Editorial

বিভাজনই পাখির চোখ

সম্পাদকীয় বিভাগ

বাংলায় প্রবাদ আছে দুরাত্মার ছলের হভাব হয় না। লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য যদি অসৎ হয় তাহলে সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে ছলাকলায় পারদর্শী হবে সেটাই স্বাভাবিক। ২০ জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসাবে পালন করার পেছনে যেমন অসৎ ও  সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ আছে তেমনি আচমকা ঐ দিন কলকাতার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা সোরাবর্দি অ্যাভেনিউ’র নাম বদল করে গোপাল মুখার্জি রোড করার পেছনেও সেই একই অসৎ ও সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে আছে। রাজ্যের নতুন সরকার যেহেতু আরএসএস’র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সরকারি নীতি, পরিকল্পনা ও প্রকল্প রূপায়ণে বদ্ধপরিকর তাই মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানোর পাশাপাশি ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে তীক্ষ্ণ ও তীব্র করাই শেষ কথা।
কলকাতার কোনও রাস্তার নাম পরিবর্তন করতে হলে তার জন্য একটা গণতান্ত্রিক বোঝাপড়া এবং নাগরিক সমাজের মূল্যবান পরামর্শ জরুরি। এটা কোনোভাবেই ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে হওয়া উচিত নয়। সোরাবর্দির নাম ছেঁটে গোপাল মুখার্জির নাম করার কাজটা যদি গোপনে সেরে না ফেলে বিধগ্ধ নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলোচনা করে করা হতো তাহলে এমন উদ্ভট, অবাস্তব এবং নির্বোধের মতো হতো না। তাছাড়া কলকাতা কর্পোরেশনের নামে নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরই মুখ্যমন্ত্রী এবং শিক্ষা মন্ত্রী যেভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তাতে পরিষ্কার বিভাজনের অ্যাজেন্ডাই ছিল এর মূলে। স্বাধীনতার প্রাক্কালে দেশ ও বাংলা বিভাজনের আবহে এবং ১৯৪৬ সালের কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনাকে সামনে রেখে এই নাম বদলের ঘুঁটি সাজানো হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী পরোক্ষে পরিষ্কার করে দিয়েছেন যার নামে রাস্তা ছিল তিনি সেই সোরাবর্দি যিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলা প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী, পরবর্তীকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হুসেন শহীদ সোরাবর্দি। তেমনি যার নামে নতুন নামকরণ হয়েছে তিনি বৌবাজার অঞ্চলের একজন মাংস বিক্রেতা গোপাল মুখার্জি (গোপাল পাঁঠা নামে বেশি পরিচিত)। ঘটনাচক্রে দাঙ্গার সময় বৌবাজার এলাকার একাংশ মানুষের রক্ষাকর্তার ভূমিকা পালন করেছেন।
বাস্তবে মুখ্যমন্ত্রী যে সোরাবর্দির কথা বলতে চেয়েছেন সেই সোরাবর্দি’র নামে কলকাতায় কোনও রাস্তার নাম নেই। নাম আছে সেই সোরাবর্দির যিনি ছিলেন বিদগ্ধ পণ্ডিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম উপাচার্য (১৯৩০-৩৪)। ব্রিটিশদের দেওয়া স্যার সম্মানে ভূষিত ডাক্তার ‘হাসান সোরাবর্দি’। নতুন মুখ্যমন্ত্রী ও শিক্ষা মন্ত্রীর অজ্ঞতার কারণে জানা না থাকতে পারে তবে নাগরিক সমাজের বিশিষ্টদের সঙ্গে কথা বললেই জানতে পারতেন। তারা সেটা করেননি সম্ভবত আরএসএস’র পরামর্শে। সত্যকে চাপা দিয়ে মনগড়া মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে সাম্প্রদায়িক বিভাজন‍‌ই ছিল যেহেতু তাদের পাখির চোখ চুপিসারে সারা হয়েছে পালটানোর কাজ। কিন্তু তাদের বোঝাতে নীরব মোদী আর নরেন্দ্র মোদী যেমন এক নয় তেমনি হুসেন সোরাবর্দি ও হাসান সোরাবর্দিও এক নয়।
সরকার নিযুক্ত কোনও প্রশাসকের কাজ দৈনন্দিন কাজ চালানো। রাস্তার নাম বদলানোর কাজ তার এক্তিয়ারের বাইরে। ভায়া সরকার আরএসএস’র হুকুম তিনি তামিল করেছেন। তাছাড়া চূড়ান্ত অব্যবস্থা ও অচলাবস্থার মধ্যে রাস্তার নাম বদলকে অগ্রাধিকার আহাম্মক ছাড়া কেউ দিতে পারে না। আবার গোপাল মুখার্জি কোনোদিন হিন্দু মহাসভা বা শ্যামাপ্রসাদের অনুগামী ছিলেন না। কংগ্রেসের সঙ্গেই ছিল তার ঘনিষ্ঠ যোগ। অতীতের ঘটনা ঘেঁটে সাম্প্রদায়িক উসকানির রসদ সংগ্রহ করতে হালে আরএসএস-বিজেপি গোপাল মুখার্জির সনাতনী হিন্দু ভাবমূর্তি নির্মাণের চেষ্টা চালাচ্ছে।

Comments :0

Login to leave a comment