দীক্ষান্ত ভাষণ, উপাচার্য ছাড়াই
নন্দনে সমাবর্তন প্রেসিডেন্সির

দীক্ষান্ত ভাষণ, উপাচার্য ছাড়াই<br>নন্দনে সমাবর্তন প্রেসিডেন্সির
+

নিজস্ব প্রতিনিধি : কলকাতা, ১১ই সেপ্টেম্বর— বেনজির সমাবর্তন। দীক্ষান্ত ভাষণ নেই। আচার্য নেই, পড়ুয়া নেই। ক্যাম্পাস থেকে দূরে নন্দন প্রেক্ষাগৃহে গুটিকয়েক শিক্ষক, অতিথিদের নিয়ে হয়ে গেল ঐতিহ্যবাহী প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম কা ওয়াস্তে সমাবর্তন। 
হিন্দু হস্টেলের দাবিতে প্রেসিডেন্সির পড়ুয়ারা টানা ৪০দিন অবস্থান চালাচ্ছে। গতকাল প্রেসিডেন্সির গেটে পড়ুয়ারা তালা লাগিয়ে দেওয়ায় উপাচার্য, রেজিস্ট্রারসহ কোনও আধিকারিক ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারেননি। তাতে সমাবর্তন নন্দনে করার সিদ্ধান্ত নেয় প্রেসিডেন্সি কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার নন্দন-৩ প্রেক্ষাগৃহের ছোট্ট পরিসরে গুটিকয়েক অতিথিদের মাঝে অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে ডি লিট ও বিজ্ঞানী সি এন আর রাওকে ডি এস সি সম্মান জানায় প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সমাবর্তনে কেন আচার্য এলেন না তা নিয়ে পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে উপাচার্য অনুরাধা লোহিয়া জানিয়েছেন, গতকাল সন্ধ্যা সাতটার পর রাজ্যপাল আমাকে জানান, কোনও সরকারি জায়গায় সমাবর্তন করলে ভালো হয়। তারপর আমরা তথ্য সংস্কৃতিদপ্তর মারফত এই নন্দন-৩ পাই। তাছাড়া রাজ্যপাল জানিয়েছিলেন, এই শেষ মুহূর্তে আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া ওঁর শরীর ভালো নয়, সেকথাও বলেছিলেন রাজ্যপাল।’
প্রেসিডেন্সি ক্যাম্পাসে পড়ুয়াদের আন্দোলন প্রসঙ্গে এদিন অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘এ ব্যাপারটা পড়ুয়া ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে মেটাতে হবে।’ এদিকে হিন্দু হস্টেলে থাকা পড়ুয়াদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন উপাচার্য অনুরাধা লোহিয়া। উপাচার্য বলেছেন, ‘পড়ুয়াদের মনে রাখা উচিত তারা হিন্দু হস্টেলে থাকতে আসেনি, প্রেসিডেন্সিতে পড়তে এসেছে। হস্টেলে থাকা তাদের অধিকারের মধ্যে পড়ে না, প্রেসিডেন্সিতে পড়ার জন্য সুবিধা হিসাবে পড়ুয়ারা হিন্দু হস্টেলে থাকতে পারে।’ এদিকে ক্যাম্পাসের মধ্যে সমাবর্তন না করার দায় পড়ুয়াদের ওপর চাপিয়েছেন উপাচার্য। ক্যাম্পাসের মধ্যে সমাবর্তন করা গেল না তা নিয়ে উপাচার্যকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছেন, ‘যারা আমাদের ঢুকতে দেয়নি, এই দায় তাদের।’
এ নিয়ে আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের প্রশ্ন করা হলে তাঁদের বক্তব্য, উনি আমাদের ওপর দায় চাপিয়ে নিজের দায় এড়াতে পারেন না। কেন তিন বছরের মধ্যে হিন্দু হস্টেলের মেরামতের কাজ শেষ হলো না? কাজ না করার জন্য কেন তিনবার টাকা ফেরত চলে গিয়েছে? হিন্দু হস্টেলের কাজ শুরু করার সময় উপাচার্য বলেছিলেন ছয় মাসের মধ্যে হস্টেল ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তিন বছর হয়ে গেল? কবে হস্টেল ফেরত দেওয়া হবে উপাচার্য কেন বলতে পারছেন না? হিন্দু হস্টেলের দুটি বিল্ডিং-এর কাজ শেষ হয়ে গেছে। কেন সেগুলিতে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না?
থাকার সবুজ সংকেত পূর্তদপ্তর থেকে না আসা পর্যন্ত পড়ুয়াদের হস্টেল যে ফিরিয়ে দেওয়া হবে না, সেকথা এদিনও জানিয়েছেন উপাচার্য। তিনি বলেছেন, সবকিছুর জন্য একটা সময় লাগে। কোনও জাদুদণ্ড নেই যে তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। রাজারহাটে বিকল্প হস্টেলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাসেরও ব্যবস্থা করা হয়। তা সত্ত্বেও সেখানে যাবে না পড়ুয়ারা। হিন্দু হস্টেলেই থাকতে হবে পড়ুয়াদের? গঠনমূলকভাবে কেন পড়ুয়ারা ভাববে না? এদিন নন্দনে সমাবর্তনের পর প্রেসিডেন্সি ক্যাম্পাসে যান উপাচার্য। যে পড়ুয়াদের হাতে এদিন ডিগ্রি তুলে দেওয়া গেল না তাদের সঙ্গে উপাচার্য কথা বলেন। ২০মিনিট সেখানে থেকে ক্যাম্পাস থেকে বেড়িয়ে যান উপাচার্য।
তিন বছর আগে হিন্দু হস্টেলের সংস্কারের কাজে হাত দেয় পূর্তদপ্তর। তিন বছর হয়ে গেলেও এখনও সেই সংস্কার শেষ হয়নি। চলতি বছরের জুলাই মাসে হস্টেল আবাসিকদের নবরূপে হিন্দু হস্টেল ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু, জুলাই মাসে হস্টেল ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয় বলে জুলাই মাসে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়ে দেয় প্রেসিডেন্সি কর্তৃপক্ষ। হস্টেল ফেরাতে আরও ছয় মাস সময় লাগবে বলে আবাসিকদের জানানো হয়। এরপরই হিন্দু হস্টেল ফেরানোর দাবিতে ক্যাম্পাসের মধ্যেই অনড় অবস্থান শুরু করেন প্রেসিডেন্সির পড়ুয়ারা। টানা এক মাস ধরে সেই অবস্থান এখনও চলছে ক্যাম্পাসের মধ্যে। এরমধ্যে কয়েকদিন আগে কয়েকজন পড়ুয়া অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু এবার তাদের অবস্থা আরও বেশি গুরুতর। ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড-এর মতো রোগ জেঁকে বসেছে পড়ুয়াদের শরীরে। অসুস্থ হয়ে অনেকে এখনও বাড়িতে রয়েছে। টানা চল্লিশ দিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেই স্নান, খাওয়া-দাওয়া করছে আন্দোলনরত পড়ুয়ারা। রাতে তারা বিছানা-বালিশ নিয়ে ওখানেই ঘুমাচ্ছে। ক্যাম্পাসের মধ্যে হিন্দু হস্টেল না পাওয়া পর্যন্ত এভাবেই আন্দোলন চলবে বলে এদিনও সাফ জানিয়ে দিয়েছে আন্দোলনকারী পড়ুয়ারা।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement