। উল্লেখ্য, সি বি আই-র অধিকর্তা হিসাবে ২৩শে অক্টোবর মাঝরাতে দায়িত্ব নেবার পরেই নতুন অধিকর্তা নাগেশ্বর রাও বস্সিকে আন্দামানে বদলি করে দেন। তার আগেই অবশ্য দেবেন্দর কুমার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।  
মঈন কুরেশি মামলায় উৎকোচ দেবার ঘটনায় অভিযোগ উঠেছে হায়দরাবাদের ব্যবসায়ী সতীশ সানার বিরুদ্ধে। বস্তুত তাঁকে জেরার সময়েই আস্থানার উৎকোচ নেবার তথ্য সামনে এসেছে বলে প্রকাশিত হয়েছে। সানা নিজেও সে কথা আদালতকে জানিয়েছেন। বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা এই সানাকে জেরার সূত্রেই এসেছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর নামও। সিনহা আবেদনে জানিয়েছেন, ২০শে অক্টোবর সানা জেরায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরিভাই পারথিভাই চৌধুরির নাম বলেন। সানা জানান ২০১৮-র জুনের শুরুর প্রথমার্ধে মন্ত্রীকে কয়েক কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। কয়লা প্রতিমন্ত্রী চৌধুরিকে আমেদাবাদের জনৈক বিপুলের মাধ্যমে টাকা দেওয়া হয়। মামলা তুলে নেবার জন্য কর্মী কৃত্যক দপ্তরের মন্ত্রীর দপ্তরের মাধ্যমে সি বি আই অফিসারদের প্রভাবিত করেন চৌধুরি। এই দপ্তরের কাছেই আনুষ্ঠানিক ভাবে সি বি আই অধিকর্তা দায়বদ্ধ। সিনহা দাবি করেছেন, এই তথ্য জানার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ভার্মা ও তদানীন্তন অতিরিক্ত অধিকর্তা এ কে শর্মাকে জানিয়েছিলেন। 
সিনহার অভিযোগ তালিকায় রয়েছে কেন্দ্রীয় ভিজিল্যান্স কমিশনার কে ভি চৌধুরির নামও। তাঁর অভিযোগ, সানা আগেও চৌধুরির এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের সঙ্গে চৌধুরির সঙ্গে দেখা করেছিলেন। কুরেশি মামলা নিয়েই কথা হয়েছিল। রাকেশ আস্থানাকে ডেকে চৌধুরি সানার মামলা নিয়ে জানতেও চান। 
সুপ্রিম কোর্টে শুনানি চলাকালীনও সানার বয়ান বদলের চেষ্টা হচ্ছে বলে সিনহা অভিযোগ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্রের আইন সচিব সুরেশচন্দ্র সানার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন ৮ই নভেম্বর। তিনি ক্যাবিনেট সচিবের নাম করে বলেছেন ভারত সরকার তাঁকে সুরক্ষা দেবে। পরে, এদিনই সংবাদ সংস্থাকে চন্দ্র বলেছেন, এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য। ক্যাবিনেট সচিবের কাছ থেকে কোনও নির্দেশ পাইনি, সানাকে আমি চিনিও না। 
মাংস ব্যবসায়ী মঈন কুরেশি বিপুল অঙ্কের টাকার বেআইনি পাচারে অভিযুক্ত। এই মামলাতেই জড়িয়েছে সতীশ সানার নাম। উভয়েই মামলা থেকে নিষ্কৃতি পেতে উৎকোচ দিয়েছেন বলে অভিযোগ। 
এদিন সি বি আই অফিসারের আবেদনে সরকারের শীর্ষস্তর সম্পর্কে অভিযোগ ওঠার পরে সি পি আই (এম)-র সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি বলেছেন, একমাত্র সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে পূর্ণাঙ্গ তদন্তই সত্য উদঘাটন করতে পারে। কংগ্রেসও স্বাধীন তদন্ত দাবি করে বলেছে, দুর্নীতিগ্রস্তদের রক্ষা করছে কারা? তারা কি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে বসে আছে?  
 

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement