STORY | WORLD CUP | SOURISH MISHRA | NATUNPATA | 4th YEAR | 20 JUNE 2026

গল্প | বাবা-মেয়ের গল্প | সৌরীশ মিশ্র | নতুনপাতা | ৪র্থ বর্ষ | ২০ জুন ২০২৬

নতুনপাতা/মুক্তধারা

STORY  WORLD CUP  SOURISH MISHRA  NATUNPATA  4th YEAR  20 JUNE 2026

গল্প | ওয়ার্ল্ড কাপ

         সৌরীশ মিশ্র

নতুনপাতা | ৪র্থ বর্ষ | ২০ জুন ২০২৬

 

গভীর রাত।
ঘর অন্ধকার করে বাড়ির ড্রয়িং রুমে বসে টিভি দেখছি। টিভির সাউন্ড মিউট করা। চোখ আমার সরছে না এক মুহূর্তের জন্যও টিভির পর্দা থেকে। যেন এক জাদুবলে আটকে গেছে আমার দু'চোখ ঐ টিভির স্ক্রিনেই। সেই জাদু, কিসের জাদু, তা আমি জানি। ফুটবলের জাদু। ও যা:, বলতেই তো ভুলে গেছি আপনাদের, কি দেখছি টিভিতে! ওয়ার্ল্ড কাপের একটা ম্যাচ দেখছি। কাল অফিস আছে, তবুও দেখছি। আমার প্রিয়তম টিমের এই ওয়ার্ল্ড কাপে ফার্স্ট ম্যাচ এটাই। না দেখে থাকা যায় বলুন? 
পাশের ঘরে আমার স্ত্রী কেয়া আর মেয়ে কুঁড়ি ঘুমোচ্ছে। কেয়ার স্পোর্টসে বিন্দুমাত্রও ইন্টারেস্ট নেই। ওর আগ্রহের বিষয় সিনেমার জগত। অন্যদিকে, আমার মেয়ের খেলাধুলায় ইন্টারেস্ট গড়ে উঠছে একটু একটু করে। সম্ভবত আমাকেই দেখে-দেখে। কুঁড়ির খুব ইচ্ছা ছিল আমার সাথে আজকের খেলাটা দেখে। অনেকক্ষণ জেগেও ছিল। কিন্তু, ঘুমিয়ে পড়ল ম্যাচ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগে। আর পারলো না জেগে থাকতে। সারাদিন যা দস্যিপনা করে! ওরা ঘুমোচ্ছে, তাই ঘরের জ্বলা আলোয় আর টিভির সাউন্ডে যাতে ওদের ঘুমের ব্যাঘাত না হয়, ঘরের আলো নিভিয়ে, টিভির সাউন্ড অফ্ করে, খেলা দেখছি।
যাই হোক, ম্যাচের হাফ-টাইম ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। দারুণ খেলছে আমার দল। এক গোলে  এগিয়ে আছি আমরা। এই মুহূর্তে, আবার বল নিয়ে এগোচ্ছে আমার দলের "দ্য বেস্ট প্লেয়ার"। একের পর এক কাটিয়ে যাচ্ছে সে বিপক্ষের খেলোয়াড়দের। তিনজনকে ড্রিবল করে এই মুহূর্তে সে অপনেন্টের পেনাল্টি বক্সের মধ্যে। সামনে একজন মাত্র ডিফেন্ডার। তাকেও কাটিয়ে ফেলল সে। এখন সে গোলের ঠিক সামনে। মাঝে শুধুই গোলকিপার। আমি তো উত্তেজনায় ফুটছি রীতিমত। গোল একপ্রকার যে নিশ্চিত।  কিন্তু, হায়! আমার দলের সেই সেরা ফরওয়ার্ড মারলোও দারুণ শট্। কিন্তু, বল গিয়ে লাগলো সোজা বার-পোস্টে। আর পোস্টে লাগা সেই বল মাঠে রি-বাউন্ড হয়ে ফিরে আসতেই বিপক্ষের গোলকিপার সেটা তালুবন্দী করতে ভুল করলো না। আমি নিজেকে সামলাতে না পেরে টানা বলে গেলাম ডান পাশে ঘাড় ঘোরাতে-ঘোরাতে, "বাবা, দেখলে, এতো ইজ়ি গোলটা হোলো না...!"
আর, বলেই খেয়াল হোলো, কাকে বলছি আমি! বাবা তো ক'মাস আগেই এইসব মায়া ত্যাগ করে না-ফেরার দেশে চলে গেছেন চিরকালের মতোন। বুঝতে অসুবিধা হয় না আমার একটুও, কেন মুখ ফসকে বলে ফেলেছি বাক্যটা। বাবা আমার, ফুটবল ভালোবাসতেন খুব। টিভিতে ফুটবল ম্যাচ হলেই আমি আর বাবা দু'জনে মিলে বসে দেখতাম ম্যাচ এই ঘরেই বসে। আর, খেলা দেখার সময় এই ধরনের কথা তো টুকটাক চলতেই থাকে। তাই, সেই অভ্যাসবশতই আজ বলে ফেলেছি যে কথাকটা, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।
বাবার সঙ্গে টিভিতে ম্যাচ দেখার হাজারো স্মৃতি ভিড় করে এলো মনে সাথে সাথেই। মুহূর্তে চোখের পাতা ভিজে উঠলো। দু'হাত দিয়ে চোখের জল মুছছি, "কি হয়েছে বাবা চোখে তোমার? চোখে কিছু পড়েছে? দাঁড়াও ফুঁ দিয়ে দিচ্ছি।" বলতে বলতে আমার সোফার পাশটায় এসে দাঁড়াল কুঁড়ি।
এই ঘরে ঢোকার দরজাটা আমার পিছনে। তাই কুঁড়ি যে ঘরে ঢুকেছে বুঝতেই পারিনি আগে।
"না রে, চোখে কিছু পড়েনি।" তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছে মেয়েকে বলি আমি।
"তো?" জিজ্ঞেস করে কুঁড়ি।
"চোখটা খচখচ করছিল, কেন জানি! এখন আর করছে না। ওসব ছাড়্! তা তুই ঘুম থেকে উঠে পড়লি? ঘুম ভেঙে গেল! বাথরুম যাবি?" কথা ঘোরাই আমি।
"না বাবা, বাথরুম পায়নি। খেলা দেখতে এলাম।"
"খেলা দেখবি? বস্ আমার পাশটায়।"
মেয়ে বসে সোফায়। আমার গা-এ হেলান দেয়।
"বাবা, ঐ তো মারাদোনা না?" মারাদোনাকে ভীষণ ভালোবাসে আমার মেয়ে। অনেকবার বলেছি, মারাদোনা নেই, তবু আর্জেন্টিনার জার্সি পড়া কাউকে খেলতে দেখলেই ও তাকেই মারাদোনা ঠাউরে বসে।
"না মা, ও মেসি।" বলি আমি।
"মেসি? মারাদোনা, না?"
"না মা। খেলা দ্যাখ্ এবার। ঐ দ্যাখ্, এইবার গোল হবে।" মেসিকে ফের বিপক্ষের পেনাল্টি বক্সের কাছে দেখে বলে উঠি আমি।
আর আমি বলতে না বলতেই, বলে এমন একটা শট্ মারল মেসি, যে সেটা বিপক্ষের গোলকিপারকে পরাস্ত করে সোজা জড়িয়ে গেল জালে।
আমি নিজেকে সামলাতে পারি না। দাঁড়িয়ে উঠে চেঁচিয়েই উঠি "গো...ল" বলে। আর আমার দেখাদেখি, মেয়েও তিড়িং করে সোফা থেকে নেমে চিৎকার করতে থাকে "গোল...গোল..." করে।
আমাদের এই গোলের সেলিব্রেশন মিনিট খানেক মতোন চলেছিল বোধহয়। এবং তা একটু বাড়াবাড়ি রকমই সম্ভবত হয়েছিল। কারণ, ঐ সেলিব্রেশনের মধ্যেই ঐ ঘরে এসে ঢুকল আমার বউ। "রাতে কি তোমাদের জ্বালায় নিশ্চিন্তে একটু ঘুমোতেও পারবো না?"
আমরা তখনও দাঁড়িয়ে। আমি মেয়েকে কাছে টেনে সোফায় গিয়ে বসলাম।
দু'জনেরই চোখ এখন টিভির দিকে নয়। কেয়ার দিকে। কারণ, আমরা বাপ-মেয়ে দু'জনই ভালোভাবেই ওকে জানি। এইটুকু বলেই ও থামবে না। আরো কিছুটা বকতে পারলে আমাদের, তবে ওর শান্তি হবে।
কেয়া বলে চলে, "সারাদিনের খাটাখাটনির পর, একটু কোথায় ঘুমোবো, তার উপায় আছে! রাত-বিরেতে ষাঁড়ের মতো চিৎকার করছে দু'জনই "গোল" "গোল" বলে!"
আরো কিসব বলতে যাচ্ছিল কেয়া, আমি আর সেই সুযোগই দিলাম না ওকে। বলে উঠলাম, "না:, একটু বেশিই চিৎকার হয়ে গেছে। তুমি যাও, আর চিৎকার করবো না, দেখো। চুপ করে খেলা দেখবো আমরা। যাও তুমি ঘুমোতে যাও।"
"আর ঘুম!" ঝাঁঝিয়ে ওঠে কেয়া। "ঘুম ভাঙিয়ে এখন বলছে ঘুমোতে যাও! যতোসব আদিখ্যেতা..." গজগজ করতে করতে কেয়া বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
"আদিখ্যেতা মানে কি বাবা?" মেয়ে আমার গায়ে আরাম করে ফের হেলান দিয়ে বসতে বসতে বলে।
"চুপ, চুপ। তোর মা শুনতে পেলে আর রক্ষে থাকবে না। পরে তোকে বলবো আদিখ্যেতা মানে।"
"বোলো কিন্তু মনে করে। ভুলে যেও না।" সিরিয়াসলি-ই বলে আমার মেয়ে।
"না না, ভুলবো না। এখন খেলা দেখতো। ঐ দ্যাখ্ মারাদোনা!" মুখ ফসকে বেড়িয়ে যায় আমার।
"মারাদোনা নাকি ও! এই তো একটু আগে বললে মেসি! কি যে বলো ছাই!" বলে কুঁড়ি।
"হ্যাঁ মা, একদম ঠিক বলেছিস। মেসি।"
এল এম টেন তখন ফের মাঝমাঠ থেকে উঠছে তার সতীর্থদের নিয়ে। 
আমি আর মেয়ে ডুব দিই আবার ওয়ার্ল্ড কাপ দেখায়।

Comments :0

Login to leave a comment