Post Editorial

‘ব্রাহ্মীরসে’ মগজকে সিক্ত করুন মাননীয়া

উত্তর সম্পাদকীয়​

পীযূষ ব্যানার্জি


ফুয়েল ট্যাঙ্কের পরিসর কম। সেখানেও বাদ যায় না। বরং ঢের বেশি জায়গা মেলে বাস, লরি থেকে অটোর পিছনে। সৃষ্টিশীলতাকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছেন পরিবহণ শ্রমিকরা। পথ চলতি মানুষকে খানিক তৃপ্তি দিয়ে লেখা সেই বাহনলিপি নজর এড়ায় না। এমন এক বাহন সংস্কৃতির ওপর দিন কয়েক আগেই নজরে চলে আসে। 
বেলেঘাটা রুটের এক অটোর গায়ে লেখা, ‘‘ যত করবি চালাকি/ পরে বুঝবি জ্বালা কি।’’ চালাকির দ্বারা মহৎ কাজ যে হয় না, বহুল প্রচারিত এই বাংলা শিক্ষামূলক প্রবাদ এমনভাবেই স্থান পেয়েছে অটো চালকের বাহন সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে। 
আসলে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী দিন কয়েক আগে খুবই স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়েছিলেন। শ’খানেকের ওপর বই লিখেছেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যের সরকারি আকাদেমি পুরস্কার প্রথমবারের মতো চালু হওয়ার পরপরই তাঁর ঝুলিতে। ‘কথাঞ্জলি’র রূপকার তাঁর স্মৃতিমেদুরতায় এবার ছড়া কাটেননি। রং-তুলির মেলবন্ধনে আঁকেননি ছবিও। স্মৃতিমেদুরতায় আচ্ছন্ন হয়ে এবার তিনি আবেগ ফুটিয়ে তুলেছেন অফিসিয়াল ফেসবুকের দেওয়ালে।
ফেসবুকের দেওয়ালে মমতা ব্যানার্জি রাজ্যবাসী বিশেষত কলকাতার মানুষের কাছে ‘স্মৃতি তাড়িত’ হতে চাওয়ার ন্যূনতম দাবি রেখেছিলেন। তাই তিনি লিখেছেন, মেট্রো পরিকাঠামো সম্প্রসারণ আমার একটি দীর্ঘ সফরের অন্যতম অংশ। ভারতের রেলমন্ত্রী হিসাবে কলকাতায় অনেকগুলি মেট্রো রেল করিডরের পরিকল্পনা করা, অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত আমার হাতে হয়েছিল। টালিগঞ্জ-গড়িয়া, দমদম-গড়িয়, দক্ষিণেশ্বর-দমদম, সল্টলেক-হাওড়া এই সব সংযোগের সূচনা আমার হাত দিয়েই। আজ আমাকে কিছুটা নস্টালজিক হতে দিন।’’
রাজ্যে চালু হওয়া মেট্রো প্রকল্প কোন সময়ে অনুমোদন, কারা কোনও সময়ে শিলান্যাস করেছিল, কোন সরকারের আমলে অনুমোদিত হয়েছিল। জমি অধিগ্রহণ থেকে শুধু নয় মেট্রো প্রকল্প বাস্তবায়িত করার জন্য নজিরবিহীনভাবে রাজ্য সরকার নিজের তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দ করেছিল, এমনকি মেট্রো পথের জন্য গোবিন্দপুর রেল কলোনির বাসিন্দাদের জন্য নোনাডাঙায় বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছিল। সে কথা থাক। রেলমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি অধুনা মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির দাবি তাঁর হাতেই সব। 
কিন্তু হঠাৎ তাঁকে এমন আত্মপ্রচারের জন্য রাজ্যবাসীর কাছে নস্টালজিক হতে হলো কেন? ১৬ বছর পর কেন তাঁর এই স্মৃতি হাতড়ানো?
কলকাতায় এসে মেট্রো রেলের বেশ কয়েকটি প্রকল্পকে চালু করে গেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্প শেষ না করে এরাজ্যে বিধানসভা ভোটের আগে প্রধানমন্ত্রীর এসে কলকাতায় উদ্বোধন করছেন, অথচ সেই অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব পর্যন্ত গরহাজির তা নিয়ে প্রশ্ন স্বাভাবিক। না, মমতা ব্যানার্জি তা নিয়ে স্মৃতি হাতড়াননি। মেট্রো রেলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি আমন্ত্রিত ছিলেন। খোদ রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের কাছ থেকে আমন্ত্রণ এসেছিল মুখ্যমন্ত্রীর কাছে। কেন মেট্রোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী যাননি তা নিয়ে নিজে একটি কথাও বলেননি। তবে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে না যাওয়া নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করে বেশ কয়েকটি কথা জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেই বক্তব্য রাজনৈতিক। ভিনরাজ্যে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর আক্রমণের প্রতিবাদে যদি মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক মঞ্চে না বসতে চান, তা মুখ্যমন্ত্রী বলার সাহস রাখতে পারলেন না! নবান্নে সাংবাদিকরাও মমতা ব্যানার্জিকে রেলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন করেছিল। সেই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। কিন্তু রেলের তরফ থেকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ নিয়ে কোনও ত্রুটির অভিযোগ না তৃণমূল দল করছে না সরকার তরফ থেকে করা হয়েছে। 
ভিনরাজ্যে গিয়ে বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য বাংলাদেশি সন্দেহ করে পেটানো হচ্ছে এরাজ্যের বাসিন্দাদের। শুধু তাই নয়, সীমান্ত পার করে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে পড়শি দেশে। এমন ন্যক্কারজনক কাণ্ড যে সরকার ঘটায় তারজন্য মুখ্যমন্ত্রীর ফেসবুক নীরব। তিনি বরং স্মৃতি হাতড়ে বেরিয়েছেন।
কিন্তু সেই স্মৃতিমেদুরতাও তো খণ্ডিত! সচেতনভাবেই স্মৃতিভ্রষ্ট হওয়ার ভান।
এরাজ্যে তখন বামফ্রন্ট সরকার। কেন্দ্রের রেলমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। জোকা বিবাদি বাগ রেলপথের সেবার শিলান্যাস অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল মেট্রো রেল। উদ্বোধন হবে দেশের রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাটিলের হাতে। রাজ্যপাল থেকে বিধানসভায় তৎকালীন বিরোধী দলনেতা বর্তমানে জেলবন্দি তৃণমূল নেতা পার্থ চ্যাটার্জি পর্যন্ত আমন্ত্রিত। ছাপানো কার্ডে সবার নাম। ২০১০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জোকার সেই শিলান্যাস অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণের তালিকায় পর্যন্ত ছিল না মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নামটুকু।
শিলান্যাসের একদিন আগে মহাকরণ থেকে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকরা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে প্রশ্ন করেছিলেন। রাইটার্স থেকে বের হওয়ার সময় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য জানিয়ে ছিলেন, ‘‘ না, আমি আমন্ত্রণ পাইনি। রাজ্য সরকারের কেউ পেয়েছেন কিনা জানি না।’’ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ করার সাধারণ সৌজন্যটুকু দেখাতে পারেননি মমতা ব্যানার্জি। 
আগেই প্রয়াত হয়েছিলেন রাজ্যের পরিবহণ মন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তী। ওই সময় রাজ্যের পরিবহণ মন্ত্রী ছিলেন রঞ্জিত কুণ্ডু। মহাকরণের কর্মরত সাংবাদিকরা গিয়েছিলেন তাঁর কাছেও। তিনি পাননি আমন্ত্রণ। শিলান্যাসের আগের সন্ধ্যায় সরকারি অফিস যখন নির্ধারিত ছুটির সময় পার করছে, তখন রেলের তরফ থেকে একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর হাত দিয়ে তৎকালীন পরিবহণ মন্ত্রী রঞ্জিত কুণ্ডুর কাছে একটি ছাপানো আমন্ত্রণ এসেছিল। 
মমতা ব্যানার্জি সেদিন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানোর ন্যূনতম সৌজন্যটুকুই রাখেননি। আর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সেদিন মহাকরণ থেকে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন দমদম বিমানবন্দরে। দেশের রাষ্ট্রপতিকে রাজ্যে আসার জন্য স্বাগত জানাতে। সৌজন্যতা কীভাবে রক্ষা করতে হয় তা দেখিয়ে গেছেন বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী। 
কলকাতায় মেট্রো রেল যে চলছে তা প্রাক্তন রেলমন্ত্রী গনিখান চৌধুরিকে বাদ দিয়ে ভাবা কার্যত অসম্ভব। দেশের মধ্যে প্রথম শহর কলকাতায় মেট্রো রেল চলেছিল তাঁর হাত ধরেই। মুখ্যমন্ত্রীর স্মৃতি মেদুরতায় তো তিনিই সব। 
তাই যদি হয় তাহলে কেন তিনি স্মৃতি বিভ্রমে পড়লেন?
শুধু মেট্রো কেন? ২০০৯ সাল থেকে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে পর্যন্ত এরাজ্যে কোথায় না রেলের শিলা পোঁতা হয়নি। রেল তখন কারখানা গড়বে। রুগ্‌ণ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে পর্যন্ত অধিগ্রহণ করে চালাবে রেল। হাওড়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বার্ন স্ট্যান্ডার্ডের তৃণমূল প্রভাবিত শ্রমিকরা মমতা ব্যানার্জির রেল বাজেট হলে একবার সবুজ আবীর মেখে নিতেন। বেচারাদের হাল ভেবে এখন একটু স্মৃতি হাতড়ালে মন্দ হয় না!
রেলে তখন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়বে। স্কুল, কলেজ হাটবাজার থেকে নার্সিং ট্রেনিং সেন্টার কী না ছিল সেদিন শিলা পোঁতার তালিকায়। সপ্তাহে তিন থেকে চারদিন রাজ্যজুড়ে তখন পোঁতা হতো রেলের শিলা। সেই অনুষ্ঠানে প্রথমে ডাক পড়তো টলিউডের শিল্পীদের। এক প্রস্থ গান, নাচের পর হতো শিলার খেলা। এমন এক শিলা পোঁতার অনুষ্ঠান হয়েছিল হুগলী জেলার ডানকুনিতে। বিরাট সব কারখানা করবে রেল। সেখানে আবার উপস্থিত করানো হয়েছিল তখনকার বণিকসভা ‘ফিকি’র সেক্রেটারি জেনারেল ড অমিত মিত্র। ডানকুনির সেই শিলান্যাস অনুষ্ঠানে অমিত মিত্র বলে এসেছিলেন, ‘‘ ডানকুনি থেকে শুরু হচ্ছে বাংলার শিল্পের নবজাগরণ।’’ ২০১১ সাল থেকে মমতা ব্যানার্জির রাজ্য মন্ত্রীসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য গত বিধানসভা নির্বাচনে ভোটে দাঁড়াননি। তবে সংবিধান বহির্ভূত পদ পেয়ে এখন ক্যাবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা অমিত মিত্র। শিল্পের নবজাগরণ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে একটু ব্রাহ্মীরসে সিক্ত হয়ে স্মৃতি হাতড়ানোর অনুরোধ রাখা থাকলো। 
কোথাও গেল আদ্রায় রেলের উদ্যোগে ১ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। কাঁচরাপাড়ায় রেলে কোচ ফ্যাক্টরি। শয়ে শয়ে নার্সিং কলেজ, হাসপাতাল। বাজার-মল। নন্দীগ্রামে রেললাইন। ফুরফুরা শরিফে রেলস্টেশন। বরং এখন জমি জটে আটকে আছে এরাজ্যে রেলের প্রায় ৬১টি প্রকল্প। আটকে থাকা প্রকল্প শুধুই রেলপথের। রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর থেকে নিজের হাতে শিলান্যাসের রেললাইন পাতার জন্যই জমি দিতে পারছে না রাজ্য সরকার। কারখানা, হাসপাতাল, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ার পোঁতা শিলা তো কবেই উধাও হয়ে গেছে।
দেশে মোদী সরকারের আমলে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ভয়াবহভাবে আক্রান্ত। রাজ্যপাল পদকে ব্যবহার করে নির্বাচিত রাজ্য সরকারগুলির ওপর কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করেছে মোদী সরকার। রাজ্যপালের বিল আটকে রাখার ঘটনা নিয়ে তামিলনাড়ুর ডিএমকে সরকারকে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। শীর্ষ আদালত হস্তক্ষেপ করেছে। কেরালা সরকারের একই অভিজ্ঞতা। এরাজ্যেও রাজ্যপালের আচরণ নিয়ে বিভিন্ন সময় সরকার প্রশ্ন তুলেছে। মোদী সরকারের বিরুদ্ধে প্রায়শই মমতা ব্যানার্জি দেশের ফেডারেল স্ট্রাকচারকে বুলডোজার চালানোর অভিযোগ করে এসেছেন। এই অভিযোগ অসত্য, এ কথা কেউ অস্বীকার করে না। 
কিন্তু রেলেমন্ত্রী থাকার সময় এরাজ্যে মমতা ব্যানার্জি প্রতিদিন যা করে গেছেন তা মোদী সরকারের তুলনায় কম কী? নির্বাচিত সরকারকে অস্বীকার করে, সৌজন্যতার পরোয়া না করে রাজ্যজুড়ে সেদিন যা করছেন এখন ভেবে দেখার পালা। আরজি কর হাসপাতালের পড়ুয়া চিকিৎসকে ধর্ষণ ও খুনের পর দেশের শীর্ষ আদালতের রায়ে সরকারি হাসপাতালে এখন নিরাপত্তার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় বাহিনীর। একবার ভেবে দেখেছেন মমতা ব্যানার্জি, ২০১০ সালে নন্দরাম মার্কেটে ভয়াবহ আগুন লাগার পর আরপিএফ নামিয়ে দিয়েছিলেন বড়বাজারে। এর দায় তো এখন নিতেই হবে। 
তাই স্মৃতি হাতড়ে লাভ নেই।

Comments :0

Login to leave a comment