প্রতীম দে
'ফুটবল শুধু ২২ জন খেলোয়াড়ের ৯০ মিনিটের খেলা নয়, এটি মানুষের ইতিহাস, রাজনীতি, প্রতিবাদ এবং স্বপ্নের গল্প।'
একটা বল। তাকে নিয়ে লড়াই। সে ঠিক করে দিচ্ছে কে সেরা আর কে নয়। ফুটবল। সাধারণ ভাবে শুনলে মনে হবে একটা খেলা। না ইতিহাস তা বলছে না। ফুটবল সব সময় হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের ভাষা, আত্ম-পরিচয়ের এক রূপগাথা।
বিশ্বকাপে কেপ ভার্দে বা ইকুয়েডরের কাছে যখন বড় দল আটকে যায় আমরা চমকে যাই। শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়, মাঠই হয়ে ওঠে ইতিহাসের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই, অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং বিশ্বমঞ্চে নিজের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার এক বিরল সুযোগ। তাই ফুটবলকে অনেকেই বলেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক খেলা।
বিশ্বকাপের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, ফুটবল বহুবার নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে। কখনও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, কখনও বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে, কখনও অর্থনৈতিক অসমতার বিরুদ্ধে, আবার কখনও বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর আধিপত্যের বিরুদ্ধে।
ফুটবল কেন প্রতিবাদের ভাষা?
অন্যান্য অনেক খেলার তুলনায় ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয়। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশ এই খেলার সঙ্গে যুক্ত। ফলে বিশ্বকাপ এমন একটি মঞ্চ, যেখানে একটি ছোট দেশও একই আলোয় দাঁড়ায় ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি কিংবা ইংল্যান্ডের পাশে।
এখানেই ফুটবলের শক্তি। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যাদের কণ্ঠস্বর দুর্বল, ফুটবলের মাঠে তারাই সমান মর্যাদায় দাঁড়ায়।
খেলার ভাষা এখানে রাজনৈতিক ভাষায় পরিণত হয়।
ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, ফুটবলাররা মাঠেই প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে হাঁটু গেড়ে বসা থেকে শুরু করে মানবাধিকার নিয়ে বার্তা ফুটবল সামাজিক আন্দোলনের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর কাছে বিশ্বকাপ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্বের অনেক দেশ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। অনেকের সামরিক বা রাজনৈতিক প্রভাবও নেই। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও তাদের নাম খুব কমই উঠে আসে। যেমন কেপ ভার্দে। স্পেনকে আটকে দেওয়ার পর সেই দেশকে নিয়ে শুরু হলো আলোচনা।
কিন্তু বিশ্বকাপ সেই বাস্তবতা বদলে দেয়।
যখন কেপ ভার্দে, মরক্কো, সেনেগাল, আইভরি কোস্ট, ঘানা কিংবা জর্ডানের মতো দেশ বিশ্বকাপে ভালো খেলে, তখন কোটি কোটি মানুষ প্রথমবার তাদের সম্পর্কে জানতে শুরু করে। একটি ম্যাচই একটি দেশের পরিচয় বদলে দিতে পারে।
ফুটবল তাই শুধু খেলাধুলা নয়, এটি এক ধরনের 'সফট পাওয়ার'। অস্ত্র নয়, গোল দিয়েই একটি দেশ বিশ্বকে জানিয়ে দেয়—‘আমরাও আছি’।
আফ্রিকার উত্থান, আত্মসম্মানের লড়াই
--------------
আফ্রিকার বহু দেশ দীর্ঘদিন ইউরোপীয় উপনিবেশ ছিল। স্বাধীনতার পরেও দারিদ্র, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈষম্যের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে।
ফুটবল সেখানে আশার আলো। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় হয় বিশ্বকাপ। সেবার প্রথম গোল এসেছিল দক্ষিণ আফ্রিকার এক খেলোয়ারের পা থেকেই। তাসাবালালা’র পা থেকে এসেছিল সেই গোল। তারপর মাঠে তাদের সেই নাচ এখনও অনেকে চোখে ভাসে। বুঝিয়ে দেয় সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের মুখের ওপর জবাব দেওয়ার আনন্দ। ম্যান্ডেলার দেশের লড়াইয়ের কথা।
২০২২ সালে মরক্কোর সেমিফাইনালে পৌঁছানো শুধু একটি ক্রীড়া সাফল্য ছিল না। সেটি ছিল আরব ও আফ্রিকার মানুষের সম্মিলিত গর্বের প্রতীক।
সেনেগাল ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল। ঘানা, ক্যামেরুন কিংবা আইভরি কোস্টও বারবার প্রমাণ করেছে যে ফুটবলের মানচিত্রে ইউরোপের একচেটিয়া আধিপত্য আর নেই।
লাতিন আমেরিকার ফুটবল: প্রতিরোধের ইতিহাস
--------------
লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর ফুটবল সংস্কৃতি রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
আর্জেন্টিনায় সামরিক শাসনের সময় ফুটবল ছিল মানুষের আবেগের আশ্রয়। দিয়াগো মারাদোনার 'হ্যান্ড অব গড' গোলকে অনেকে শুধুমাত্র ফুটবলীয় ঘটনা হিসেবে দেখেন না। ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই ম্যাচ বহু আর্জেন্টাইন নাগরিকের কাছে প্রতীকী প্রতিশোধের মুহূর্ত হয়ে উঠেছিল।
আজও আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলের ফুটবল শুধুই খেলা নয়; তা জাতীয় আত্মপরিচয়ের অংশ।
লাতিন আমেরিকা শিখিয়েছে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই। এখনও তারা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে নিজেদের সীমিত ক্ষমতার মধ্যে দিয়েই। তাদের হাতিয়ার ফুটবল। আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে মেসি যখন বিশ্বকাপের সর্বকালিন সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড তৈরি করেন তখন আসলে সেটা শুধু একটা রেকর্ড নয়। পিছিয়ে পড়া একটা অর্থনীতির লড়াইয়ের মানসিকতাকে শক্ত করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
এশিয়ার নতুন আত্মবিশ্বাস
-----------------
এক সময় বিশ্বকাপে এশিয়ার দলগুলিকে গুরুত্বই দেওয়া হতো না।
কিন্তু জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরব, ইরান কিংবা অস্ট্রেলিয়ার ধারাবাহিক উন্নতি সেই ধারণা বদলে দিয়েছে।
বিশ্বকাপে জাপানের জার্মানি ও স্পেনকে হারানো কিংবা সৌদি আরবের আর্জেন্টিনাকে হারানোর মতো ঘটনা দেখিয়েছে, ফুটবল এখন আর ধনী দেশগুলোর একচেটিয়া সম্পত্তি নয়।
এশিয়ার নতুন প্রজন্মের কাছে এই সাফল্য আত্মবিশ্বাসের প্রতীক।
কেপ ভার্দের গল্প: ছোট দেশের বড় স্বপ্ন
--------------
মাত্র কয়েক লক্ষ মানুষের দেশ কেপ ভার্দে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে উঠে ইতিহাস গড়েছে।
অর্থনৈতিকভাবে সীমিত সামর্থ্যের একটি দেশের জন্য এটি কেবল ফুটবল নয়, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের লড়াই।
বিশ্বের বড় বড় সংবাদমাধ্যম আজ কেপ ভার্দের কথা লিখছে। পর্যটন, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতির ক্ষেত্রেও এমন সাফল্যের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে।
এটাই ফুটবলের প্রকৃত শক্তি।
ফুটবল মানুষের ভাষা
বহু দেশে রাজনৈতিক সভায় যত মানুষ হয়, তার চেয়ে বেশি মানুষ ফুটবল ম্যাচ দেখে।
কারণ ফুটবল ভাষা, ধর্ম, জাতি কিংবা সীমান্ত মানে না। একটি গোল যেমন আনন্দের ভাষা, তেমনি একটি জয় হয়ে উঠতে পারে প্রতিবাদের ভাষা। এই কারণেই ফুটবল বিশ্বজুড়ে মানুষের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক সংযোগ।
ফুটবলকে শুধুমাত্র খেলা হিসেবে দেখলে তার অর্ধেক গল্পই দেখা হয়। এটি একই সঙ্গে প্রতিবাদ, আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার।
বিশ্বকাপের প্রতিটি আসর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট দেশও বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের গল্প বলতে পারে। সেই গল্প কখনও গোলের, কখনও স্বপ্নের, কখনও সংগ্রামের।
আর তাই ফুটবলের আসল সৌন্দর্য ট্রফিতে নয়, বরং সেই ক্ষমতায় যা একটি পিছিয়ে পড়া দেশকে বিশ্বের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখায়, আর নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠকে বিশ্বজুড়ে পৌঁছে দেয়।
Comments :0