বি জে পি জোট সরকারের ছয় মাস
অর্থনৈতিক মন্দায় দুঃসহ
জীবন ছবি ত্রিপুরায়

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১৩ই সেপ্টেম্বর , ২০১৮

আগরতলা, ১২ই সেপ্টেম্বর— কেমন আছে আজকের ত্রিপুরা? প্রধানমন্ত্রীর সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত হীরা যুগে কি অবস্থা আমজনতার? বি জে পি-আই পি এফ টি জোট সরকারের ছয় মাসের শাসনে নানা অংশের মানুষের হাল খারাপ হচ্ছে দিন দিন।

খোয়াইয়ের লালছড়ার সুপ্রভা কর পেশায় গৃহপরিচারিকা। সকাল-বিকাল মিলিয়ে প্রতিদিন চারটি বাড়িতে কাজ করতেন তিনি। স্বামী দিনমজুর। খুব কষ্ট করেই চলে সংসার। সরকার পরিবর্তনের পর অভাব আরও বেড়ে গেল এই পরিবারের। শাসকদলের কর্মীরা হুমকি দিয়ে দুই বাড়িতে গৃহ পরিচারিকার কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। জানান সুপ্রভা কর। সি পি আই (এম) সমর্থক কারোর বাড়িতে কাজ করা যাবে না বলে শাসকদলের তথাকথিত মাতব্বররা হুলিয়া জারি করেছে বলে তিনি জানালেন।

বললেন, আমরা তো কাজ করে খাই। তাতেও রাজনীতির রং দেখে শাসকদলের কর্মীরা? এ প্রশ্ন দীর্ঘ আট বছরের বেশি সময় ধরে গৃহ পরিচারিকার কাজে যুক্ত মহিলার। একরাশ ক্ষোভ জানিয়ে তিনি বললেন, ওরা আমাদের মতো দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের পেটে ভাতের ব্যবস্থা করতে পারে না, বরং পিঠে কিল মারতে জানে। জোট সরকার যে গরিবের স্বার্থরক্ষাকারী সরকার নয়, তা সাড়ে পাঁচ মাসের শাসনেই বোঝা যাচ্ছে, মন্তব্য গৃহপরিচারিকার।

গত ছয় মাসে রেগার কাজ জুটেছে মাত্র দশ দিন। জানালেন বগাবিল এ ডি সি ভিলেজের রেগা শ্রমিক স্বর্ণলতা দেববর্মা। এও জানালেন, কাজ করেও মজুরি পেতে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। ২/৩দিন কাজ করার পর একদিনের সমান মজুরি মিলেছে ঐ শ্রমিকের। রেগার শ্রমিকের চাইতে গ্রুপ লিডারের সংখ্যা বেশি। বিরোধী দলের এই অভিযোগকে মান্যতা দিলেন তিনি। বললেন, এ কারণেই সঠিক মজুরি পাওনা থেকে আমরা বঞ্চিত। তাদের কাজও আমাদের করতে হয়। কিন্তু মজুরির পুরো টাকাই তারা পাচ্ছে।

তাঁর প্রশ্ন, শাসকদলের নেতা-কর্মী রেগার কাজে গিয়ে কাজ করবে না, পুরো মজুরি পারে? এ কেমন কথা! পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে তো এমনটা দেখিনি। তাঁর জিজ্ঞাসা, বি জে পি-র ভিশন ডকুমেন্টের প্রতিশ্রুতি মতো রেগায় ৩৪০ টাকা মজুরি এবং ২০০ দিনের কাজ কোথায়? এখন তো দেখছি কাজ শেষে বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে পাওয়া মজুরিই মিলছে না।

রেগার মতো একই অবস্থা টুয়েপেরও। টুয়েপ মানে ত্রিপুরা আরবান এমপ্লয়মেন্ট প্রোগ্রাম। চালু কথায় টুয়েপ। গ্রামে রেগা বা একশো দিনের কাজের মত শহরাঞ্চলেও ৭৫দিনের কাজ প্রকল্প চালু করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। এই প্রকল্পের সমস্ত টাকাই দিতো রাজ্য সরকারই। শহরের দুর্গানগরে সেই টুয়েপের কাজ করেন কমলারানি শীল। জানালেন, গত ছয় মাসে বারো দিনের কাজ পেয়েছেন। বড়ো সংসার। স্বামী-স্ত্রীসহ ছেলেরা দিনমজুরির কাজ করে যা রোজগার করেন, তা দিয়ে ডালভাতের ব্যবস্থা করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। তার মধ্যে আবার মিলছে না কাজ। পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকার এই সময়ে টুয়েপের যে কদিনের কাজ দিতেন, তার ধারেকাছেও বর্তমান জোট সরকার নেই বলে তিনি জানালেন। দুশ্চিন্তার কালো মেঘ জমাট বাঁধতে শুরু করেছে এই দরিদ্র পরিবারে। রোজকার কাজ কমছে, কিভাবে চালাবেন সংসার? চিন্তিত কমলারানি শীল।

টুয়েপের আরেক শ্রমিক জীতেন রায়। কাঞ্চনঘাটের এই বাসিন্দা জানালেন তাঁর দুঃখের কথা। বললেন, কিভাবে কাজ করবো? জব কার্ডই তো নেই। সি পি আই (এম)-কে সমর্থন করার অপরাধে বি জে পি কর্মীরা কেড়ে নিয়েছে জবকার্ড। তাঁর কথায়, সরকার তো সবার। বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে তো বি জে পি-র কর্মী, সমর্থকরাও দিব্যি কাজ করেছেন। তখন কাজে বাধা হয়নি তো তাদের। তাহলে এখন কেন দ্বিচারিতা হবে? যেভাবে অর্থনৈতিক আক্রমণ নামিয়ে আনা হচ্ছে, তাতে তো গরিব মানুষকে বেঁচে থাকতেই দেবে না এই সরকার। যন্ত্রণার অভিজ্ঞতার ক্ষোভে বললেন তিনি।

পূর্ব রামচন্দ্রঘাটের প্রবীণা রানুবালা গোপ (৭৪) সরকার থেকে বৃদ্ধভাতা পান ৭০০ টাকা। এই টাকা বেড়ে এক লাফে ২০০০ টাকা হবে। বি জে পি-র নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি শুনে আনন্দিত হয়েছিলেন তিনি। আশায় বুক বাঁধার কথা নিজ মুখেই জানান তিনি। ব‍‌লেন, এলাকার বি জে পি কর্মীরা নির্বাচনের আগে বাড়িতে এসে ২০০০ টাকা ভাতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথা জানায়। পরে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীসহ বি জে পি নেতাদের কথায় বিশ্বাস জন্মেছিল। ছ‌য়মাসেই সেই স্বপ্ন ভঙ্গ ঐ প্রবীণার। জানান, গত চারমাস ধরে ভাতা বন্ধ। বেজায় ক্ষুব্ধ হয়ে ভাতাপ্রাপক জানালেন, এই সরকার যত তাড়াতাড়ি বিদায় হয়, ততই মঙ্গল। এরা বক ধার্মিক। দেশের মতো ত্রিপুরাতেও তারা মানুষের সাথে প্রতারণা করছে।

শিক্ষিত যুবক তরুণ বিশ্বাস। বারবিলের এই যুবকের বয়স ৩৩। বি জে পি জোট সরকারের ছয়মাসেই সরকারের সমালোচনা তাঁর মুখে। ক্ষুব্ধ মন্তব্য তাঁর এই সরকার বেকারদের সাথে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে। নির্বাচনের আগে ভিশন ডকুমেন্টে ঘর ঘর চাকরির কথা বললেও বি জে পি জোট সরকার বেকারদের চাকরি দিতে আন্তরিক নয়। ছয়মাসে একটি ইন্টারভিউও আহ্বান করেনি জোট সরকার। এই সরকার বেকারদের কথা কতটুকু ভাববে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান এই শিক্ষিত যুবক।

মাছ চাষে পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকারের নেওয়‌া কর্মসূচির সুফল পেয়েছেন সুবোধ সিনহা। মাছের পোনা, খাবারসহ সেই সরকারের সহযোগিতায় মাছচাষে স্বনির্ভরতার মুখ দেখেছেন গৌরনগরের এই মৎস্যজীবী। সরকার পরিবর্তনের পর পঞ্চায়েত দখল করে বসা বি জে পি-আই পি এফ টি-র মাতব্বরেরা মাছসহ সমস্ত খাবার বাজারে নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে। এখন মাথায় হাত ঐ মৎস্যজীবীর। শাসক জোটের এই ধরনের অরাজকতা দেখে তাঁর অভিমত, এই সরকার তো গরিবের সরকার নয়। লুটেরাদের সরকার।

লংকামুড়ার প্রান্তিক কৃষক সদানন্দ দেববর্মাও বি জে পি জোট সরকারের জমানায় নিঃস্ব হওয়ার পথে। পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে কৃষি দপ্তর থেকে এস আর আই প্রকল্পের সুবিধাভোগী হিসাবে সার, বীজ, ধান পেতেন ঐ কৃষক। তা দিয়েই কৃষির কাজকর্ম চালিয়ে যেতেন তিনি। এর মাধ্যমে চলতো সংসার। এখনকার অবস্থা বলতে গিয়ে জানালেন, কৃষিকাজ এখন প্রায় বন্ধ। সার, বীজ লুট করে নিয়ে গেছে। সরকার থে‍‌কেও এখন তা সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। কৃষিকাজে ব্যবহৃত সার, বীজ, ওষুধের বাজারে যা অগ্নিমূল্য, তাতে এসব কেনা আর্থিক ক্ষমতার বাইরে। এই অবস্থার মধ্যে আগামী দিনে কৃষিকাজ করা যাবে কিনা, যথেষ্টই সন্দিহান ঐ প্রান্তিক কৃষক।

অজগরটিলার মনোরঞ্জন দেবরায় নিজের জমিতে উৎপাদিত সবজি বিক্রি করতে আসেন সুভাষপার্ক বাজারে। সকাল-বিকাল তাঁর টাটকা সবজি মুহূর্তেই বিক্রি হয়ে যেতো। প্রতিদিন কমপক্ষে তিন হাজার টাকা রোজগার হতো, জানালেন ঐ কৃষক। বাজারে মন্দার প্রভাব যে তাঁর উপরও পড়েছে তা সবজি বিক্রেতার চেহারাতেই ফুটে ওঠে। সকাল থেকে হাঁকডাকের পরও ক্রেতার তেমন ভিড় নেই। কেন এই অবস্থা? উত্তর তাঁর, মানুষ তো কম আসছেন বাজারে। বাড়িঘর থেকে বেরোতে পারছেন না। হাতে টাকা নেই। এখন তো একবেলা সবজি আনলেই অর্ধেকের বেশি বিক্রি হয় না। বেচাকেনার অবস্থা খুবই খারাপ। এভাবে বেশিদিন চললে খেতের সবজি তো খেতেই পচবে। আশঙ্কা কৃষক মনোরঞ্জন দেবরায়ের।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement