অযোধ্যার রাম মন্দিরে ভক্তদের দেওয়া টাকা ও অলঙ্কার দেদার চুরির ভয়ঙ্কর অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর চার সপ্তাহ কাটতে চলেছে। এতদিনেও সব বিষয়ে অতিরিক্ত কথা বলা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এ সম্পর্কে টু শব্দটিও করলেন না। কয়েক শত বছরের প্রাচীন বাবরি মসজিদ ভেঙে রাম মন্দির নির্মাণ ঘিরে গত কয়েক দশক ধরে সঙ্ঘ পরিবারের ছাতার তলায় সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় বিভাজনের যে রাজনীতি করে গেছে বিজেপি বস্তুত এই রাম মন্দির আন্দোলনই বিজেপি’র শক্তি ও প্রভাব বৃদ্ধির প্রধান হাতিয়ার। সারা দেশের রামভক্ত মানুষের সরল বিশ্বাস, আবেগকে রাজনৈতিক পুঁজি করে বিজেপি তাদের ক্ষমতার পরিধি বাড়িয়েছে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরঙ দল তথা আরএসএস’র ঘনিষ্ট ও বিশ্বস্তদের রেখে গঠন করা হয়েছে শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট। এই ট্রাস্টই মন্দির নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে। তেমনি ট্রাস্টের অধীনে ও নিয়ন্ত্রণে থাকা শতাধিক একর জমি, সেই গোড়া থেকে প্রতিদিন ভক্তদের দানের হাজার হাজার কোটি টাকা ও অলঙ্কারও এদের জিম্মায়। অর্থাৎ বিজেপি শাসিত রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের সৌজন্যে ট্রাস্ট কর্তারা সরকারের দেওয়া জমি এবং ভক্তদের দেওয়া অর্থ নিয়ে যথেচ্ছাচার করে গেছেন। যে প্রকল্প বা সংস্থাকে ঘিরে সঙ্ঘ পরিবার, কেন্দ্র-রাজ্যের শাসক দল এবং ডাবল ইঞ্জিনের সরকার নিবিড়ভাবে জড়িত সেই সংস্থায় এভাবে লুঠতরাজ চলতে পারে কেউ কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেনি। তাছাড়া যে ‘ভগবান’ রামের নামে এতকিছু সেই রামের নাম করে স্বঘোষিত রামভক্তরা যে রামের সম্পদ লুট করে নিজেদের আখের গোছাবে এটাও ভাবনার অতীত ছিল। অর্থাৎ দেশজুড়ে ভক্তরা যাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ভক্তিতে আবেগতাড়িত হয়েছেন, আন্দোলিত ও উন্মাদিত হয়েছেন সেই সরষের মধ্যেই ভূতেরা যে জাঁকিয়ে বসে আছেন তা তারা বিন্দুমাত্রও ভাবেননি। আজ রামভক্ত তো বটেই গোটা দেশের সাধারণ মানুষ বুঝে গেছেন তথাকথিত সনাতন নেতা রামভক্তরা ভক্তের মুখোশের আড়ালে আসলে দাগী অপরাধী। ধর্মবিশ্বাসীদের চোখে এরা সাধারণ অপরাধী নয়। তার চেয়েও বড় অপরাধী এরা নিজেদের রামভক্ত সনাতনী হিন্দু হিসাবে ভক্তদের বিশ্বাস অর্জন করেছে। অতঃপর ভক্তদের দেওয়া শত শত কোটি টাকার দান আত্মসাৎ করেছে। ভক্তদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে, বেইমানি করেছে।
নরেন্দ্র মোদীর হাতে প্রাণ সঞ্চারিত রামমূর্তি মন্দিরে থাকা সত্ত্বেও মন্দিরের কর্মীরা দিনের পর দিন টাকা চুরি করে যাচ্ছে। মন্দির পরিচালনার মাথায় বসে থাকা আরএসএস-ভিএইচপি নেতারা কোনও কিছু দেখেও দেখছেন না। তাহলে এই মন্দির প্রতিষ্ঠার এত আয়োজনের অর্থ কী? ভক্তদের রামভক্তিও অর্থহীন। নামে রাম আর রামমন্দির আসলে লুঠতরাজের ব্যবস্থাপনা। তাই মন্দির নির্মাণের প্রাক পর্ব থেকে নানা ধরনের অভিযোগ উঠেছে। কেন্দ্র বা রাজ্য কর্ণপাত করেনি। আজ পরিস্থিতি হাটে হাড়ি ভাঙার অবস্থায় চলে যাবার ফলে যোগী সরকার সিট গঠন করে তদন্ত করতে বাধ্য হয়েছে। তবে এটাও একরকম চোখে ধুলো দেওয়া। চুনো পুঁটিদের ধরে রাঘব বোয়ালদের আড়াল করা। সিটে কিছু হবে না। সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে সর্বোচ্চ পর্যায়ের তদন্ত দরকার। দরকার সিএজি-কে দিয়ে পুর্ণাঙ্গ অডিট। সত্যি সত্যি তদন্ত হলে ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে।
অবশ্য দায় এড়ানোর কোনও সুযোগ নেই প্রধানমন্ত্রীর, যতই তিনি নীরবতার আড়ালে লুকানোর চেষ্টা করুন। মনে রাখতে হবে ঘোর করোনার সময়ও যখন দেশজুড়ে লকডাউন পর্ব চলছে তখন মোদী মন্দিরের ভূমি পুজো করেছিলেন। লোকসভা ভোটের আগে মন্দির তৈরির জন্য আদাজল খেয়ে নেমেছিল ডাবল ইঞ্জিন। মোদী মন্দির উদ্বোধন করেছিলেন। রামের মূর্তিতে প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন। এখন এড়িয়ে পালালে চলবে কেন? জবাব তো মোদীকেই সবার আগে দিতে হবে।
Editorial
জবাব তো আগে মোদীকে দিতে হবে
×
Comments :0