১৮লক্ষ কৃষককে বিমার
বাইরে ছিটকে দিল
মমতা সরকার!

১৮লক্ষ কৃষককে বিমার<br>বাইরে ছিটকে দিল<br>মমতা সরকার!
+

নিজস্ব প্রতিনিধি: কলকাতা, ১১ই সেপ্টেম্বর — মহাজন, সুদের কারবারিদের জন্য সুখবর! রাজ্যে ফসল বিমার আওতা থেকে বিরাট অংশের কৃষক বাদ পড়েছেন। 
বিমার ক্ষেত্রে দুধরনের কৃষক হন। ‘লোনি’ এবং ‘নন-লোনি’। যাঁরা ব্যাঙ্ক, সমবায় থেকে ঋণ নিয়ে চাষ করেন, সরকারি পরিভাষায় তাঁরা ‘লোনি’ কৃষক। অন্যদিকে যাঁরা ব্যাঙ্ক, সমবায় থেকে ঋণ নেন না, তাঁরা মূলত মহাজন সুদের কারবারিদের উপর নির্ভরশীল। এই ধরনের কৃষকরা ‘নন-লোনি ফার্মার’। ‘লোনি’ কৃষকরা স্বভাবতই ফসল বিমা যোজনার আওতায় আসেন। ২০১৬-তে আগের বিমা প্রকল্পগুলি সরিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার চালু করে ‘প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা’। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তারই নাম করে ফেলেন — ‘বাংলা ফসল বিমা যোজনা।’ 
নাম যাই হোক, বিষয়টি একই। কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রকের ঘোষণার অনুসারে, যাঁরা ‘নন-লোনি’ কৃষক, তাঁরাও এই ফসল বিমা যোজনার আওতায় থাকতে পারেন। বি ডি ও অফিস থেকে তাঁদের জন্যও ফরম বিলি হয়। ফরম পূরণ করে আবেদন করতে হয় ফসল বিমা যোজনার জন্য। 
গত ৩১শে জুলাই পশ্চিমবঙ্গে খরিফ মরশুমে ফসল বিমার জন্য আবেদনের শেষদিন ছিল। রাজ্য সরকারের কৃষিদপ্তর ব্যাঙ্ক, বিমা সংস্থাগুলির সঙ্গে আলোচনা শেষ হওয়ার পর গত ৩১শে আগস্ট এবারের খরিফ মরশুমে কত কৃষক বিমার আওতায় এলেন, তার তালিকা চূড়ান্ত করে। রাজ্যের কৃষিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবারের খরিফ মরশুমে ১৪লক্ষ ৫১ হাজার ৯৪০ জন ‘লোনি’ কৃষক ফসল বিমা যোজনার আওতায় এসেছেন। আর ‘নন-লোনি’ কৃষক? রাজ্য সরকার জানিয়েছে, ফসল বিমা যোজনায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া ‘নন-লোনি’ কৃষকের সংখ্যা ২৪৫৭জন! 
দুবছর আগে রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার দাবি করেছিল, খরিফ মরশুমে রাজ্যের ১৫লক্ষ ৮ হাজার ‘নন-লোনি’ কৃষক এই বিমার আওতায় এসেছেন। অর্থাৎ, দুবছরে ফসল বিমা যোজনা থেকে ছিটকে গেছেন ৯৯.৮৪ শতাংশ নন-লোনি কৃষক। 
নিঃসন্দেহে রেকর্ড।
শুধু নন-লোনি কৃষকরাই বাদ পড়েছেন বিমার সুরক্ষা থেকে, তা নয়। রাজ্যের কৃষিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬-তে বিমার আওতায় ছিলেন রাজ্যের ১৭লক্ষ ২৮ হাজার কৃষক। ২০১৭-তে তা কমে যায়। সে বছর বিমার আওতায় ছিলেন ১৫লক্ষ ২৩ হাজার ৫৩৯জন। আর চলতি বছরে তা দাঁড়িয়েছে ১৪লক্ষ ৫১হাজার ৯৪০। লাগাতার কমছেন বিমা সুরক্ষার আওতায় থাকা কৃষক।
রাজ্যের কৃষিদপ্তরের এক অফিসারের কথায়,‘‘রাজ্যে বেশিরভাগ কৃষক নন-লোনি। এরা গ্রাম, মফঃস্বলের মহাজন, সুদের কারবারিদের সহজ শিকার। চড়া হারে টাকা ধার দেয় এই সুদের কারবারিরা। কৃষকদের এই মহাজনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এই নন-লোনিদের বিমার আওতায় আনা জরুরি।’’ মহাজনের থেকে টাকাই শুধু ধার করেন নন-লোনি কৃষক, তা নয়। সার, বীজসহ নানা কৃষি উপকরণ কেনার দোকানেও তাঁরা ধারে জিনিস কেনেন। বিমার আওতায় থাকলে তাঁদের সুরক্ষা নিশ্চিত হয়।
লোনি এবং নন লোনি মিলিয়ে ২০১৬-তে বিমার অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন ৩২লক্ষ ৩৬ হাজার কৃষক। এবার তা ১৪ লক্ষ ৫৪ হাজার ৩৯৭। দুবছর সময় নিলেন মমতা ব্যানার্জি। বাদ পড়লেন অর্ধেকের বেশি কৃষক।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ পুরো উলটো পথে চলেছে — কৃষকের সর্বনাশ, সুদখোর মহাজনের পৌষমাস।
গত দুবছরে ফসল বিমা যোজনা থেকে রাজ্যের কৃষকদের বিশেষ কোনও লাভ হয়েছে — তা রাজ্যের কৃষিদপ্তরের অফিসাররাও মনে করছেন না। কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রকের রিপোর্ট অনুসারে প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনায় এখনও পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের কৃষকরা ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন ৩০৫ কোটি ৮৯লক্ষ ২২ হাজার টাকা। প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা শুরু হয়েছে ২০১৬-র মার্চে। অর্থাৎ দুবছরে কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকার মিলে ক্ষতিপূরণ দিয়েছে ওই টাকা। পেয়েছেন ৫লক্ষ ১৩ হাজার ৮৪০জন কৃষক। তাঁদের সিংহভাগই ‘লোনি’। অর্থাৎ দুবছরে বিমা থেকে ওই কৃষকরা গড়ে ৫৯৫৩ টাকা করে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন।
এই অবস্থা বিমার। তার মধ্যে রাজ্য সরকারের ব্যর্থতায় বিমার আওতা থেকে ছিটকে যাচ্ছেন বিরাট ফসল বিমা যোজনায়। 
প্রসঙ্গত, বিমার আওতার বাইরেই যে পড়ে আছে রাজ্যের প্রায় আশিভাগ শস্য, তা ড. কে এল প্রসাদের সাম্প্রতিক নথিতেও স্পষ্ট হয়েছে। গত জুনেই কেন্দ্রীয় সরকারের সিনিয়র অর্থনৈতিক এবং পরিসংখ্যান উপদেষ্টা ড. কে এল প্রসাদ ওই রিপোর্ট পেশ করেন। তা নবান্নে পাঠানো হয়েছে। সেই রিপোর্ট বলছে — রাজ্যে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ৯৬লক্ষ ৯০ হাজার হেক্টর। তারমধ্যে ২০লক্ষ ২৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল বিমার আওতায় আছে। অর্থাৎ প্রায় ৭৯ ভাগ জমির ফসলের কোনও সুরক্ষাই নেই।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement