জয়ন্ত সাহা: মাথাভাঙা
রাজ্য সরকার পোষিত প্রাথমিক স্কুলের পড়ুয়াদের টেনে নিয়েই চলছে রাজবংশী ভাষা স্কুল! ২০২২ সালে স্কুলগুলির অনুমোদন হলেও পার্শ্ব শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে ২০২৪ সালের শেষের দিকে। কোন নূন্যতম পরিকাঠামো ছাড়াই চলছে রাজবংশী ভাষার স্কুলগুলি!
মাথাভাঙা শহর থেকে হাজরাহাট -২ গ্রাম পঞ্চায়েত অফিস পেরিয়ে কয়েক কিলোমিটার যাবার পর বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করার পর অবশেষে খোঁজ মিললো ভাঙামোরের গুনধর বর্মন রাজবংশী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। স্কুল মানে একটা ১০ বাই ৮ ফুটের টিনের চালা। টিনের দরজায় তালা ঝুলছে। ঘড়িতে তখন শনিবার সকাল ৯ টা। মর্নিং স্কুল। এই সময় স্কুল খোলা থাকারই কথা।যে বাড়িতে ঢোকার মুখে এই স্কুল সেই বাড়িতে অনেক ডাকাডাকির পর বেড়িয়ে এলেন, অশ্বীনি বর্মন। জানালেন তাঁর স্ত্রী স্কুলের পার্শ্ব শিক্ষিকা। জানালেন একটু আগেই যে দুজন ক্লাস ওয়ানের পড়ুয়া এসেছিল তাদের ছুটি দিয়েছেন। স্কুল ঘরের দরজা খুলতেই দেখা গেল এক দিকে কাঠের তক্তোপোষ! তাতে বড়জোর ১০ জন পড়ুয়া বসতে পারবে। ঘরের এক কোনে ডাঁই করে রাখা রাজবংশী ভাষায় ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস ফোরের বই।
স্কুলের পার্শ্ব শিক্ষিকা প্রণতী রায় বসুনীয়া জানালেন স্কুলে খাতায় কলমে ৬৫ জনের নাম আছে। অথচ উপস্থিত আছে মাত্র ২ জন! জবাবে জানালেন, আসলে স্কুলে যারা আছে তারা সবাই প্রাথমিক স্কুলের পড়ুয়া।তাদেরকেই এই স্কুলে ভর্তি নেওয়া হয়েছে! এখন উত্তরবঙ্গে সব স্কুলে সকালে ক্লাস হচ্ছে। তাই আমাদের "মর্নিং স্কুলে ২ /৪ জন পড়ুয়ার বেশি আসে না! অন্য সময়ে ৮/১০ জন আসে। যারা আবার অন্য প্রাথমিক স্কুলের পড়ুয়া।
শুধু এই স্কুলেই নয় সব রাজবংশী স্কুলেরই নিজস্ব কোন বাড়ি নেই। স্কুলে মিড ডে মিল নেই। চক ডাস্টার, ব্ল্যাকবোর্ড নেই। দু চারটি স্কুলে পার্শ্ব শিক্ষকেরা নিজেদের বেতন থেকে এসব কিনেছেন। কারুর সেটাও কেনা হয় নি। সাইনবোর্ডে লেখা স্কুলটি ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আশেপাশের প্রতিবেশীরা অবশ্য অন্য কথা বলছেন, তাদের বক্তব্য এই চালাঘরটি বছর চারেক আগে বাড়ির মালিক তৈরি করেছে। আশেপাশের বাড়ির বাচ্চারা এই স্কুলে মাঝে মধ্যে গেলেও সবাই সরকারি প্রাথমিক স্কুলেই পড়ে। এটাকে কেউই সরকারি স্কুল বলে এখনো মনেই করেন না স্থানীয়রা।
শিক্ষিকা প্রণতী রায় বসুনীয়া জানালেন, ২০২৪ সালের ৩১ নভেম্বর তারা স্কুলের শিক্ষিকার চাকরীর এপয়েন্টমেন্ট লেটার পেয়েছেন। জেলা স্কুল বোর্ড তাদের স্কুলের দেখভাল করেন। প্রতিমাসে ব্যাঙ্ক একাউন্টে ৮ হাজার টাকা বেতনের টাকা ঢুকে যায়। প্রধান শিক্ষক পান ১০ হাজার টাকা।
যার নামে স্কুল তার ছেলে অশ্বীনি বর্মন বলেন, স্কুলের জন্য ১৫ শতক জমি দান করেছি। কিন্তু সেখানে তো স্কুল হল না। কবে হবে বুঝতেও পারছি না।
মাথাভাঙার ছাট পখিহাগা বিনন্দ সরকার রাজবংশী ভাষা প্রাইমারী স্কুলও চলছে শুশীল সরকারের বাড়িতে একটি এসবেসটাসের একচালা ঘরে। স্কুলের পার্শ্ব শিক্ষক উত্তম শীল বলেন, আমাদের স্কুলের জন্য বাড়ির জন্য জায়গা থাকলেও সরকারি বরাদ্দ নেই।
স্কুলের পার্শ্ব শিক্ষিকা মাধবী বর্মন বলেন, আমাদের নিজস্ব স্কুলবাড়ি করে দিক সরকার।
প্রতিবেশীদের বক্তব্য এই স্কুলের পড়ুয়া হিসেবে যাদের নাম আছে তারা প্রত্যেকেই কোন না কোন প্রাথমিক স্কুলের পড়ুয়া। রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষদের আস্থা অর্জন করতে পারে নি এই স্কুলও।
২০২২ সালে তৎকালীন রাজ্য সরকার উত্তরবঙ্গে ১৯৮ টি রাজবংশী স্কুলের অনুমোদন দেয়। এই স্কুল গুলির জন্য রাজ্য সরকার কোন শিক্ষক নিয়োগ না করে ৩৯৪ জন চুক্তি ভিত্তিক পার্শ্বশিক্ষক ও ৩৯০ টি অশিক্ষক কর্মীর পদ তৈরি করে রাজ্যপালের নির্দেশ অনুসারে। ২০২৪ সালের শেষের দিকে স্কুল গুলি অনুমোদন পায়। সব স্কুলই বংশীবদন বর্মনের সংগঠনের সদস্যরা আগে থেকেই অর্গানাইজ করছিল বলে কাগজে কলমে দেখানো হয়েছে এবং অনুমোদন পেয়ে গেছে। অনুমোদন পাবার পরেও স্কুলগুলি রাজবংশী ভাষা শিক্ষার জন্য কোন কাজেই লাগছে না!
অভিযোগ স্কুলগুলির পরিকাঠামো গড়ায় রাজ্য সরকার কোন পদক্ষেপ নেয় নি। স্কুল গুলিতে পড়ুয়া সংখ্যাও হাতে গোনা। এক সময়ে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রক স্কুল বাড়ি গড়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও সে প্রতিশ্রুতি পালন করা হয় নি। এই স্কুলগুলিতে যারা নিযুক্ত হয়েছে তারা তৃণমূল ঘনিষ্ঠ গ্রেটার কোচবিহারের নেতা বংশীবদন বর্মন অনুগামী বলেই অভিযোগ। এই চুক্তি ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও রাজবংশী সম্প্রদায়ের বেকার যুবকদের মধ্যে বিক্ষোভ রয়েছে। এখন বংশীবদন বিজেপি জোটের শরিক। এবার কি বিজেপি সরকার এই স্কুলগুলির পরিকাঠামো উন্নয়ন করবে?
সম্প্রতি রাজবংশী স্কুল নিয়ে রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন "এনজিও স্কুল" মন্তব্য করায় বংশীবদন বর্মনের গ্রেটার কোচবিহার প্রকাশ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেছে। বিধানসভা ভোটে বংশীবদন বর্মনের গ্রেটার কোচবিহার বিজেপির হাত ধরেছে। কোচবিহারের নাটাবাড়ি কেন্দ্রে বিধায়ক হয়েছেন গিরিজা শংকর রায়।তিনি শিক্ষামন্ত্রীর মন্তব্যের পরেও তিনি তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, "যারা এই স্কুলের বিষয়ে আপত্তিকর ও বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচার করছেন, তাদের জনসমক্ষে কথাগুলো প্রত্যাহার করে নেওয়া উচিত। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী না জেনেই মন্তব্য করেছেন। না জেনে এসব বলা উচিত নয়।" তোপ দেগেছেন গ্রেটার নেতা বংশীবদন বর্মনও। তিনি বলেছেন, মন্ত্রীসভার অনুমোদন পাওয়া স্কুলগুলিকে এনজিও-র স্কুল বলা ঠিক নয়। ওনার ভুল স্বীকার করা উচিত। এখন দেখার শিক্ষা মন্ত্রী ভুল স্বীকার করেন কিনা। তবে রাজবংশী ভাষা শিক্ষার জন্য পূর্বতন সরকারের অনুমোদিত স্কুল গুলি রাজবংশী সম্প্রদায়ের নিজের স্কুল হয়ে ওঠে নি, এখনও সেটা স্পষ্ট।
Comments :0