পুলিশের ভয়ে চিকিৎসাই করাতে
পারছে না গুলিবিদ্ধ ছাত্র

রাতভর গ্রামছাড়া পুরুষরা

সুদীপ্ত বসু ও বিশ্বনাথ সিংহ   ২৬শে সেপ্টেম্বর , ২০১৮

ইসলামপুর, ২৫শে সেপ্টেম্বর— মমতা ব্যানার্জির পুলিশ কী, জানল বিপ্লব!

শিক্ষকের দাবিতে আন্দোলনের ‘অপরাধে’ গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। বাঁ পা-য়ে গভীর ক্ষত, অসহনীয় যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেছে শরীর। তবুও রেহাই নেই। দশম শ্রেণির এক ছাত্রকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে মমতা ব্যানার্জির সরকারের ভয়! হাসপাতালও গুলিবিদ্ধ প্রত্যক্ষদর্শীর কাছে আর ‘নিরাপদ’ নয় এ’বাংলায়।

দাড়িভিট তার নির্মম সাক্ষ্য।

গত বৃহস্পতিবার দাড়িভিট স্কুল চত্বরেই পুলিশের গুলি লাগে তাঁর বা পায়ের উরুতে । কোনোমতে রক্তাক্ত, সংজ্ঞাহীন বিপ্লব সরকারকে উদ্ধার করে, তৃণমূলী দুষ্কৃতীদের বাধা কাটিয়ে ইসলামপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে শিলিগুড়ির এক বেসরকারি নার্সিংহোম। কিন্তু সেখানেও ‘নিরাপদ’ নয় দশম শ্রেণির ছাত্র!

কার্যত চিকিৎসা ছাড়াই সেখান থেকেও সরিয়ে নিয়ে আসতে হয় তাকে। পাঁচদিন পরে কোনোমতে ঘরে ফিরেছে। তবুও নিশ্চিত নয়, তাই ফের সেখানে থেকে চিকিৎসার জন্য অন্যত্র সরে যেতে হচ্ছে তাকে। বারেবারে এই স্থানান্তর তার বাঁ পা’কে চিরকালের জন্য অকেজো করে দিতে পারে, তবুও সেই শঙ্কা ছাপিয়ে পুলিশি হানার আতঙ্ক জাঁকিয়ে বসেছে এক স্কুল ছাত্রের মনে, সন্ত্রস্ত পরিবারও।

সেই বিপ্লবের মুখোমুখি এদিন দুপুরে,দারিদ্র্যের স্পর্শ মাখা তার এক চিলতে ঘরে।

দাড়িভিট স্কুল চত্বরের সামনে পিচ রাস্তায় যেখানে এখনও রক্তের দাগ রোদে উজ্জ্বল, সেখান থেকে কয়েক পা এগিয়ে গেলেই দাড়িভিট গ্রামেই রাস্তার ধারেই বিপ্লবের বাড়ি। ঘরের সামনে উঠান। বেড়ার ঘুপচি ঘর।

উঠানেই দাঁড়িয়ে তখন বিপ্লব সরকারের দাদা দাড়িভিট হাইস্কুলের প্রাক্তন ছাত্র রিপন সরকারের সঙ্গে। তারা তিনভাই, বড় ভাই হায়দরাবাদে কাজ করে। ঘরে ঢোকার আগে উঠানে দাঁড়িয়ে তখন রিপন সরকারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। নিজের ভাইয়ের রক্তাক্ত দেহ দুহাতে রাস্তা থেকে তুলেছিল ইসলামপুর কলেজের প্রথম বর্ষের এই ছাত্র।‘কী যে হয়েছিল সেদিন দুপুরে ভাবতে পারবেন না। পুলিশের গাড়ি থেকে গুলি চলছে। ভাই জানালো স্কুলে গন্ডগোল, ছুটে গিয়েই দেখি ভাই পড়ে আছে,রক্ত সারা গায়ে। কোনোমতে সেখান থেকে তুলে চা পাতার গাড়িতে করে হাসপাতালের দিকে যাই। পথেও বাধা দেওয়া হয়েছে। গাড়ি থামিয়ে আমাকেও মারধর করে। কোনোমতে আমি পালিয়ে আসি, পরে সেখান থেকে মৃত রাজেশের বাবা ওকে নিয়ে যায় হাসপাতালে। তাও চিকিৎসা হয়নি জানেন। এখনও ভয় পাচ্ছি, ভাই তো প্রত্যক্ষদর্শী, যদি কিছু হয়ে যায়’। কিছুক্ষণ পরে আর বাঁধ ধরে রাখতে পারল না, চিবুক বেয়ে লোনা জলের স্রোত। কাঁদছে রিপন, হাউহাউ করে।

বেড়ার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বিপ্লব সরকারের বাবা গোবিন্দ সরকার। শুধু বললেন, ‘যেভাবেই হোক ছেলেটার চিকিৎসা দরকার, কিন্তু আমাদের একটাই ভয় যদি পুলিশ ওকে গ্রেপ্তার করে’। কিন্তু কেন? বিপ্লব সরকার নিজেই গুলিবিদ্ধ। ওকে কেন গ্রেপ্তার করবে পুলিশ?

প্রশ্নের উত্তর পেতে মাত্র মিনিট পাঁচেক সময় লাগল। একচিলতে ঘর, আলো জ্বলছে ঘরের ভিতর টিমটিম করে, প্রবল গরম। বিছানায় খালি গায়ে শুয়ে দাড়িভিটের দশম শ্রেণির গুলিবিদ্ধ ছাত্র বিপ্লব সরকার। কথা বলতে সমস্যা। তবুও তার মাঝেই জিজ্ঞাসা করতেই হলো। আস্তে আস্তে বলতে শুরু করল,‘ সেদিন স্কুলে গিয়েছিলাম। আগের দিন স্কুলে স্পোর্টস ছিল। সমস্যা সব মিটে গিয়েছে শুনেছিলাম। তারপরেও সেদিন ঐ শিক্ষকরা এলেন। পরে পুলিশ এল, কিছুক্ষণের মধ্যে গন্ডগোল। ছুটছিলাম কোনোমতে। পুলিশের গুলি লাগল পিছন থেকে’। তুমি দেখেছিলে পুলিশ গুলি চালিয়েছিল? ‘ততক্ষণে কাঁদানে গ্যাসে চোখ জ্বলছিল, সামনেই সাদা রঙের পুলিশের গাড়ি থেকে গুলি ছুঁড়ছিল, সেটাই লাগে’, বলতে পারছিল না, যন্ত্রণায় বারে বারে কুঁকড়ে যাচ্ছিল।

তার মধ্যেই জানল কলকাতায় ছাত্ররা তাদের জন্য মিছিল করেছে। শুনে কোনোমতে দশম শ্রেণির এই ছাত্র বলে উঠল, ‘ তাই! কলকাতাতেও ছাত্ররা আমাদের জন্য মিছিল করেছে। তার মানে আমরাই ঠিক, পুলিশ-ই তো অপরাধ করেছে’।

মুখ্যমন্ত্রী জার্মানি থেকে জানিয়েছেন, পুলিশ গুলি করেনি।

গুলিবিদ্ধ অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী পাঁচদিন বাদে গ্রামে ফিরেই জানালো, তার সামনে পুলিশের গাড়ি থেকেই গুলি ছোঁড়া হয়েছে।

মাধ্যমিকে ফার্স্ট ডিভিসন পাবে বলে মাকে কথা দিয়েছে বিপ্লব। আগামী বছরই মাধ্যমিকে বসার কথা তার। বরাবরাই ভালো রেজাল্ট করে বিপ্লব। ছোট ছেলের এই অবস্থা সহ্য করতে পারছেন না তার মা সরস্বতী সরকার। পাঁচদিন পরে মাত্র কয়েকঘণ্টার জন্য হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসা হয়েছে তাকে, কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার চিকিৎসার জন্য অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হবে। যদিও চিকিৎসা ছাপিয়ে ছেলেকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়াই লক্ষ্য। ‘ ও তো ছিল ওখানে, পুলিশ যদি ধরে’- তীব্র আতঙ্ক পরিবার জুড়ে। চোখে জল মা-র। শুধু বলছিল, ‘জানো ও খুব ভালো খেলে, জেলায় গিয়ে খেলেছে, সেই পাটাই শেষ না হয়ে যায়!’

বিষাক্ত রাজনীতি, ঘৃণ্য প্রচার কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসকদলের তরফে। দাড়িভিট জুড়ে বিভাজনের হিংস্রতা তৈরির চেষ্টা, তাতে মদত জোগাচ্ছে পুলিশি অত্যাচার, তৃণমূলী হুমকি।

তবুও দাড়িভিট আছে অন্য স্বর। আতঙ্ক, শুনশান, স্তব্ধ দাড়িভিটে এদিন দুপুরে মুহূর্তেই তৈরি হলো সহমর্মিতারও নজির। দাড়িভিট স্কুলের উলটোদিকেই নিহত তাপস বর্মণের বাড়ি। সোমবার নিজের একমাত্র ছেলের মৃত্যু পরবর্তী ধর্মীয় অনুষ্ঠান করেছেন মঞ্জু বর্মণ। এক মায়ের কাছে এর চেয়ে যন্ত্রণার কী হতে পারে? ঘরের দাওয়ায় বসে তাপসের বোন ডলি বর্মণ। মৃত্যুর সময়তেও তাপস বর্মণের ডান হাতে বোনের পরানো রাখি ছিল। তাপস বর্মণ সেই রাখি খোলেনি। শুধু এটাই ডলিকে আরও কাঁদিয়ে চলেছে।

গত পাঁচদিন ধরে প্রায় খাওয়াদাওয়া নেই, কথা বলতে গিয়েও হাঁপাচ্ছে দাড়িভিটের প্রাক্তনী ডলি বর্মণ। দাদাই ছিল ওর সব। সবচেয়ে ভালো বন্ধু। গোটা গ্রাম ওর দাদাকে ‘মধু’ বলেই ডাকত। মৃত্যুর সময়তে শেষবার তাপস বর্মণ বলেছিল - বোন তুই ঘরে যা। ‘ তখন কাঁদানে গ্যাসে আমাদের সকলের চোখ জ্বলছে। আমি ঘরের দিকে যেতেই আওয়াজ পেলাম। ছুটে গিয়ে দেখি দাদা পড়ে আছে, কাতরাচ্ছে’। আর বলতে পারল না।শুধু তারপরেই বলল,‘দাদা আপনি বিপ্লবের বাড়িতে যান। আমার তো দাদাকে আর ফিরে পাব না, ঐ ছেলেটাকে তো বাঁচাতে হবে’।

তবুও এককাট্টা দাড়িভিট। পুলিশি বর্বরতার বিরুদ্ধে এককাট্টা।

গোটা গ্রাম বিকাল পাঁচটাতেই পুরুষশূন্য। পুলিশের ভয়ে সকলেই গ্রাম ছাড়া, রাত পোহালে ফের ঘরে ফেরা, গত পাঁচদিনের রোজনামচা। পুলিশ দিনের বেলায় দাড়িভিটে ঢোকে না। আর রাতের বেলায় পুলিশি অত্যাচারে ঘরছাড়া মানুষ তবুও পাহারা দিয়ে চলেছে দলঞ্চ নদীর ধারে মাটি চাপা দিয়ে রাখা দুটি দেহ। জঙ্গলে, নদীর ধারে, চা বাগানে রাত কাটাচ্ছে দাড়িভিট স্কুলের বেশিরভাগ ছাত্র!

এই দৃশ্য পশ্চিমবঙ্গে শেষ কবে দেখা গেছে? গোটা দেশেও নজির, স্কুলের ছাত্ররাও রাতে গ্রামছাড়া, জঙ্গলে, চা বাগানে লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে পুলিশি হানার ভয়ে।

নিস্তব্ধ, আতঙ্কের সেই জনপদে এদিন দুপুরে একটি জায়গায় দেখা হারাধন মণ্ডলের সঙ্গে। তাঁর নাতনি ও নাতি দুজনেই দাড়িভিটের ছাত্র। সেই অপরাধে ষাটোর্ধ্ব এই মানুষকেও গ্রামের বাইরে রাত কাটাতে হচ্ছে!

এদিন সন্ধ্যায় সেই দাড়িভিটেই স্থানীয় তিনজন গৃহশিক্ষকের উদ্যোগে দাড়িভিট, সখানিভিটার কচিকাঁচা, ছাত্ররা মোমবাতি হাতে মিছিল করে। মিছিল গ্রাম ঘুরে শেষ হয় দাড়িভিট স্কুল চত্বরে। দুই প্রাক্তন ছাত্রের স্মৃতিতে মোমবাতিও জ্বালানো হয় গেটের সামনে।

স্কুল বন্ধ গত পাঁচদিন ধরে।

আতঙ্কে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা পাঁচদিন ধরে রাতের বেলার ঘরছাড়া! এগিয়ে বাংলার এক মর্মান্তিক বিজ্ঞাপন যেন এখন দাড়িভিট।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement