মালদহে 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' (এসআইআর) বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজে নিযুক্ত বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের আটকে রেখে বিক্ষোভ এবং মাঝরাতে তাদের গাড়িতে হামলার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলো সুপ্রিম কোর্ট। কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির পাঠানো একটি চিঠির ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার এই ঘটনার স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ নেয় শীর্ষ আদালত।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি এবং বিচারপতি বিপুল পাঞ্চলির বেঞ্চে বৃহস্পতিবার সকালে এই জরুরি শুনানি হয়। যদিও বিষয়টি বৃহস্পতিবারের কার্যতালিকায় ছিল না।
শুনানি চলাকালীন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত জানান, বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাকে গভীর রাতে জরুরি নির্দেশ দিতে হয়েছিল। ক্ষোভের সুরে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘রাত ১১টা পর্যন্ত জেলাশাসক সেখানে ছিলেন না। বাধ্য হয়ে আমাকে রাতে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশ দিতে হয়। ঘেরাও হয়ে থাকা অবস্থায় ৫ বছরের একটি শিশুকেও খাবার ও জল দেওয়া হয়নি।’
কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি জানিয়েছেন, রাতে মুখ্যসচিবের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য নির্বাচন ঘোষণার পরপরই রাজ্যে মুখ্যসচিব এবং স্বরাষ্ট্রসচিব বদল করেছিল নির্বাচন কমিশন।
রাজ্যের পক্ষে উপস্থিত বর্ষীয়ান আইনজীবী কপিল সিবাল জানান, তিনি সংবাদপত্রে এই ঘটনার কথা পড়েছেন। আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী একে অরাজনৈতিক বিক্ষোভ বলে দাবি করলেও, আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন অবিলম্বে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের দাবি জানান। অন্যদিকে, সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা এই ঘটনাকে 'সুপ্রিম কোর্টের উপর হামলা' হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কারণ ওই আধিকারিকরা শীর্ষ আদালতের নির্দেশেই দায়িত্ব পালন করছিলেন।
আদালত ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানিয়েছে, গভীর রাতে হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার মাধ্যমে খবর আসে যে, তিনজন মহিলা-সহ সাতজন বিচারবিভাগীয় আধিকারিক মালদহ জেলায় ঘেরাও হয়ে আছেন।
বিকেল ৩:৩০ মিনিটে ঘেরাও শুরু হয়। হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল রাজ্য প্রশাসনকে পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানালেও রাত ৮:৩০ মিনিট পর্যন্ত কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে স্বরাষ্ট্রসচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। অবশেষে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপে রাত ১২টার পর তাঁদের উদ্ধার করা হয়।
শীর্ষ আদালত এই ঘটনাকে প্রশাসনের ব্যার্থতা বলে উল্লেখ করেছে। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ, মুখ্যসচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি এবং তাকে কোনও বার্তা দেওয়া সম্ভব হয়নি, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।
আদালতের কথায়, বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের মনোবল ভাঙতে এবং সুপ্রিম কোর্টের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে। যারা আইন নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে বিচারকদের মনে ভয় তৈরি করার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অবমাননার হুঁশিয়ারি দিয়েছে বেঞ্চ। মুখ্যসচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি, পুলিশ সুপার এবং জেলাশাসকের ভূমিকা "অত্যন্ত নিন্দনীয়" বলে ভর্ৎসনা করে শীর্ষ আদালত আগামী ৬ এপ্রিল বিকেল ৪টের সময় তাদের ভার্চুয়ালি উপস্থিত হয়ে শোকজের জবাব দিতে নির্দেশ দিয়েছে।
এসআইআর-এর কাজ যাতে নির্বিঘ্নে হয় এবং আধিকারিকরা যাতে সুরক্ষিত থাকেন, তার জন্য আদালত নির্দেশ দিয়েছে যেখানে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা কাজ করছেন জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে (ইসিআই) সেখানে পর্যাপ্ত কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করতে হবে। এই ঘটনার তদন্তের ভার সিবিআই (CBI) বা এনআইএ (NIA)-এর মতো স্বাধীন সংস্থাকে দেওয়ার জন্য কমিশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে।
জুডিশিয়াল আধিকারিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের কোনও রকম নিরাপত্তার আশঙ্কা থাকলে তা খতিয়ে দেখে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে বলেও জানিয়েছে শীর্ষ আদালত।
সুপ্রিম কোর্ট আরও বলেছে পুলিশকে নিশ্চিত করতে হবে যে, শুনানির সময় কোনও কেন্দ্রে একবারে ৩ থেকে ৫ জনের বেশি মানুষ প্রবেশ করতে যেন না পারে।
এদিন প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমরা এত মেরুকরণ আগে কখনও দেখিনি। এমনকি আদালতের নির্দেশ পালনের ক্ষেত্রেও রাজনীতির প্রতিফলন ঘটে। সমস্ত দল যাতে খুশি থাকে, তার জন্যই আমরা বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের দিয়ে একটি নিরপেক্ষ পরিকাঠামো তৈরির চেষ্টা করেছিলাম। আর এখন এই ঘটনা ঘটছে। আপনি কি মনে করেন আমরা জানি না কারা এই দুষ্কৃতী? অন্তত আমি রাত ২টো পর্যন্ত পুরো পরিস্থিতির উপর নজর রাখছিলাম। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।’
Malda Supreme Court
মালদহে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের ওপর হামলা: রাজ্যকে তীব্র ভর্ৎসনা সুপ্রিম কোর্টের, সিবিআই বা এনআইএ তদন্তের নির্দেশ
×
Comments :0