অনেকটাই রহস্যজনকভাবে আচমকা উপরাষ্ট্রপতির পদ ছাড়লেন জগদীপ ধনকড়। তাই সেই শূন্যপদ পূরণে হচ্ছে নির্বাচন। সরকার পক্ষ তথা শাসক জোট তাদের প্রার্থী করেছে আদতে তামিলনাডুর মানুষ মহারাষ্ট্রের রাজ্যপাল সিপি রাধাকৃষ্ণনকে। আরএসএস ঘনিষ্ট হিসেবে তাঁর পরিচিতি অনেকেরই জানা। সেই জনসঙ্ঘ থেকে শুরু করে বিজেপি পর্যন্ত তামিলনাডুতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির অন্যতম এই নেতাই মোদী-শাহদের স্বাভাবিক পছন্দের। বিপরীতে বিরোধীরা প্রার্থী করেছে সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি বি সুদর্শন রেড্ডিকে। রেড্ডির কোনও রাজনৈতিক পরিচিতি নেই। তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি উদারবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক ভাবধারায় ঋদ্ধ। সর্বোপরি বিচারপতি হিসেবে তিনি যেমন ছিলেন সংবিধানের রক্ষক তেমনি তার পরও তিনি গণতন্ত্র ও ন্যায়ের প্রহরী। গণতন্ত্র ও সংবিধান আক্রান্ত হলে তিনি তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। উপরাষ্ট্রপতি হলে তিনি ঠিক এই কাজটি করবেন বলে অকপটে ব্যক্ত করেছেন। এমন এক ব্যক্তিকে প্রার্থী করে বিরোধীরা দেশ রক্ষার ও সংবিধান রক্ষার লড়াইকে শক্তিশালী করলেন। একদিকে সংবিধানের মূল ভাবনার বিরোধী হিন্দুত্ববাদী প্রার্থী। অন্যদিকে সংবিধানের মূল ভাবনার শরিক ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক প্রার্থী। স্পষ্টতই দুই মতাদর্শের সরাসরি লড়াই। সংখ্যার জোরে শেষ পর্যন্ত বিরোধী প্রার্থী জিতবেন না হারবেন সেই বিতর্কে না ঢুকেও একথা বলা যায় বিরোধীরা মতাদর্শের জায়গায় একধাপ এগিয়ে আছেন।
এমন এক ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক নীতিতে বিশ্বাসী বিরোধী প্রার্থীকে আচমকা সরাসরি ব্যক্তিগত আক্রামণ করে বসলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ। সুদর্শন রেড্ডির মাওবাদী যোগ আছে বলে শাহ দায়িত্বজ্ঞানহীন অভিযোগ ছুঁড়ে দিলেন। ছত্তিশগড়ে বিজেপি শাসনকালে মাওবাদী নিধনের জন্য ভয়ঙ্কর সালোয়া জুডুদ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। এই প্রকল্পের মাধ্যমে জঙ্গলে ও তার আশপাশের গ্রামে বসবাসকারী আদিবাসীদের হাতে সরকার অস্ত্র তুলে দেয় মাওবাদীদের মোকাবিলা করার জন্য। পুলিশ ও কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনী যখন অভিযান চালাবে তাদের সঙ্গী হবে সশস্ত্র আদিবাসীরা। আদিবাসীদের সরাসরি মাওবাদীদের শত্রুতে পরিণত করতে চায় সরকার। ফলে মাওবাদীদের হাতে প্রাণ হারাতে বসেন নিরীহ গরিব আদিবাসীরা। ২০১১ সালে সর্ব্বোচ্চ আদালতের বিচারপতি হিসেবে রেড্ডি এই প্রকল্প বন্ধ করার রায় দেয়। রাষ্ট্র গরিব নিরীহ নিরপরাধ আদিবাসীদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে মাওবাদীদের সঙ্গে লড়াইয়ে মৃত্যু মুখে ঠেলে দেবে এটাকে তিনি বৈধতা দিতে পারেনি। এই ঘটনাকে সামনে রেখে অমিত শাহ এবং অন্য নেতা-মন্ত্রীরা রেড্ডির মাওবাদী যোগ বলে আক্রমণে নামেন। অমিত শাহর মতে সালোয়া জুডুস বন্ধ না হলে ২০২০ সালের মধ্যেই নাকি মাওবাদীরা নির্মূল হয়ে যেত। তারজন্য কত সহস্র নিরীহ আদিবাসীর জীবন যেত সেটা অবশ্য তারা ভাবেননি।
শাহকে সমর্থন জানিয়ে ৫৬জন প্রাক্তন বিচারপতি বিবৃতি দিয়ে বলেছেন রেড্ডি প্রার্থী হয়ে বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতাকে অসম্মান করেছেন। যারা বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন তাদের সকলেই হয় সঙ্ঘপন্থী বা সরকারের প্রসাদ বা আনুগত্য প্রার্থী। একজন তো বিজেপি সরকারের পক্ষে গুচ্ছ গুচ্ছ রায় দিয়ে এতটাই গুড বুকে ঢুকেছেন যে, অবসরের পরই মোদীরা তাকে সাংসদ বানিয়ে পুরস্কার দিয়েছে। অন্যরা পেয়েছে নানা পদ। সরকারের দালালি করার মধ্যে বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতার কোনও সমস্যা তারা অনুভব করেননি। এটাই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির চিরাচরিত ঘরানা।
VP Election
সঙ্ঘী বনাম সংবিধান পন্থী

×
Comments :0