Post editorial

অরুণোদয়কে নিয়ে সহজ কথা…

সম্পাদকীয় বিভাগ

চন্দন সেন 
ব্যাস! শ্মশানে ডেডবডি পুড়ে গিয়েছে। পুড়তে পুড়তেও হয়তো অরুণোদয় ভাবছিল,  ‘ভাগ্যিস গান স্যালুট হলো না!’ তাঁর মৃত্যুর প্রায় বেশ কয়েক ঘণ্টা পর সোশাল মিডিয়া বিরতিহীন ফুটেজ তোলা ও বিতরণের বাণিজ্যিক বিপণনে ক্লান্ত, অবসন্ন। দায়বোধহীন হুজুগেদের ভিড় কমে এসেছে ভীষণভাবে। এক সময়ের উদ্বাস্তু কলোনির ঘাম, রক্ত, লড়াই আর অধিকারের জন্য প্রাণ বাজি রাখা বিজয়গড়ে অরুণোদয়ের পৈতৃকসূত্রে পাওয়া বাড়িটার চারপাশে কয়েক দিন অবিরাম জনস্রোত ছিল। এখন ওই বাড়ি এবং বাড়ির চারপাশে পাওনা শোকস্তব্ধতা, মানে একান্ত শোক! আর ঘরের সহজ থেকে বাইরের প্রতিবেশীদের মনে জটিল প্রশ্ন, কেন? কেন? কেন? শেষ পর্যন্ত সব ‘কেন’-ই অনিবার্য জিজ্ঞাসায় পৌঁছে যায়, কীভাবে? কীভাবে? সেই কীভাবের অন্দরমহলে আলো হয়ে বসে আছেন খুন-হত্যা-রহস্য-প্রেম-চুটকি মেশানো সিরিয়ালের পর সিরিয়ালের সর্বশক্তিমান নিয়ন্ত্রকেরা, এক প্রকার সরকারপোষিত কমিটেড কমিশনাল জীব! ইতিমধ্যেই যাদের শোকাহত চেনা বিবৃতি, ক্যামেরা তাক করা মুখ ও মাথার প্রশাসনিক উপস্থিতি সবরকম মিডিয়ার বেশ কয়েক ঘণ্টার অবিরাম ভোজন তালিকায় স্থান পেয়েছে। এই সুযোগে এক সময়ের ঘুটে কুড়নিদের দেওয়াল দখল করা ভোট কুড়নিদের দলও যথারীতি কাঁদনের গোবর ছড়িয়ে গেছে, হয়তো গ্লিসারিন না লাগিয়েই। ভোটের চড়া রোদে মিডিয়ার অবিশ্রান্ত ক্যামেরার তাপে চোখ বাঁচানো রোদচশমা পরে ‘রাহুল অরুণোদয় আমার ভাই’, ‘আমার বন্ধু’, ‘আমার সহশিল্পী’, ‘আমার ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি’। বিষণ্ণ গলায় বলতে বলতে ক্লান্ত তারকারা আর রাহুল অরুণোদয় যে দল বা মতাদর্শকে সোচ্চারে ঘেন্না করেছে তাদের তরফেও মরাকান্নার সহস্র আতশবাজির খেলা এতক্ষণে স্তব্ধ। রাহুল অরুণোদয়ের ঘরের মধ্যে বৃদ্ধা মা, কিশোর সন্তান আর স্ত্রী। যিনি শোক ভুলে লাখো লাখো মানুষের মতোই ঘটনার তদন্ত চাইছেন। যে সিরিয়ালে অভিনয় করতে তাঁকে তালসারির সমুদ্রে নামানো হয়েছিল বেআইনিভাবে, সেই হাঁটুজলে রাহুল অরুণোদয় একটা সামুদ্রিক তরঙ্গের আকস্মিক অভিঘাতে এমনভাবে ভেসে গেল যে ঘণ্টাখানেক পর তাঁর দেহ উদ্ধার হলো। মৃত্যু তখন তাঁকে প্রায় জাপটে ধরেছে। 
প্রকাশ্যে শোক জানিয়েছে প্রায় সবাই, আড়ালে সুখ পেয়েছেন যারা তারাও সমাজ মাধ্যমে নানা কুৎসিত ইঙ্গিত দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করেছেন ছেলেটা ভালো ছিল না, কারণ সে প্রকাশ্যে বামপন্থী দলের পক্ষে স্লোগান দিত, বক্তব্য দিত, মিছিলে থাকতো। আসলে ছোটবেলা থেকেই বাবা বিশ্বনাথ বন্ধ্যোপাধ্যায়ের আন্তরিক চেষ্টায় নাটকের অভিনেতা হয়ে উঠছিল অরুণোদয়। কলোনির অন্যান্য বাবাদের মতোই বিশ্বনাথবাবুও চেয়েছিলেন ছেলে যেন নাটক করতে করতে জীবনকে বোঝে জীবনকে চেনে আর পাশাপাশি পড়াশোনার আগ্রহটাও অভিনয়ের অতৃপ্ত ক্ষুধা থেকেই বেড়ে ওঠে। অরুণোদয় কবি হলেন, লেখক হলেন, বক্তা হলেন, শেষ পর্যন্ত সিরিয়াল ও চলচ্চিত্রের অভিনেতাও হলেন। কলোনি বা ঘরের নাম অরুণোদয়ের আগে রাহুল শব্দটা এসে বসল, চলচ্চিত্র নির্মাতাদের চটজলদি তাড়নায়। নিজের নাম নিয়ে, নামের বড় হওয়া ছোট হওয়া নিয়ে রাহুল নিজেই নিজেকে অনেকভাবে মজা করেছে। শেষ পর্যন্ত হয়তো কোনও চলচ্চিত্র নির্মাতার অভ্রান্ত উচ্চারণে কিংবা শক্তিমান বা শক্তিময়ী প্রযোজনা সংস্থার উপেক্ষা বা উদাসীনতায় রাহুল অরুণোদয়ের অকাল মৃত্যু দাবি জানাচ্ছে এ এমন এক ভয়ঙ্কর সময়ে যখন কোনও মৃত্যু রহস্যই উন্মোচিত হবে কি হবে না, তা নির্ভর করে একচ্ছত্র ভোট দখলে সফল প্রশাসনের বড় কর্তা বা কর্ত্রীর উপর। প্রিয়াঙ্কার মতোই রাহুলের সন্তান সহজও হয়তো একদিন বুঝবে রাহুল অরুণোদয়ের ভেতরে যে আগুনটা ছিল তা একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে শূন্যতার ভয় কাটানোর একটা জেদ। 
রাহুলের মৃতদেহ নিয়ে এত মানুষের আবেগ শোক আর সন্তাপকে একমাত্র স্পষ্ট সাহসী কণ্ঠে ‘সার্কাস’ বলে বিদ্রূপ করেছেন একালের অন্যতম জনপ্রিয় এক সুকণ্ঠী ক্লাউন, যাকে প্রয়াত প্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋতুপর্ণ ঘোষ মুখোমুখি বসিয়ে প্রায় কাঁদিয়ে ছেড়েছিলেন, বলেছিলেন— চ্যাপলিন হতে গেলে যে দক্ষতা যন্ত্রণা আর সুক্ষ্ম দৃষ্টি লাগে তা একজন ভাঁড়ের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা যায় না। সমাজ মাধ্যমের কল্যাণে রাহুল অরুণোদয়ের অনেক লেখা বা কবিতা আমাদের নজরে এসেছে, সেগুলো থাক, আরও আসবে কিন্তু বাংলাদেশের বিখ্যাত অভিনয় শিল্পী জয়া আহাসান স্মরণ করেছেন এই বলে যে, রাহুল অরুণোদয় ‘রূপসাগর’- চলচ্চিত্রে জীবনানন্দ দাশের চরিত্রে অভিনয় করেছিল। সেই চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রসঙ্গে জয়া স্মরণ করেছেন, জীবনানন্দের কবিতা ও তাঁর জীবনচর্চা নিয়ে রাহুলের প্রবল পড়াশোনা ও মুগ্ধতার কথা। হয়তো রাহুলের খুব প্রিয় জীবনানন্দের এই কবিতাংশ দিয়েই এই লেখা শেষ করা যেত, 
“কত দেহ এলো,- গেল,- হাত ছুঁয়ে ছুঁয়ে 
দিয়েছি ফিরায়ে সব; - সমুদ্রের জলে দেহ ধুয়ে
নক্ষত্রের তলে
ব’সে আছি,- সমুদ্রের জলে
দেহ ধুয়ে নিয়া
তুমি কি আসিবে কাছে প্রিয়া!”
কিন্তু শেষে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো জয়দেব, কবি জয়দেব বসু। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর তাঁর মৃতদেহ দখল করে নিয়েছিল সরকারি প্রশাসন; বাইরে দাঁড়িয়েছিল জয়দেবের মতো বেশ কয়েকজন কবি সাহিত্যিক। শেষ বয়সে ভাবনা চিন্তায় ভারসাম্য রক্ষা করতে বারবার বাধা দিচ্ছিল প্রয়াত কবির বার্ধক্য আর রোগ। এই সুযোগে কবির মৃতদেহ সরকারি গাড়িতে চাপিয়ে শ্মশানে নিয়ে গিয়ে গান স্যালুট দেওয়া হয়েছিল। কেউ সাহস করে এগিয়ে এসে মৃতদেহের উপর একটি লাল পতাকা দিতে পারেনি,  যে কবি একদিন বাংলার যৌবন থেকে জরাকে অস্থির করে তুলেছিলেন এমন অজস্র কবিতার লাইন দিয়ে, “চিমনির মুখে শোনো সাইরেন শঙ্খ, গান গায় হাতুড়ি ও কাস্তে…” বাংলার অন্যতম সেরা কবির ললাট লিখন মেনে গান স্যালুট চলছিল। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় পুড়ছিলেন। যেমন ৪৮ ঘণ্টা আগে পুড়েছিল কবি রাহুল অরুণোদয়ের দেহটা। যে রাহল তাঁর সন্তানের জন্য লিখে গেছে, ‘আমার ভাগের সবকটা নদী, পাহাড়, জঙ্গল তোমায় দিলাম...’

Comments :0

Login to leave a comment