চলার পথেই টের পাওয়া যাচ্ছে
মানুষের ক্ষোভ, বঞ্চনা

জয়ন্ত সাহা   ১৩ই সেপ্টেম্বর , ২০১৮

আলিপুরদুয়ার : ১২ই সেপ্টেম্বর— মানুষের ক্ষোভ আঁচ পাওয়া যাচ্ছে যাত্রাপথে। শোনা যাচ্ছে বঞ্চনার হাজারো কাহিনি। প্রথম দিনের মতোই বুধবারও সকাল থেকে মুখ ভার আকাশের। মাঝেমাঝেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। এই প্রতিকূলতা উপেক্ষা করেই ভাটিবাড়ি থেকে অধিকার যাত্রা এগিয়ে চলেছে কামাখ্যাগুড়ির দিকে। মিছিলে হাঁটতে হাঁটতেই শোনা গেল কুমারগ্রামের রায়ডাক, সংকোশ নদী এবং কালচিনির ডিমা ও বাসরা নদী থেকে বালি, পাথর তোলা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সম্প্রতি উত্তরবঙ্গ সফরে এসে মুখ্যমন্ত্রী বলে দিয়েছেন এখানকার পাথর নয় বীরভূমের পাথর দিয়ে রাস্তাঘাট বানাবে সরকারি দপ্তর। মুখ্যমন্ত্রীর মৌখিক ঘোষণার পরই ভূমিদপ্তর এই নদীগুলি থেকে বালি, পাথর তোলা বন্ধ করে দিয়েছিল। এই কাজের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার শ্রমিকের প্রতিবাদের মুখে আপাতত সেই বালি, পাথর তোলা শুরু হয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার থেকে পাকাপাকিভাবে নদী থেকে বালি, পাথর তোলা বন্ধ করে দিতে প্রশাসন প্রস্তুতি নিচ্ছে, এমন আশঙ্কার কথা শোনালেন শ্রমিক নেতারা। অথচ রায়ডাক, সংকোশ, ডিমা ও বাসরা নদী থেকে বালি, পাথর তুলে দীর্ঘদিন ধরে জীবিকা নির্বাহ করছে অন্তত ৮০০০ পরিবার। অধিকার যাত্রা থেকে আওয়াজ উঠছে, ‘সরকার তুমি সিদ্ধান্ত বদলাও’।

বৃষ্টিতে ভিজে ভিজেই পদযাত্রায় হাঁটছিলেন পাইকাপাড়া চা বাগানের শ্রমিক ফুলমেন্স লাকড়া, আর বীরপাড়া চা বাগানের বিরসা লাকড়া। দুজনেই বাগানের কাজ কামাই করে অধিকার যাত্রায় যোগ দিয়েছেন। বেতন কাটা যাবে তবুও মিছিলে কেন এলেন? উত্তরে ফুলমেন্স লাকড়া শোনালেন, কয়েকদিন আগেই আলিপুরদুয়ার জেলার ৬২টি চা বাগানে মজুরি বাড়ানোর দাবিতে টানা তিন দিন হরতাল করেছি। অধিকার আদায়ে সেদিন হরতালে শামিল হয়েছিলাম আর আজ হক ছিনিয়ে নিতে মিছিলে হাঁটছি। ফুলমেন্সের সাথি বিরসা লাকড়া শোনালেন চা বাগানের জীবনের যন্ত্রণার কথা।

শ্রমিকদের ছেলেমেয়েরা কাজ পাচ্ছে না। টিফিন ওঁরাও, দিলীপ ওঁরাও, সুখড়া মুণ্ডা, সোমরা মুণ্ডার মতো অনেক মানুষ এখন কাজের জন্য ভিন রাজ্যে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। বাগান মালিক যেমন আমাদের ‘ধোঁকা’ দেয় ঠিক তেমনি ওই ঘাসফুলের দল ঠকাচ্ছে।’’

কামাখ্যাগুড়ি, বারোবিশা, হ্যামিলটনগঞ্জ, হাসিমারা ও মাদারিহাটের পথসভায় শ্রমিকনেতা বিদ্যুৎ গুণ শোনালেন, বাগান মালিক ও মুখ্যমন্ত্রীর শ্রমিক স্বার্থবিরোধী চেহারার কথা। মুখ্যমন্ত্রী গোয়েঙ্কাদের সঙ্গে নিয়ে লন্ডন, সিঙ্গাপুর ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আলিপুরদুয়ারের মাদারিহাটে ডানকান কোম্পানির ৬টি কারখানা রয়েছে। আর সেই কারখানার সিংহভাগ শেয়ারের মালিক গোয়েঙ্কারা। অথচ ৬টি কারখানাই এখন মাঝেমাঝেই বন্ধ হয়ে যায়। ১০-১২হাজার শ্রমিকের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন গোয়েঙ্কারা। মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্রয়ে শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা আর গ্র্যাচুয়িটি দিচ্ছে না মালিকপক্ষ। শ্রমিকদের ঠকাতে পিছিয়ে নেই বি জে পি-ও। স্বয়ং নরেন্দ্র মোদী ভোটের আগে সভা করে আশ্বাস দিয়েছিলেন, ডানকানের মালিক যদি চা বাগান চালাতে না চায় তবে সরকার চালাবে কারখানা। ৫বছর পেরোতে চলল, বি জে পি সরকার ফিরেও তাকায়নি শ্রমিকদের দিকে। রাজ্য-কেন্দ্র দুই সরকারের কাছে বারবার ঠকে শ্রমিকরা এখন ঝুঁকছে লালঝান্ডার দিকে। ভরসা বাড়ছে লালঝান্ডায়।

এদিন বারোভিশার পথসভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন অনিন্দ্য ভৌমিক, সফিকুল হক প্রমুখ। এই অধিকার যাত্রাকে কেন্দ্র করে চা বলয়ে ধামসা-মাদলের সুরও ছড়িয়ে পড়ছে। বাগানের আদিবাসী রমণীরা নৃত্যের ছন্দে বরণ করে নিচ্ছেন পদযাত্রী বন্ধুদের। অধিকার যাত্রার লড়াই যেন ওঁদের কাছে উৎসবও। যে পথে পদযাত্রা এগিয়ে যাচ্ছে সেখান থেকে লড়াইয়ের বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। এক চা বাগান থেকে অন্য চা বাগানে। গণতন্ত্র হারানো গ্রামের পর গ্রামের ওপর দিয়ে এগিয়ে চলেছেন পদযাত্রীরা। এ যেন এক জীবনের মিছিল। পদযাত্রা যেসব গ্রামের পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে এসব গ্রামের কৃষক ফসলের দাম পান না। জব কার্ড থাকলেও মেলে না কাজ। গ্রামের পঞ্চায়েত এখন আর কোন কাজেই লাগে না। বঞ্চনার শিকার সেইসব মানুষেরাই অধিকার যাত্রায় পা মিলিয়েছেন। আর যাঁরা পদযাত্রীদের স্বাগত জানাতে এগিয়ে আসছেন তাঁরাও অধিকার ফিরে পেতে চাওয়া বঞ্চিত সাধারণ মানুষ।

অধিকার যাত্রায় শামিল হওয়া প্রবীণ শ্রমিকনেতা রবীন রাই এদিন বিভিন্ন পথসভায় বলেন, তৃণমূলের এই কয়েক বছরের শাসনে জেলার শ্রমিকরা একের পর এক তাঁদের অধিকার হারিয়েছেন। আলিপুরদুয়ার পৃথক জেলা ঘোষণার পর এখন চা বাগানের শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের প্রাপ্য বুঝে পেতে জলপাইগুড়ি ছুটতে হয়। আমরা দাবি করেছি প্রভিডেন্ট ফান্ডের অফিস আলিপুরদুয়ারে করতে হবে।

পদযাত্রা যত এগিয়েছে ততই জেলার গ্রাম পঞ্চায়েতগুলির দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্লোগান উঠেছে অধিকার যাত্রা থেকে। বি পি এম ও-র জেলা নেতা শম্ভু বর্মণ, নিজেই আছেন অধিকার যাত্রায়। তিনি বললেন, বি পি এম ও-র অধিকার যাত্রা শুধু সাধারণ মানুষের দাবি নিয়ে কথা বলছে তাই নয়, এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা পেলে প্রতিরোধ করেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে।

বুধবার সকালে যখন কামাখ্যাগুড়ি চৌপথীতে পথসভা চলছে তখন বাজারে চাল কুমড়ো, কাঁচালঙ্কা বেচে ঘরে ফিরছিলেন সুরথ দাস। ৬০ পেরিয়ে যাওয়া মানুষটা বাড়ি ফেরার বদলে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে একমনে বৃষ্টিতে ভিজেই বক্তব্য শুনছিলেন। তার সঙ্গে কথা শুরু করতেই জানালেন, ‘আমাদের মতো গরিব মানুষের কথা এই লালঝান্ডা ছাড়া আর কেউ ভাবে না। আমার গ্রামের গরিব মানুষেরা যদি একবার ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেবার সুযোগ পায় দেখবেন লালঝান্ডাকে কেউ হারাতে পারবে না।’

সুরথ বর্মণদের মতো মানুষের অধিকার ফেরাতেই যে এই পদযাত্রা সেটা বুঝে গিয়েছেন সুরথ দাস। ওঁর মতো হাজারো মানুষের আত্মপ্রত্যয় বাড়িয়ে পদযাত্রা এগিয়ে যাচ্ছে এক জনপদ থেকে অন্য জনপদে। হ্যামিল্টনগঞ্জ, হাসিমারা, মাদারিহাটে অধিকার যাত্রা মিছিল থেকে যখন আওয়াজ উঠছে বনবস্তীবাসীদের অরণ্যের অধিকার দিতে হবে তখন রাস্তার দুধারে পথ চলতি মানুষ দাঁড়িয়ে মিছিল দেখছেন। মাদারিহাটে বিন্দা মুণ্ডা, দেউকি লাকড়ার মতো মহিলারা একজন আরেক জনকে বলছেন, ‘দেখ দেখ ই লোগ হামারি মাঙ কো লেকর জুলুস নিকালা।’ অধিকার যাত্রার সফলতা বুঝি এটাই। মানুষের চাহিদা আর প্রত্যাশা অনুযায়ী আন্দোলন মানুষকে উৎসাহিত করছে।

এদিন অধিকার যাত্রায় হাসিমারা, মাদারিহাটে বি পি এম ও নেতা কৃষ্ণ ব্যানার্জি, রবীন রাই, শম্ভু বর্মণ বক্তব্য রাখেন। উপস্থিত ছিলেন মৃণাল রায় ও যোগেশ বর্মণও।

মূল পদযাত্রাকে সফল করতে আলিপুরদুয়ার জংশন থেকে আলিপুরদুয়ার চৌপথী পর্যন্ত ৩ কিমি পথে একটি উপ-পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। বৃহস্পতিবার সকালে মাদারিহাট থেকে অধিকার যাত্রা বীরপাড়া, জটেশ্বর, ফালাকাটা হয়ে জলপাইগুড়ি জেলায় প্রবেশ করবে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement