খবর পাচার,
ইঞ্জিনিয়ারদের হুমকি দিলেন পূর্তমন্ত্রী

খবর পাচার,<br>ইঞ্জিনিয়ারদের হুমকি দিলেন পূর্তমন্ত্রী
+

নিজস্ব প্রতিনিধি : কলকাতা, ১১ই সেপ্টেম্বর— সেতু রক্ষা নয়। গাফিলতির খবর রুখতে ব্যস্ত থাকলো নবান্ন।
মাঝেরহাট সেতু দুর্ঘটনার পর সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে একের পর এক গাফিলতির খবর সামনে এসেছে। টেন্ডার হওয়ার পর কাজ না হওয়া থেকে সেতু রক্ষণাবেক্ষনে নজরদারির অভাবের কথাও সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
মাঝেরহাট ভাঙার এক সপ্তাহ পার হয়েছে। মঙ্গলবার নবান্ন সভাঘরে পূর্ত দপ্তরের সমস্ত স্তরের প্রায় সাড়ে তিনশো ইঞ্জিনিয়ার, আধিকারিদের উদ্দেশ্যে খবর পাচার করার অভিযোগ করেন পূর্তমন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। অভিযোগ করেই থামেননি পূর্তমন্ত্রী। সি আই ডি-কে দিয়ে তদন্ত করার হুমকি দেন মন্ত্রী।
নবান্ন সভাঘরে আধিকারিক ও ইঞ্জিনিয়ারদের সামনে অরূপ বিশ্বাস বলেন,‘আমাদের দপ্তরে বেশ কিছু মীরজাফর আছে। তারা খবর বাইরে দিয়ে দিচ্ছে। তাদের চিহ্নিত করার জন্য সি আই ডি-কে দিয়ে তদন্ত করাব।’ মন্ত্রীর কাছ থেকে এহেন ‘ক্লোজড ডোর’ সভায় হুমকির পর ঘরভর্তি শীর্ষ ইঞ্জিনিয়ার ও আধিকারিকদের মধ্যে তীব্র অপমানবোধ ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেরই চোখ মুখ লজ্জায় লাল হয়ে যায়। এমনকি সভা শেষ হওয়ার পর এর রেশ থেকে যায়। নিজেদের মধ্যে কার্যত কোনো বাক্য বিনিময় না করেই সভা ছাড়েন আধিকারিক ও ইঞ্জিনিয়ারররা। 
মাঝেরহাট সেতু ভাঙার পর খোদ মমতা ব্যানার্জি নবান্নে স্বীকার করেছিলেন তিনি সেতুর এই ভয়াবহ হালের খবর জানতেন না। নবান্নে সেতু নিয়ে বৈঠকের পর মমতা ব্যানার্জি স্বীকার করেছিলেন মাঝেরহাট সেতুর বিপর্যয়ের পরই তিনি জানতে পারেন রাজ্যের ২০টি সেতুর মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। তাঁর কথায়,‘ঘটনাটা ঘটেছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। এক বছর পর এখন আমি জানতে পারছি, ২০টি সেতুর এক্সপ্যারি ডেট পেরিয়ে গেছে।’ মুখ্যমন্ত্রীর এই স্বীকারোক্তিতে প্রশ্ন উঠেছিলো সরকারের প্রশাসনিক বৈঠকের কার্যকারিতা নিয়ে। আবার অনেকে মনে করেন, সেতু বিপর্যয়ের দায় নিজের মাথা থেকে সরাতে পূর্ত দপ্তরের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার জন্য মমতা ব্যানার্জির নিজের না জানার কথা সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন। কিন্তু এদিন দপ্তরের পর্যালোচনা বৈঠকে যে ভাষায় খবর পাচারের জন্য সি আই ডি-কে দিয়ে তদন্ত করার হুমকি দিয়েছেন অরূপ বিশ্বাস তাতে সব অংশের ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়েছে। তাদের অনেকের বক্তব্য,‘ সংবাদ মাধ্যমে খবর দেওয়া আমাদের কাজ নয়। কিন্তু তারপরও যদি খবর বাইরে যায় তার জন্য বিভাগীয় তদন্তসহ অনেক ব্যবস্থা আছে। পুলিশ, সি আই ডি-কে ব্যবহার হুমকি দেওয়া কেন? এতে কাজের পরিবেশ নষ্ট হবে। বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে।’ 
এদিন নবান্ন সভাঘরে পূর্ত দপ্তরের পূর্ব নির্ধারিত পর্যালোচনা বৈঠক ছিলো। রাজ্যের সব জেলা থেকে এক্সিকিউটিভ ইঞ্জনিয়ার, সুপারিন্টেন্ডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার, চিফ ইঞ্জিনিয়ার মিলিয়ে প্রায় ৩৫০জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। পর্যালোচনা বৈঠক হলেও মাঝেরহাট কান্ডের পর সেতু সম্পর্কিত বিষয়টি আলোচনার সামনে চলে আসে। 
কিন্তু সেই আলোচনাতেও সেতু দুর্ঘটনায় দায় এড়ালো সরকার। সেতু ভাঙলে এবার কোপ পড়বে ইঞ্জিনিয়ারদের ওপর বলে বৈঠকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে পরিস্কার করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এবার থেকে রাজ্যে কোনো সেতু বিপর্যয় হলে তার দায় পুরোপুরি বর্তাবে সংশ্লিষ্ট সেতুর দায়িত্বে থাকা এক্সিকিউটিভ ইঞ্জনিয়ার, সুপারিন্টেন্ডেন্ট ইঞ্জিনিয়ারদের। 
বৈঠকে দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত হয়েছে, টেন্ডার সহ অন্যান্য কোনো কাজের জন্য দেরি হওয়া আর বরদাস্ত করা হবে না। আগে সেতু নির্মাণের আগে প্রযুক্তিগতভাবে তা সম্ভব কী না ও প্রশাসিনক বাস্তবতা বিচার করার জন্য ফাইল নিচ থেকে তৈরি করে নবান্নে অর্থ দপ্তরে পাঠাতে হতো। এদিন জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এবার থেকে যে কোনো সেতু নির্মাণের জন্য পূর্ত দপ্তরের সাউথ জোন, নর্থ জোন ও ওয়েস্ট জোনের চিফ ইঞ্জিনিয়ারদের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তাঁরাই সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করে দেওয়ার পর অর্থ দপ্তরের অনুমোদনের জন্য পাঠাতে হবে। 
সরকার এই সিদ্ধান্ত নিতে পারলো তার কারণ, মাঝেরহাটের সেতু দুর্ঘটনার পর প্রকাশ্যে এসেছিলো ছয়টি টেন্ডার হওয়ার পর মাঝেরহাট ব্রিজের কাজ শুরু করা যায়নি। সরকারের এই গাফিলতি সংবাদমাধ্যমে আসার পরদিনই অর্থ দপ্তর ২কোটি ৮১লক্ষ টাকা মাঝেরহাট সেতুর জন্য ছেড়ে দেয় অর্থ দপ্তর। তখন অবশ্য সেতু ভেঙে কুপোকাত। 
এদিন সেতু রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে গাইড লাইন দিয়ে দেওয়া হয়েছে পূর্ত দপ্তরের ইঞ্জিনিয়ারদের। সেই গাইড লাইনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভঙ্গুর অবস্থায় থাকা সমস্ত ছোটো বড় সেতুর পরিস্থিতি এখনই যাচাই করে সেই সেতুর মেরামতির কাজ করতে হবে জরুরী ভিত্তিতে। এই কাজের জন্য কোনোরকম গাফিলতি হলে দায় থাকবে জোনাল চিফ ইঞ্জিনিয়ার, ইক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার ও সুপারিন্টেন্ডেন্ট ইঞ্জিনিয়ারদের ওপর।
নিয়ম মেনে সেতুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার জন্য দপ্তরের পাশাপাশি এজেন্সিকে নিয়োগ করা হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সুপারিন্টেন্ডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার জোনাল চিফ ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে পরামর্শ করে টেন্ডার ডাকবেন। খারাপ অবস্থায় থাকা সেতুগুলির মধ্যে ১০বছর যেসব সেতুর কোনো মেরামতি হয়নি সেইসব সেতুকে অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখার বিষয়ে এদিন বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
প্রতিটি সেতুর ওপর থেকে সমস্ত রকমের বাড়তি চাপকে এখনই সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যাসাগর সেতুর মতো যেসব সেতুতে টব বসিয়ে প্রসাধনী উন্নয়ন খাতে কোটি টাকা খরচ হয়েছে আবার টাকা খরচ করে সেইসব বাড়তি চাপ তুলতে হবে। তারজন্য যা খরচ যোগাবে দপ্তর। সেতুর ওপর যদি পিচ দিতে হয় সেক্ষেত্রে পুরানো পিচের প্রলেপ সম্পূর্ণ তুলে ফেলে দিয়ে নতুন পিচের প্রলেপ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের পূর্ত সচিব অর্ণব রায়ও। ইঞ্জিনিয়ারদের সভায় সেতু নিয়ে সরকারী এই নির্দেশ ঘিরে কোনো বিতর্ক না হলেও কিন্তু অরূপ বিশ্বাসের হুমকির পরই বদলে যায় সভার মেজাজ। 

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement