নয়া উদারবাদের রাজনৈতিক প্রতিফলন হলো নয়া ফ্যাসিবাদ। আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজি নিয়ন্ত্রিত নয়া উদারবাদে বাড়ছে বেকারির সঙ্কট, বাড়ছে কর্পোরেট লুট, বাড়ছে বৈষম্য। শ্রমজীবীর দাবি আদায়ের সুযোগ কমছে। এই ব্যবস্থাকেই টিকিয়ে রাখে নয়া ফ্যাসিবাদ। তার বিরুদ্ধে লড়াই অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক। লড়াই মতাদর্শেরও।
শনিবার কলকাতায় প্রমোদ দাশগুপ্ত ভবনে আলোচনা সভায় একথা বলেছেন সিপিআই(এম) নেতৃবৃন্দ। সভাপতিত্ব করেছেন সিপিআই(এম) কলকাতা জেলা সম্পাদক কল্লোল মজুমদার। বক্তব্য রেখেছেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আভাস রায়চৌধুরী।
রায়চৌধুরী বলেছেন, নয়া ফ্যাসিবাদ নিজের পক্ষে সম্মতি তৈরির চেষ্টা করে। সে কারণে ইতিহাসকে বিকৃত করে নিজের মতো করে পেশ করে। বহুত্ববাদী ধারণাকে আঘাত করে। ফলে শ্রমিক শ্রেণিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। শ্রমিক শ্রেণির সঙ্গে সম্পর্ক নিবিড় করতে হবে। তিনি বলেন, শ্রমিক শ্রেণির শক্তি জোরালো হলে অন্য অংশগুলিও শামিল হবে।
এদিন আলোচনার বিষয় ছিল ‘আধা ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস থেকে নয়া ফ্যাসিবাদী আক্রমণের মোকাবিলা’।
রায়চৌধুরী বলেন, নয়া উদারবাদ আজ ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রকে বাড়িয়ে শ্রমজীবীকে কাজ দিতে পারে না। আর্থিক ক্ষেত্রের বৃদ্ধি হচ্ছে। কিন্তু তার প্রতিফলন নেই উৎপাদন ক্ষেত্রে। তিনি বলেন, সত্তরের দশকের আধা ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই নেই। সেই লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা জানতে হবে। দেশে সে সময়েও অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সংকটের প্রতিফলন ছিল জরুরি অবস্থা। তার বিরুদ্ধে লড়াই করে বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়েছিল। তারপর থেকে পৃথিবীর বহু পরিবর্তন হয়েছে। সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
তিনি বলেম, নয়া উদারবাদের সঙ্কট ব্যবস্থাজনিত। উৎপাদন ক্ষেত্রকে সংকুচিত করে আসলে বাজারকেই সংকুচিত করেছে। ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট তখনও ভারতকে ততটা প্রভাবিত করেনি। কারণ সরকার তখনও ভিত্তি ক্ষেত্রগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করত। ২০১৪’র পর থেকে নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বেশি মাত্রায়। ফলে প্রভাব পড়ছে সরাসরি।
তিনি বলেন, ২০১৪’র পর দেখা গিয়েছে প্রতিবাদের কন্ঠরোধ করতে একের পর এক আইনকে ব্যবহার করছে। রাজনৈতিক হিন্দুত্বের শিকড় সমাজে আরও গভীর হয়েছে শেষ বারো বছরে। আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগে আরএসএস’র দখল বেড়েছে। মিডিয়া, সোশাল মিডিয়া বিকল্প ভাষ্যের জায়গা ছিল। শেষ পাঁচ-সাত বছরে সেখানেও নিয়ন্ত্রণ। ক্ষতি হচ্ছে সাংবিধানিক গণতন্ত্রের কাঠামোর। সাম্রাজ্যবাদের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের অবস্থান লঘু হয়েছে। আরেকদিকে বেপরোয়া গতিতে কর্পোরেট তোষণ চলছে। বাড়ছে বৈষম্য। সঙ্কটে জনগণ।
সভায় সিপিআই(এম) রাজ্য কমিটির সদস্য তরুণ ব্যানার্জি জানান যে প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার কর্মসূচি চলছে। বিভিন্ন এলাকায় সভা হয়েছে। এদিন আলোচনা সভায় ছিলেন রাজ্য কমিটির সদস্য সুদীপ সেনগুপ্ত, ফৈয়াজ আহমেদ খান সহ নেতৃবৃন্দ।
রায়চৌধুরী বলেন, এরাজ্যে আমাদের লড়াই কেবল শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের বিরুদ্ধে না। আসল লড়াই পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির লুটের বিরুদ্ধে।
নির্বাচনের পরের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন কল্লোল মজুমদার। তিনি বলেন, হতাশা যেমন আছে, তেমন পনের বছরের জগদ্দলের শাসন থেকে আপাততভাবে খোলামেলা ভাবে কাজ করার সুযোগ এসেছে। বামপন্থী অনুগামী অংশের মধ্যে আপাত স্বস্তির মনোভাব রয়েছে। কিন্তু যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হলো তারা কারা। নয়া উদারনীতির না পাওয়া অস্থায়িত্ব তৈরি করেছে। শ্রমজীবীর আন্দোলন সংগ্রাম বেড়েছে। সে ঘটনা কর্পোরেট পুঁজিবাদী শাসককে চিন্তিতও করেছে। তারা যে শাসন করতে চায় তার বিরুদ্ধে প্রধান বাধা বামপন্থী শক্তি। যে শক্তি এখন আসীন তাদের দীর্ঘসময় ধরে মতাদর্শগত অবস্থান এবং কার্যকলাপ আছে। সে মতাদর্শ একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থবাহী, সাম্রাজ্যবাদের অনুগামী দোসর।
মজুমদার বলেন, আজকের পরিস্থিতিতে আমাদের সময় এতটুকু নষ্ট না করে নামতে হবে। হিন্দুত্বের রাজনীতিকে চাপিয়ে দিতে মতাদর্শগত আক্রমণ বাড়াবে। আমাদের প্রস্তুতিও বাড়াতে হবে। বামপন্থীদের বাইরেও বিভিন্ন অংশকে সমবেত করতে হবে। দেশভাগের ইতিহাসকে বিকৃত চেহারায় পেশ করার চেষ্টা করবে। তারই পালটা ভাষ্য দিয়ে প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরতে হবে।
Comments :0