post editorial

এসআইআর ট্রাইব্যুনালের বিপদ

উত্তর সম্পাদকীয়​

সমুদ্র রায়

 
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন শেষ, নতুন সরকার গঠন হয়েছে, বেশ কয়েকটি হাই-প্রোফাইল সাষ্টাঙ্গ প্রণামের পর আমরা আমাদের নির্বাচিত সরকার পেয়েছি। এখন আমরা উত্তেজিত, আয়ুষ্মান ভারত স্বাস্থ্যসাথীকে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে। যদিও আমরা ঠিক জানি না যে সবাই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে আয়ুষ্মান ভারতের সুবিধা পাব কিনা, কারণ আমরা সম্ভবতঃ ভাবিনি  যে আয়ুষ্মান ভারত সবার জন্য নয়। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার হয়েছে অন্নপূর্ণার ভাণ্ডার এবং ভাতা দ্বিগুণ হয়েছে। হু হু করে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থান হবে আর তার সাথে দ্বিগুণ ভাতাও চলবে তো? সরকারি বাসে মহিলাদের ভাড়া মকুব হয়েছে। কিন্তু সরকারি বাস কোথায়! সরকারি বাস পরিষেবা প্রায় বন্ধ অর্থাভাবে। অধিকাংশ চলে না, কর্মী নেই, আর অন্যদিকে মেয়েদের পড়াশোনা বা চাকরির জন্য বাড়ি থেকে বেরনোর দরকার নেই সেটা সারা ভারতের বিহার সহ নানা রাজ্যের বিজেপি সরকার দেখিয়ে দিয়েছে, কাজেই এই ঘোষণায় সরকারের আর্থিক দায় তেমন থাকছে না বটে।, ‘শব্দদূষণ’ নিয়ন্ত্রণের জন্য নিত্য মাইক বাজানোয় নিষেধাজ্ঞার কথা হয়েছে। তাহলে ধরে নেওয়া যায় এবারের পুজোয় নিশ্চয়ই উৎকট ডিজের আর মাইকের অত্যাচার থাকবে না সম্বৎসর নেতা-নেত্রীদের চিৎকার শোনারও দায় থাকবে না। তা নাহলে ধরে নিতে হবে এর উদ্দেশ্য অন্য, সংখ্যালঘুদের ধর্মস্থানে মাইকের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েমই লক্ষ্য। ধর্ম পালনের জন্য রাস্তাঘাট দখল করা যাবে না, শুধু রেড রোডের নমাজ নয় নিশ্চয়ই, রাস্তা দখল করে বালিগঞ্জ কালচারাল আর একডালিয়ার পূজোও এবার তাহলে বন্ধ হবে। কিন্তু কোথায় কি, মোদী মহাশয়ের যোগ দিবস উদ্‌যাপনের জন্য দশ দিন ধরে রেড রোড বন্ধ করা হলে সরকারি আদেশে। 
আরও আছে,  তপসিয়ার ‘বেআইনি’ নির্মাণ ভাঙতে ইতিমধ্যেই বুলডোজারের আগমন হয়েছে। এরপর নিশ্চয়ই বড়বাজার, চাঁদনি, পোদ্দার কোর্ট, আর বাগড়ি মার্কেট? নাকি ওগুলোর মালিকানা মুসলিমদের নয় বলে আলাদা হবে! শিল্পের প্রয়োজনে জমির ঊর্ধ্বসীমা আইনের বদল আসছে। বাংলার জমিহারা ক্ষুদ্র চাষি ন্যায্য ও উন্নত জীবিকার বদলি উপায় পাবেন তো! অর্থাৎ নতুন সরকারের এমন নানা ঘোষণা ও কার্যকলাপে ইতিমধ্যেই চারিদিকে প্রবল উল্লাস। এবং প্রবল উল্লাসে চাপা পড়ে যেতে বসেছে যে, ট্রাইব্যুনালে আবেদন করে নাম তোলার জন্য ৩৪ লক্ষ মানুষ ফর্ম জমা করেছেন। সর্বোচ্চ আদালতের অর্ডার অবশ্য দেখাচ্ছে যে এর সবটাই নাম তোলার জন্য নয়, এর মধ্যে নাম বাদ দেওয়ার আবেদনও নাকি আছে, যদিও সেটা অল্পই, তবুও কিভাবে কে জানে যেহেতু সফটওয়্যারে নাম বাদ দেওয়ার কোনও অপশন ছিল না! জানা নেই তারা আজকের তারিখে ঠিক কি অবস্থায় আছেন। সংবাদমাধ্যম বলছে যে কলকাতা উচ্চ আদালতের প্রাক্তন বিচারপতি টি শিবজ্ঞানম সহ অনেকেই পদত্যাগ করে সরে গিয়েছেন, কাজেই ট্রাইব্যুনালগুলো আর আদৌ বসছে কিনা বা বসবে কিনা, তাও কেউ আর খবর রাখে না। সংবাদ মাধ্যম মারফত জানা যাচ্ছে যে ১৮টির মধ্যে মাত্র ২টিতে মুখোমুখি শুনানি এখনও নাকি চলছে, তাও নানা কড়াকড়ি সহ, কিন্তু বাকিগুলো নিষ্ক্রিয়। আর ইতিমধ্যে নবনির্বাচিত সরকারের প্রধানেরা বলে দিয়েছেন যে, যাদের ভোটার তালিকায় নাম নেই, তাদের নাগরিক হিসাবে নানা প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার অধিকার থাকবে না। কাজেই ঠান্ডা মাথায় দেখলে বোঝা যায় যে শুধু ভোট নয়, এসআইআর আসলে বহু লক্ষ মানুষের ওপরে নামিয়ে আনা এক ভয়ংকর ধ্বংসযজ্ঞ। ৩৪ লক্ষ মানুষ, বেশিরভাগটাই গরিব, প্রান্তিক মানুষ, যাদের সরকারি সাহায্য ছাড়া জীবনধারণ বাস্তবিকই মুশকিল, এসআইআর’র হাতে ‘ছাঁটাই’ হওয়া এই এমন নাগরিকরা কিভাবে বাঁচবেন তা কেউ জানে না, কিভাবে মরবেন তাও অজানা! এবং অনেকেই সাধারণভাবে বিশেষ ভাবিত নয়, কারণ একটা রক্ষা কবচ তাদের হাতে আছে। তাছাড়া আমাদের স্মৃতিও ক্ষণস্থায়ী।  
এটা বলাই বাহুল্য যে, এসআইআর সন্দেহাতীতভাবে পশ্চিমবঙ্গের জন্য পরিকল্পিত একটি প্রকল্প এবং এমনভাবে পরতে পরতে একে কার্যকর করা হয়েছে যে অনেকেই সবটা ভালো করে বুঝে উঠতে পারিনি। যেমন বাংলার ভোটার তালিকা থেকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ৯১ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে কি? যদি বলি যে এসআইআর  শুরুর আগে ভোটার ছিলেন ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ আর এন্যুমারেশন ফর্ম জমা না করার জন্য বাদ গেছেন ৫৮.২ লক্ষ, ফর্ম জমা করেও পরে বাদ গেছেন সাড়ে ৫ লক্ষ, এবং ‘বিচারাধীন’ তালিকা থেকে বাদ গেছেন ২৭.২ লক্ষ, তাহলে সোজা অঙ্কে বাদ গেছেন প্রায় ৯১ লক্ষ। এখানে একটা সমস্যা হলো যে ফর্ম জমা না করার জন্য যারা বাদ গেলেন এবং পরের এক মাসে নিজেদের নাম খসড়া তালিকায় তোলার জন্য আবেদনও করলেন না, সেই ৫৮.২ লক্ষ মানুষকে মৃত, নিখোঁজ (ঠিকানায় পাওয়া যায়নি), স্থানান্তরিত, বা একাধিক জায়গায় ভোটার তালিকায় নাম আছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, এবং এইরকমভাবে নাম বাদ যাওয়ার ঘটনা যে সমস্ত রাজ্যে এসআইআর হয়েছে তার সর্বত্রই হয়েছে এবং আরও বেশি হারে হয়েছে, কাজেই এদের  নাম বাদ দেওয়াকে ষড়যন্ত্র বলা চলে কিনা এবং এই নাম বাদ দিয়ে তৃণমূল সরকারকে ভোটের শুরুতেই পেছনে ফেলে দেওয়া হয়েছে এমন দাবি তৃণমুলের পক্ষেও সম্মানজনক হয় কিনা, সেটা ভাবার প্রয়োজন আছে। বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ফর্ম জমা করেও ডিলিট হওয়া সাড়ে ৫ লক্ষ মানুষ আর শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের মধ্যেকার অত্যাশ্চর্যভাবে নিজের দেশে ‘বিচারাধীন’ অংশের বাতিল অংশ, অর্থাৎ ২৭.২ লক্ষ মানুষ, যারা সবমিলিয়ে প্রায় ৩৩ লক্ষ, এবং এরা সশরীরে উপস্থিত থেকেও এবং ভোট দিতে চেয়েও ভোট দিতে পারলেন না। তথ্য থেকে জানা গেছে যে এই মানুষেরা মোটামুটি রাজ্যের কয়েকটি বিশেষ বিধানসভায় ছড়িয়ে আছেন, এবং এদের বৃহাদাংশই মুসলমান এবং মহিলা। কেন জানি না মহিলারাই তাদের ঘর-পরিবার ছেড়ে বাংলাদেশ থেকে বা সুদূর মায়ানমার থেকে প্রাণ হাতে করে বেআইনিভাবে সীমানা পার করে এ রাজ্যে বসে আছেন! কে জানে, এই রহস্যের উত্তর হয়তো বাংলার বিজেপি-আরএসএস’র নেতাদেরই শুধু জানা আছে। 
প্রাথমিক প্রশ্ন হলো, এই যে ২৭.২ লক্ষ মানুষকে ভোট দিতে দেওয়া হলো না, তার সরাসরি প্রভাব ভোটে কতটা পড়ল। এই প্রশ্নের একেবারে সঠিক উত্তর পাওয়া বেশ কঠিন কিন্তু সবর ইনস্টিটিউট, টাইমস অব ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, কুইন্ট, দ্য ওয়্যার, নিউজলন্ড্রি, ইত্যাদি অনেকেই গত কয়েকদিনে এগুলো দেখেছেন এবং তাদের তথ্য থেকে একটা ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। প্রথমেই এটা দেখা জরুরি যে এমন ক’টা আসন আছে যেখানে জয়ের ব্যবধানের থেকে ভোট দিতে না পারা ভোটারের সংখ্যা বেশি, কারণ সেক্ষেত্রে বলা যায় এরা ভোট দিতে পারলে সেই আসনগুলোতে ফলাফল অন্যরকমও হয়ে যেতে পারত। এক্ষেত্রে ২৭ লক্ষ ভোটারের হিসাব নিয়ে যা দেখা যাচ্ছে তাতে সবাই একমত যে, ৪৯টি আসনে এরকম অনিশ্চয়তা আছে, যার মধ্যে বিজেপি জিতেছে ২৬টি, তৃণমূল জিতেছে ২১টি, কংগ্রেস জিতেছে ২টি। অর্থাৎ এসআইআর’র কারণে বিজেপি’র আসন ২৬টি বেড়ে থাকতে পারে। বোঝাই যাচ্ছে যে এতে করে সরকারের বদল আটকানো যেত না। কিন্তু ভোটে যে নানা কায়দায় নানা প্রক্রিয়া চালু ছিল তা ভোট পরবর্তীতে বোঝাই যাচ্ছে।
মানুষ যেহেতু পাটিগণিত নন, তাই এটাও মাথায় রাখা জরুরি যে এসআইআর’র সামাজিক, মানসিক প্রভাবও কতটা হয়ে থাকতে পারে। এসআইআর’র মাধ্যমে নাগরিকত্ব চলে যেতে পারে এমন প্রবল দুর্ভাবনা কাজ করেছে এমন অনেক মানুষের সাথে কথা বলে বুঝেছি যে, শেষমেশ ভোটার তালিকায় নাম ওঠায় তারা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন এবং অদ্ভুতভাবে অনেকেই মনে করেছেন যে, বিজেপি-কে ভোট দিলেই নিজের নাগরিকত্ব রক্ষা করা সবচেয়ে সহজ হবে! এছাড়া এমন মানুষের সংখ্যাও নিতান্ত কম নয় যারা বিজেপি-আরএসএস’র অন্তহীন প্রচারের শিকার হয়েছেন এবং মনে মনে ভেবেছেন যে, এইভাবে অনুপ্রবেশকারী তাড়ানো ভালো কাজ এবং ফলে এসআইআর-কে সমর্থন করেছেন। কাজেই সবকিছু মিলিয়ে মমতার সরকারের প্রতি প্রবল প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা ছাড়াও এবারের নির্বাচনের এই ফলাফলে এসআইআর  একটা বড় ভূমিকা রেখেছে একথা নিশ্চিতভাবেই বলা চলে।
তাই এসআইআর’র ষড়যন্ত্র এবং অত্যাচারকে ভুলে যাওয়া যাবে না কোনোমতেই। আর সেইজন্যই ভোট-সরকার ফেলে রেখে এবারে এই লেখা শেষ করি এই বলে যে সরকার তো বদলে গেছে, কিন্তু ওই ৩৩ লক্ষ মানুষের কি হবে? আমরা কি তাদের ভুলে যাব? তাদের পাশে দাঁড়ানোটাই সবচেয়ে বড় বিষয়। বামপন্থীরা ছাড়া একাজ আর কেউ করবে না। সামনের দিনগুলোতে তাঁরাই এই বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াবেন।  

এসআইআর’র ষড়যন্ত্র এবং অত্যাচারকে ভুলে যাওয়া যাবে না কোনমতেই। আর সেইজন্যই ভোট-সরকার ফেলে রেখে এবারে বলতেই হবে সরকার তো বদলে গেছে, কিন্তু ওই ৩৩ লক্ষ মানুষের কি হবে? আমরা কি তাদের ভুলে যাব? তাদের পাশে দাঁড়ানোটাই সবচেয়ে বড় বিষয়। বামপন্থীরা ছাড়া একাজ আর কেউ করবে না।

Comments :0

Login to leave a comment