ভোট মানেই গণতন্ত্রের উৎসব। আর সেই উৎসবে এবার এক পশলা নতুন আলো দেখল উত্তরবঙ্গের ধূপগুড়ি। দীর্ঘ বঞ্চনা আর সামাজিক অবহেলার আগল ভেঙে বুধবার ধূপগুড়ি শহরের ২০৪ নম্বর বুথে তৈরি হলো এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। সমাজের মূল স্রোত থেকে কার্যত ব্রাত্য থাকা বৃহন্নলা সম্প্রদায়ের সাত প্রতিনিধি এদিন প্রথমবারের মতো তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করলেন। কেবল এক টুকরো প্লাস্টিকের পরিচয়পত্র নয়, এই ভোট তাঁদের কাছে হয়ে উঠল দীর্ঘ লড়াইয়ের পর প্রাপ্ত সামাজিক স্বীকৃতির দলিল।
শহরের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের ওই বুথে সকাল থেকেই ভিড় ছিল সাধারণ ভোটারদের। কিন্তু তার মধ্যেই নজর কাড়ল সাতজনের একটি বিশেষ দল। পরিপাটি সাজ, আত্মবিশ্বাসে ভরা পদক্ষেপ আর চোখে-মুখে জয়ের উজ্জ্বলতা। তাঁরা আসছিলেন শুধু ভোট দিতে নয়, দীর্ঘদিনের ‘অস্তিত্বহীনতা’র তকমা মুছে নিজেদের নাগরিক পরিচয়ে সিলমোহর করতে।
বুথ থেকে বেরিয়ে আসার পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তাঁরা। কারও চোখে আনন্দাশ্রু, কারও ঠোঁটে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি। এই দলেই ছিলেন লিজা। কাঁপাকাঁপা গলায় তিনি বললেন,‘‘এতদিন পরিচয়পত্র বানানোর তাগিদই অনুভব করিনি। মনে হতো এসব আমাদের জন্য নয়, আমরা তো ব্রাত্য। কিন্তু আজ বুঝলাম, আমরাও এই দেশের সমান নাগরিক। আমাদেরও অধিকার আছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। প্রথমবার কার্ড হাতে নিয়ে ভোট দিয়ে যে কী শান্তি লাগছে, তা বোঝাতে পারব না।’’
রাজনৈতিক ও সচেতন মহলের মতে, এই ঘটনা কেবল সাতজন মানুষের ভোট দেওয়া নয়, বরং পিছিয়ে পড়া এক জনজাতির অধিকার আদায়ের পথে বড় মাইলফলক। বামপন্থী আন্দোলন বরাবরই শোষিত ও প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হওয়ার কথা বলে এসেছে। ধূপগুড়ির এই ঘটনা যেন সেই আদর্শেরই প্রতিফলন। দীর্ঘ লড়াই আর আন্দোলনের পর অবশেষে এই বৃহন্নলা প্রতিনিধিরা প্রমাণ করলেন, গণতন্ত্রের আঙিনায় ব্রাত্য বলে কেউ নেই।
বুথের সামনে উপস্থিত সাধারণ ভোটাররাও এই বিশেষ মুহূর্তকে ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করেছেন। কেউ কেউ করতালির মাধ্যমে তাঁদের এই নতুন যাত্রাকে স্বাগত জানান। গণতান্ত্রিক এই মহামিলন যেন মনে করিয়ে দিল, ব্যালট বাক্স বা ইভিএম আদতে বৈষম্যহীন এক সমাজেরই স্বপ্ন দেখে। ধূপগুড়ির এই সাতজন সেই স্বপ্নেরই নতুন সারথি হলেন।
West Bengal Elections 2026 Phase 1
বুথে সাত ‘বৃহন্নলা’, ধূপগুড়িতে লেখা হলো অধিকারের নতুন ইতিহাস
×
Comments :0