May Day

দিতে হবে ঘামের পুরো দাম

উত্তর সম্পাদকীয়​

জয়দেব দাশগুপ্ত
একশো আটত্রিশ বছর আগে সংগঠিত এক ঐতিহাসিক শ্রমিক আন্দোলন, যা এখনও সারা পৃথিবীর সংগঠিত, অসংগঠিত শ্রমিকদের কাছে জাজ্বল্যমান আলোকবর্তিকা। পয়লা মে সারা পৃথিবীর খেটে খাওযা মানুষের কাছে বার্তা পাঠায়, ঘামের দাম লড়াই করেই অর্জন করতে হবে। এটা মালিকের দান নয়, মজুরের জীবনপণ লড়াইয়ের ফসল। পুঁজি ও তার দর্শন বাঁচে শ্রমিকের মজুরি চুরি করে। এভাবেই তারা মুনাফার পাহাড় গড়ে তোলে। ‘মে’দিনের চরিত্র আন্তর্জাতিক। পুঁজি থাকলেই শোষণ থাকবে, মজুরি চুরি হবে। তাই শ্রমিক মালিকের লড়াই চিরকালীন ও অবশ্যম্ভাবী। 
মহামতি লেনিনের কথায়,‘মে’দিবস হ’ল শ্রমিকদের জাগরণ, সংহতি এবং সমস্ত ধরণের শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ঘোষণা। তাঁর কথায়, এ দিনের তাৎপর্য হ'ল, শ্রমিকদের বিশ্বব্যাপী সংগঠিত হয়ে দিনে আট ঘণ্টা কাজের দাবিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা এবং সর্বোপরি পুঁজিবাদকে ছুঁড়ে ফেলে সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ার প্রস্তুতি নেওয়া। তাঁর সুনির্দিষ্ট বক্তব্য ছিল, সমস্ত দেশের শ্রমিকদের একত্রিত হয়ে স্বৈরশাসক ও রক্তশোষকদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। বিপ্লবী নেত্রী রোজা লুক্সেমবার্গ বলেছিলেন, মে দিন হলো সর্বহারাদের আন্তর্জাতিক শ্রেণিসংগ্রামের সংহতি। 
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পুঁজিপতিরা শ্রমিক আন্দোলনের মেজাজ দেখে আতঙ্কিত হয়ে পথে। এর বিরুদ্ধে দেশে দেশে শ্রমিক আন্দোলন ভাঙতে নির্মম অত্যাচার নামিয়ে আনে। আমাদের দেশে এর প্রভাব শ্রমিক আন্দোলনকে আরও তীব্রকরে। মহাত্মা গান্ধী শ্রমিকদের দিনে আট ঘণ্টা কাজের দাবিকে জোরালো সমর্থন করেন। ১৯১৮ সালে আমেদাবাদের কটন মিল শ্রমিকদের দাবিদাওয়ার সমর্থনে মহাত্মা গান্ধী অনশন ধর্মঘটে বসেন এবং শ্রমিকদের আন্দোলন জয়যুক্ত হয়। আসলে ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লব পৃথিবীর জনমানসে এক বিরাট পরিবর্তন সূচিত করে। দেশে দেশে মুক্তিকামী মানুষের বিদ্রোহ ছড়িয়ে পরে।
কার্ল মার্কস ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে তাঁর সুচিষ্টিত বক্তব্যে প্রমাণ করলেন,মালিকরা মজুরদের বাধ্যতামূলকভাবে শ্রম দিতে বাধ্য করছে। যার অনিবার্য পরিণতিতে তাদের মজুরি দাসে পরিণত করেছে। এই পদ্ধতিতে শুধুমাত্র জীবনধারণের জন্য জন্য ন্যুনতম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হয়, যা একটি পরিবারের ভরণপোষণের পক্ষে একেবারেই সহায়ক নয়। পুঁজির বিরুদ্ধেশ্রমিকদের দরকষাকষির অধিকার ছিনিয়ে আনতে সেদিনের প্রেক্ষাপট বিশ্বজুড়ে শ্রমিক আন্দোলনকে কয়েক ধাপ এগিয়ে দেয়। দাসত্ব, দারিদ্র, চরম শ্রেণি বৈষম্যের বিরুদ্ধে সারা পৃথিবীব্যাপী সমাজতান্ত্রিক সংগঠনগুলি দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তোলে। 
আমাদের দেশের শ্রমিক আন্দোলনকে স্বাধীনতার পূর্বে ও স্বাধীনোত্তরকালে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করতে হয়েছে, যা আজও অব্যাহত। আমাদের দেশের সরকার এখন কোনো স্থায়ী কর্মী চায় না। শুধু মজুরি শোষণের জন্য সরকারি উদ্যোগগুলিতে অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ করছে। অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ করছে। যাদের নেই কোনো কাজের নির্দিষ্ট সময় মজুরির স্থায়িত্ব ও জীবিকার নিরাপত্তা।এই মুহূর্তে আমাদের কর্তব্য হ’ল এই অস্থায়ী কর্মীদের সংগঠিত করতে হবে। 
সোভিয়েত ইউনিয়নসহ পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পরে আমাদের দেশে নয়া উদারবাদী অর্থনীতির নামে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পগুলিতে আউটসোসিং-এর নামে স্থায়ী কাজ বাইরে পাচার করা শুরু হয়। সমস্ত দেশে ক্যজুয়ালাইজেশনের নামে বেড়েছে অদক্ষশ্রমিক। বহু দশক ধরে শ্রমিকদের অর্জিত অধিকার কেড়ে নিতে, খরচ কমানোর অজুহাতে এই সিদ্ধান্ত। এর মূল অর্থ হল ভাগ করো ও ছাঁটাই করো। পূঁহিক স্বার্থরক্ষার এই নীতি কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রমনীতির প্রতিফলন। অদক্ষ,অস্থায়ী শ্রমিকদের লাগামহীন শোষণ,স্বাস্থ্য পরিষেবার খরচ অস্বীকার করা, সামাজিক সুরক্ষাহীন শিল্পব্যবস্থা চালু করার নির্মম প্রতিফলন। দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা যত বাড়ছে, তার সাথে তাল মিলিয়ে বাড়ছে অস্থায়ীশ্রমিকের সংখ্যা।
ধনতন্ত্রে পূঁজির লোভ সীমাহীন। সরকারী বদান্যতার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি মাত্রাছাড়া মুনাফার লোভে এ পথ বেছে নিয়েছে। অন্যদিকে, সরকারী প্রতিষ্ঠান ও শিল্পগুলিও একই পথে সামিল।শ্রমিকদের অর্জিত অধিকারগুলি কেড়ে নেওয়ার লক্ষ্যে শ্রমকোডের মাধ্যমে শ্রমিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিতঅধিকার-ভিত্তিক আইনগুলি ধ্বংস করছে।ন্যূনতম মজুরি আইন,ট্রেড ইউনিয়ন আইন, বোনাস আইন,দূর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ,ধর্মঘট আহ্বানের অধিকার প্রভৃতিকে অস্বীকার করে মালিকদের স্বার্থবাহী কোড চালু করছে। এর মূল লক্ষ্য হলো ট্রেড ইউনিয়ন বিরোধী পরিবেশ সৃষ্টি করে ছাঁটাইকে বৈধতা দেওয়া,ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশনকে কঠোর করে,বিচারব্যবস্থার হস্তক্ষেপকে দূর্বল করে এই পূঁজির অবাধ চলাচল ও শোষণের মাত্রাকে আরও বৃদ্ধি করা।
রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে গত দু’দশকে স্থায়ী কর্মচারীর সংখ্যা কমেছে। ২০২৫ সালের ৩০জুন কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে লোকসভায় জানানো হয়েছে যে শুধুমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কশিল্পে আউটসোর্সড ও চুক্তিবদ্ধ কর্মচারীর সংখ্যা ১ লক্ষ ১ হাজার। এই সংখ্যাটা আদৌ বিশ্বাসযোগ্য নয়, বরং এই সংখ্যাটা হবে এর দ্বিগুন। অন্যদিকে, বেসরকারি ও বিদেশী ব্যাঙ্কগুলিতে হাজার হাজার চুক্তিবদ্ধ কর্মচারী কাজ করছেন। অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও সরকারের মনোভাব এক ও অভিন্ন।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কশিল্পের শাখাগুলিতে পিওন, সুইপার পদগুলি ধারাবাহিকভাবে কমছে। আমাদের রাজ্যের এটিএম-গুলিতে প্রহরীদের ব্যাপকভাবে ছাঁটাই করা হয়েছে। ব্যাঙ্কের শাখাগুলি চলছে অস্থায়ী কর্মচারীদের দিয়ে। যাদের কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হতে হচ্ছে। এদের সরকারি হারে দৈনিক মজুরি, কাজের ঘণ্টা বেঁধে দেওয়া, জীবিকার নিরাপত্তা, সর্বোপরি স্থায়ী কাজের দাবিতে জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। আজকের দিনে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে, এই দাবিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সুসংগঠিত করতে হবে। ঘামের দামকে প্রতিষ্ঠিত করতেই হবে।
উদারনীতির নামে চলছে মজুরি শোষণ। শ্রমিকদের জন্য অনিশ্চিত মজুরি ও মালিকদের জন্য সীমাহীন মুনাফা। দেশে বাড়ছে আয়ের বৈষম্য, বাড়ছে দারিদ্র্য। এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
লড়াইটা অসম মনে হলেও সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলনবর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে অভাবনীয় সাফল্য আনতে পারে। স্থায়ী শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নকে অসংগঠিত বা অস্থায়ী শ্রমিকদের দাবিগুলিকে কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরতে হবে এবং দাবিগুলিকে তাঁদের দাবিসনদের মধ্যে এনে অগ্রাধিকার দিয়ে সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে।
সংগ্রামের চলমান পথেনানা ধরনের সংকট মোকাবিলা করে স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিকের সুদৃঢ় ঐক্যই বিজয় অর্জন করতে পারে।

Comments :0

Login to leave a comment