পেট্রল-ডিজেলে এক টাকা
ছাড় দিতে বাধ্য হলো রাজ্য

হরতালের সাড়া দেখেই সিদ্ধান্ত: মিশ্র

পেট্রল-ডিজেলে এক টাকা<br>ছাড় দিতে বাধ্য হলো রাজ্য
+

নিজস্ব প্রতিনিধি: কলকাতা, ১১ই সেপ্টেম্বর— হরতালের চাপে মাথা নোয়ালো নবান্ন। 
পেট্রল ও ডিজেলের দাম লিটার পিছু ১টাকা করে কমালো রাজ্য সরকার। মঙ্গলবার সরকারের এই সিদ্ধান্ত নবান্ন থেকে জানান মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। এদিন নবান্নে মমতা ব্যানার্জি জানান, ‘লিটার প্রতি ১টাকা করে দাম কমানো হচ্ছে বাংলায়। আমাদের স্টেট সবচেয়ে বেশি সাধারণ মানুষের পক্ষে। সাধারণ মানুষকে বোঝা দিতে আমরা চাই না।’ 
মুখ্যমন্ত্রীর এদিন দাম কমানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণার সময় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। পেট্রপণ্যের দাম বাড়ার মূল কারিগর কেন্দ্রের মোদী সরকার। কিন্তু দাম কমাতে রাজ্য সরকারেরও যে ভূমিকা আছে তা ২০০৮সালে বামফ্রন্ট সরকার করে দেখিয়েছে। ফলে রাজ্য সরকার কিছুটা দাম কমাতে পারে তা নবান্নের অজানা নয়। ফলে অনেক আগেই রাজ্য সরকার দাম কমিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর কিছুটা বোঝা লাঘবের চেষ্টা করতে পারতো। সেই কাজ করেনি নবান্ন। এতদিন পরে এদিন কেন নবান্ন দাম কমানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল?
২৪ঘণ্টা কাটেনি এরাজ্যে বামপন্থীদের ডাকা হরতাল। পেট্রল ও ডিজেলের দাম কমানোর দাবিতে সোমবারই মোদী সরকারের বিরুদ্ধে হরতাল ছিল রাজ্যে। সেই হরতালের রাজ্যবাসীর মনোভাব টের পেয়েই এদিন আর দেরি করেনি নবান্ন। এমনকি রাজ্য গোয়েন্দা রিপোর্টও হাতে এসেছে নবান্নের কর্তাদের কাছে। সেখানে সোমবারের হরতালে বাস, ট্রেন সচল থাকলেও মানুষের রাস্তায় না নামার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে রিপোর্টে। ফলে জনগণের হরতালে মনোভাব টের পেয়েই নবান্ন বাধ্য হলো মাথা নোয়াতে। 
সরকারের দাম কমানোর সিদ্ধান্তে সি পি আই (এম)-র রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ‘রাজ্যজুড়ে লড়াইয়ের ময়দানে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণই যে দাবি আদায়ের একমাত্র পথ, তা আবারও স্পষ্ট হলো। কেন্দ্রের শাসকদল বি জে পি-র পাশে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী সোমবার এরাজ্যে হরতাল ভাঙার চেষ্টা করেছিলেন। দলীয় কর্মীদের সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনকেও ব্যবহার করেছিলেন এবং ধর্মঘট হরতালের ফলে সাধারণ মানুষের কোনও লাভ হয় না বলে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু হরতালে রাজ্যের ব্যাপক অংশের মানুষের সাড়া ও সমর্থন দেখে একদিনের মধ্যেই তিনি মানুষের দাবির কাছে মাথা নিচু করতে বাধ্য হয়েছেন।’ 
পেট্রল ও ডিজেলের দাম লিটারে এক টাকা কমিয়ে মমতা ব্যানার্জিকে এক দশক আগে বামফ্রন্ট সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তকেই অনুসরণ করতে হলো। তবে তারমধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, ২০০৮সালে বামফ্রন্ট সরকার কোনও হরতালের চাপে মাথা নুইয়ে দাম কমায়নি। ৫ই জুন রাজ্যে ১২ঘণ্টার হরতাল ডেকেছিল বামফ্রন্ট। আর তার আগে ৪ঠা জুন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সঙ্গে আলোচনা করে লিটারে এক টাকা করে দাম কমানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত। 
একই পথ চলতি বছরেও করে দেখিয়েছে কেরলের বামপন্থী ফ্রন্টের সরকার। গত মে মাসে কেরালার বামপন্থী ফ্রন্ট সরকার পেট্রল ও ডিজেলের দাম লিটারে এক টাকা করে কম নিতে শুরু করে। ধর্মঘটের জন্য অপেক্ষা করে মানুষের বোঝা কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়নি বামফ্রন্ট সরকারগুলিকে। সূর্য মিশ্র এই প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, ‘পেট্রল ডিজেলের লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্য সরকারের কাছেও রাজস্ব বাবদ অতিরিক্ত আদায়ের ক্ষেত্রে ছাড় ঘোষণার দাবি আমরা অনেকদিন ধরেই করছিলাম। ২০০৮ সালে বামফ্রন্ট সরকার প্রথম এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।’
আর যখন মোদীসরকারের বিরুদ্ধে রাজ্যজুড়ে ১২ঘণ্টার হরতাল ডাকল বামপন্থী ও তার সহযোগী দলগুলি তখন ধর্মঘট বিরোধিতায় নেমেছিল শাসকদল ও সরকার। সরকার ভেবেছিল ভয়, হুমকির কাছে মাথা নোয়াবে রাজ্যের মানুষ। তা যে কার্যত হয়নি তা এখন মানছেন নবান্নের কর্তারাও। এমনকি ধর্মঘটের দিন যান চলাচলে কোনও বাধা ছিল না ধর্মঘটীদের। কিন্তু তা সত্ত্বেও পেট্রল মালিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও বলছেন, ‘স্বাভাবিক দিনের তুলনায় তেল বিক্রি ঢের কম হয়েছে সোমবার।’ 
সাধারণ মানুষের ওপর তেলের বোঝা কেন্দ্রের সরকার ধারাবাহিকভাবেই চাপিয়ে যাচ্ছে। মমতা ব্যানার্জি এদিন নবান্নে জানান, ‘জানুয়ারি ২০১৬সালে পেট্রল ও ডিজেলের দাম ছিল যথাক্রমে ৬৫টাকা ১২পয়সা ও ৪৮টাকা ৮০পয়সা। আর সেপ্টেম্বর মাসে পয়লা তারিখে পেট্রলের দাম হয়েছে ৮১টাকা ৬০পয়সা। ডিজেলের দাম হয়েছে ৭৩টাকা ২৬পয়সা।’
পয়লা সেপ্টেম্বর মাসের হিসাব নিয়েও সরকারকে লিটারে এক টাকা দাম কমানোর জন্য ১২দিন অপেক্ষা করতে হলো। তার কারণ, আর কিছু নয়, ১০ই সেপ্টেম্বর দাম কমানোর দাবিতে হরতালই সরকারকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।
হরতালে নবান্নকে পিছু হটিয়ে আগামীদিনে বৃহত্তর দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বৃহত্তর সংগ্রামের জন্য জনগণকে প্রস্তুত করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন সূর্য মিশ্র। 

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement