Mumbai Slum and Seabeach

ঘর যেন চুল্লি, সমুদ্রসৈকতে ঘুমাতে হচ্ছে মুম্বইয়ের বস্তিবাসীদের

জাতীয়

ঘরে এসি নেই, জায়গাও নেই পুরো পরিবারের। রাতে ঘুমানোর ভরসা সমুদ্রতট।

“আমরা রাতে সমুদ্রসৈকতে আসি কারণ এখানে না ঘেমে একটানা কয়েক ঘণ্টা ঘুমানো যায়।” 
এমনটাই বলছিলেন সুরেখা বাচ্ছে। দিনের বেলা তিনি মুম্বাইয়ের উত্তর-পশ্চিম শহরতলির সেভেন বাংলোস ও তার আশেপাশের এসি লাগানো বাড়িগুলোতে গৃহপরিচারিকার কাজ করেন,  রাতে ভারসোভা সমুদ্রসৈকতের পাশেই অবস্থিত ‘সাগর কুটির’-এ নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। তাঁর রান্নাঘরে একটা এগজস্ট ফ্যানও নেই।
সাগর কুটির বস্তির টিনের চাল, সরু জানালা, অপর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ১৫০ বর্গফুটের ঘরগুলোতে এক একটি পরিবার গাদাগাদি করে থাকে। সেখানে কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায়, তীব্র গরমে এই ঘরগুলো যেন দমবন্ধ করা চুল্লিতে পরিণত হয়।


এই বছর মৌসুমি বায়ুর খামখেয়ালি ও ‘এল নিনো’র (প্রশান্ত মহাসাগরের জলরাশির তাপমাত্রা বৃদ্ধি, যা বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে) প্রভাবে মহারাষ্ট্রে বৃষ্টিপাতের দেখা তেমন মিলছে না। মুম্বাইয়ে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে ভ্যাপসা ও অস্বস্তিকর আবহাওয়ার মধ্যে রয়েছে। গত মাসে দিল্লিতে যেমনটা দেখা গিয়েছিল, তীব্র গরমের সময় রাতের বেলাটাই সবচেয়ে কষ্টদায়ক হয়ে উঠেছিল সেখানকার মানুষের জন্য। বিশেষ করে ঘিঞ্জি ও পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নেই এমন বাড়িঘর সূর্যাস্তের পরেও ঠান্ডা হয় না।
সুরেখার  মতো ‘সাগর কুটির’-এর বহু পরিবারের বাসিন্দারাই রাত ১১টার দিকে ভারসোভা এলাকার পেছনের সরু গলিগুলোতে রাতের খাবার-শেষ রুটিটুকু খাওয়া শেষ করে ও বাসনপত্র ধোয়ার পর সমুদ্র সৈকতের দিকে হাঁটতে শুরু করে। পুরুষরা স্লিভলেস গেঞ্জি ও হাফপ্যান্ট পরে, নারীরা নাইটগাউন গায়ে, আর শিশুরা চোখ কচলাতে কচলাতে কিংবা কখনো কখনো বাবা- মা কোলে শিশুকে নিয়ে বেরিয়ে আসেন। 
কেউ কেউ সঙ্গে করে নিয়ে আসেন হাতে বোনা মাদুর, আবার কেউ আনেন পুরোনো গালিচা,পাতলা চাদরও। সমুদ্র থেকে আসা বাতাস গায়ে লাগার মতো কাছে।  জল থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে বালির ওপর সেগুলো বিছিয়ে তাঁরা খোলা আকাশের নিচে রাতের জন্য আস্তানা গড়ে তোলেন সেখানেই।
তবে খোলা আকাশের নিচে ঘুমানোর এই সাধারণ বিষয়টিই এখন ভারসোভা সমুদ্রসৈকতকে এক শ্রেণি-সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত করেছে। সেই সঙ্গে উসকে দিয়েছে পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রশ্নকে। রয়েছে আরেক প্রশ্ন। মুম্বাইয়ের সর্বজনীন স্থানগুলো ব্যবহারের অধিকার আসলে কাদের। এই নিয়ে বিভিন্ন মহলে চলছে আলোচনা।
গত সপ্তাহে ভাইরাল হওয়া একটি ‘এক্স’পোস্টে বলা হয়েছে, “যদি আপনার থাকার মতো জায়গা না থাকে, তবে দয়া করে মুম্বাই ছেড়ে চলে যান।” এরপর থেকে শহরের অপেক্ষাকৃত বিত্তবান বাসিন্দারা সমুদ্রসৈকতে মানুষের ঘুমানোর ছবি শেয়ার করে ‘অবৈধ দখল’ ও ‘বিহারিফিকেশন’ (শহরটি বিহারের মতো হয়ে যাওয়া)-এর অভিযোগ তুলেছেন। আসলে এখানে অনেকেই বিহার থেকে আসা পরিযায়ী।
এই নেট নাগরিকদের মধ্যে কেউ কেউ আবার এই বিষয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে তাঁদের সেই পোস্টে ট্যাগ ও করেছেন। আপত্তি সমুদ্র সৈকত ‘দখলে’।
‘এক্স’ -এ করা একটি পোস্টে অভিযোগ করা হয়েছে যে, সমুদ্রসৈকতে ‘সাগর কুটির’ অর্থাৎ নিকটবর্তী সরকারিভাবে চিহ্নিত বস্তি থেকে আসা মানুষের ভিড় থাকায় সাধারণ মানুষের পক্ষে ভারসোভা সমুদ্রসৈকতে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে সাগর কুটির-র এই ‘বহিরাগত’রা মুম্বাইকে সচল রাখার মূল চালিকাশক্তি। ওই বস্তিতে থাকা মানুষরাই দক্ষিণ মুম্বাইয়ের অফিসগুলোতে দুপুরের খাবার পৌঁছে দেওয়া, সকালের ব্যস্ততার মাঝে অটোরিকশা চালানো  কিংবা সমুদ্রতীরবর্তী খোলামেলা ফ্ল্যাটগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কাজ করেন। এই মানুষগুলির কাছে সমুদ্রসৈকত কোনও বিনোদনের জায়গা নয়, বরং মুম্বাইয়ের অসহনীয় গরম থেকে সাময়িক স্বস্তি পাওয়ার এক প্রয়োজনীয় আশ্রয়। শহরের কেউ কেউ দিন-রাত একাধিক এসি চালিয়ে রাখতে পারেন। অপরদিকে, অনেকে সমুদ্রতীরে মাদুর পেতে শুয়ে থাকেন এই আশায় যে, ভোরের আলো ফোটা পর্যন্ত হয়তো একটু ঠান্ডা হওয়া পাওয়া যাবে যাতে তারা স্বস্তিতে ঘুমাতে পারেন।

Comments :0

Login to leave a comment