ক্লাবে দাক্ষিণ্য ৬৬৮ কোটি,
গরিব কৃষকের ভরতুকি ৭৩ কোটি

মমতার ২৮ কোটির ভাগ পাচ্ছে সঙ্ঘও

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১৩ই সেপ্টেম্বর , ২০১৮

কলকাতা, ১২ই সেপ্টেম্বর — গত বছর রাজ্যে ছিল প্রায় ২৫ হাজার পূজা কমিটি। তার মধ্যে কলকাতায় পূজা কমিটি ছিল ২৬০০-র আশেপাশে। দুটিই রাজ্য পুলিশের হিসাব।

এবার তা ২৮ হাজার হচ্ছে। বুঝিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। ২৮ কোটি টাকা পূজা অনুদানের ঘোষণার সময়েই তিনি তা বলেছেন।

কলকাতাতে পূজা কমিটির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সুযোগ, সম্ভাবনা কম। কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের বক্তব্য, রাজ্যের আধা শহর, বড় শহর, মফঃস্বলে পূজার আয়োজন বাড়ছে, তা মমতা ব্যানার্জির ঘোষণা থেকেই স্পষ্ট। সঙ্ঘের দাবি, একবছরে জেলাগুলিতে এই প্রায় তিন হাজার পূজা কমিটি বেড়ে যাওয়ার তাদের উদ্যোগ অনেকটা। মানে? পশ্চিমবঙ্গে গত সাত বছরে কিছু ফেঁপে ওঠা আর এস এস-র এক গুরুত্বপূর্ণ নেতার কথায়,‘‘অনেকগুলি পূজা কমিটিই আমাদের প্রভাবিত। তাতে তৃণমূল কংগ্রেসের লোকজনও আছে। সেই সূত্রেই কমিটিকে অনুদানের ঘোষণা করেছেন মমতা ব্যানার্জি।’’

অর্থাৎ সঙ্ঘের আয়োজনে মমতা ব্যানার্জির ঘৃতাহুতি পড়েছে ‘পূজা –অনুদানে।’ চমৎকার ব্যাখ্যা করেছেন সঙ্ঘের ওই নেতা। বুধবার বলেছেন,‘‘আপনাদের নেতা সূর্যবাবু বলেছেন হরতালের ধাক্কায় রাজ্য সরকার ১টাকা পেট্রল, ডিজেলের দাম কমাতে বাধ্য হয়েছেন। আপনাদের ব্যাখ্যা। আমাদের কিছু বলার নেই। কিন্তু সমাজে হিন্দুত্ব, পূজা-আচারের প্রভাব দিন দিন বাড়ছে বলেই তো মমতা ব্যানার্জি ২৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করতে বাধ্য হলেন। এ তো আমাদেরই কৃতিত্ব।’’ তিনি আবারও জানাতে ভোলেননি যে, বেড়ে যাওয়া প্রায় তিন হাজার পূজা কমিটির একটি অংশ হয় তাদের নিয়ন্ত্রণে, নয় তো তারা আছেন যথেষ্ট পরিমাণে।

পূজা কমিটি বাড়ল। পূজা প্যান্ডেলে মমতা ব্যানার্জির মুখসমেত বিজ্ঞাপনের সুযোগ, দাবি বাড়ল। আবার সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকদের আয়োজিত পূজারও সরকারি অনুদান জুটতে চলেছে। সব মিলিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের স্থানীয় নেতারা খুশি। হিন্দুত্ববাদীরাও খুশি।

কিন্তু কৃষকদের খবর কে নেয়? রাজ্যের সরকার তথাকথিত মা-মাটি-মানুষের! দেশের প্রধানমন্ত্রী একজন স্বয়ংসেবক। কিন্তু দুপক্ষের কারোরই কৃষকদের দুদর্শা নিয়ে কোনও বক্তব্য নেই। অথচ পূজা কমিটির অর্ধেক টাকাও রাজ্যের ছোট কৃষকরা চাষের সুবিধার জন্য পাননি গত ছ’বছরে।

গত বছর, অর্থাৎ ২০১৭-তে ৩২ হাজার ছোট কৃষক সরকারি ভরতুকি নিয়ে যন্ত্র কিনেছিলেন। ছোট কৃষক রাজ্যে সিংহভাগ। রাজ্যের সরকার তথাকথিত ‘মা মাটি মানুষের’। গত ছ’ বছরে ছোট জোতের কৃষকদের চাষের যন্ত্র কেনার জন্য ভরতুকি বাবদ এই সরকার গড়ে সাড়ে চার হাজার টাকা দিয়েছে।

ছ’ বছরে প্রায় ষোলো হাজার ক্লাব রাজ্যের কোষাগার থেকে অনুদান পেয়েছে। তার পরিমান ৬৪০ কোটি টাকা। আর এবার দূর্গাপূজার জন্য মমতা ব্যানার্জির সরকার দেবে ২৮ কোটি টাকা। এই পূজো অনুদান পাচ্ছে আঠাশ হাজার ক্লাব।

অর্থাৎ ক্লাবের জন্য সরকারের দাক্ষিণ্য দাঁড়ালো ৬৬৮ কোটি টাকা।

আর ছোট কৃষকদের জন্য ভরতুকির পরিমাণ ৭২কোটি ৭৫লক্ষ টাকা। ২০১৮-তে তার পরিমাণ হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ৪৭লক্ষ টাকা।

কিন্তু ক্লাবের থেকে কৃষকের সংখ্যা অনেক বেশি। তবু মমতা ব্যানার্জির প্রধান লক্ষ্য ক্লাবকে খুশি রাখা।

যাঁদের কিষান ক্রেডিট কার্ড আছে, এমন কৃষকই এই ভরতুকি পেতে পারেন। প্রকল্পটিও রাজ্যের নয়। কেন্দ্রীয় সরকারের। ২০১৪-১৫-তে এই ছোট, ক্ষুদ্র জোতের মালিক কৃষকদের মধ্যে ৭৩,৯৬৯টি ছোট যন্ত্রপাতি বিক্রি হয়েছিল। কিনেছিলেন ৫৮,৩৯৫জন ছোট কৃষক। সেই সংখ্যা ২০১৭-১৮-তে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১২,১৮৯জনে। ছোট জোতের, কমদামি যন্ত্র বিক্রি হয়েছে ১৮,৮৯৭টি।

২০১২-র ৩১শে ডিসেম্বর রাজ্য সরকার সম্পন্ন কৃষকদের কৃষিযন্ত্রপাতি কেনার সহায়তা প্রকল্প ঘোষণা করে। ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, পাওয়ার রিপারসহ সম্পন্ন কৃষকদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রের জন্য সর্বোচ্চ ১লক্ষ এবং সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা ভরতুকি ঘোষিত হয়। ক্ষুব্ধ হন গরিব কৃষকরা। প্রসঙ্গত, রাজ্যে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকের সংখ্যাই বেশি। ২০১৩-র ৫ই ফেব্রুয়ারি ঘোষিত হয় প্রান্তিক(মার্জিনাল), ছোট জোতের অধিকারী কৃষকদের সহায়তা প্রকল্প — এই ক্ষেত্রেও কৃষিযন্ত্র কেনার জন্য।

২০১৩-র ৫ই ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভার বৈঠকের পরে তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘‘গরিব কৃষকদের ৫ হাজার টাকা দেবে রাজ্য সরকার। সেই টাকায় ধান ঝাড়াইয়ের মেশিন, কোদাল, বেলচা কিনতে পারবেন প্রান্তিক কৃষকরা। বরাদ্দ ১৫ কোটি টাকা।’’ সরকারি নির্দেশিকায় অবশ্য রাজ্য সরকার ঘোষণা করেছিল যে, গরিব ছোট জোতের কৃষকদের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হবে। এই সহায়তায় কৃষকরা রাসায়নিক স্প্রে করার হস্তচালিত মেশিন, হস্তচালিত ধান ঝাড়াইয়ের যন্ত্র, ড্রাম সিডার, সেচের জল বয়ে নিয়ে যাওয়ার পাইপ, শস্য গোলা বানানো, সার রাখার ভাণ্ড, কোদাল, বেলচা, নিড়ানি কিনতে পারেন। কারা পাবেন সেই সাহায্য? তাও ঠিক করেছিল রাজ্য সরকার। বি ডি ও-রা নাম ঠিক করবেন — এই ছিল সরকারি নির্দেশিকায়।

সেই ভরতুকির পরিমাণ লাগাতার কমছে। হুঁশ নেই সরকারের।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement