তাঁরই সরকার, মন্ত্রী, দলীয় নেতাদের কাঁচা টাকার লোভে হাজার হাজার যোগ্য, মেধাবীরা সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। গোটা নির্বাচনী প্রচারে পর্বে গ্রামে, শহরে কাজের আকালের ছবি ভয়াবহভাবে সামনে এসেছে। আর এখন সেই মমতা ব্যানার্জি ভোটের প্রচারে এসে আইপ্যাক’র কর্মীদের কর্মসংস্থানের গ্যারান্টি দিচ্ছেন!
এর আগে গত জানুয়ারি মাসে আইপ্যাক’র কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে ও সল্টলেকের অফিসে ইডি’র তল্লাশির সময় সেখানে হাজির হয়েই মমতা ব্যানার্জি দাবি করেছিলেন, ‘‘এটা তৃণমূলের অফিস, সেন্ট্রাল এজেন্সি রেইড করছে’’। আইপ্যাক’র অফিসকে দলীয় দপ্তর বলে দাবি করা মমতা ব্যানার্জি এবার আইপ্যাক’র ‘কাজ হারানো’ কর্মীদের চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন! নির্বাচনী সভা থেকে বললেন, ‘‘ওঁদের ভয় দেখালে ওরা আমাদের দলের সঙ্গে যুক্ত হবে। আমরা ওঁদের চাকরি দেব। আমি ওঁদের চাকরি ছাড়া করব না। সকালে আমি অভিষেকের সঙ্গেও এই নিয়ে কথা বলেছি।’’
কিন্তু আইপ্যাক’র কর্মীদের কাজ হারানো প্রসঙ্গ এল কেন? রবিবার একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিকের খবরে দাবি করা হয়, নির্বাচন পর্বের মাঝেই এখন পশ্চিমবঙ্গে সমস্ত কাজ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তৃণমূলের ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক। জানা গিয়েছে, সংস্থার কর্মীদের ই-মেল করে এই কাজ বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। কর্মীদের ২০ দিনের সাময়িক ছুটিতে পাঠানো হচ্ছে। ১১ মে’র পর আবার তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ আলোচনা করা হবে বল জানানো হয়েছে আইপ্যাক’র তরফে। এরাজ্য ২৯ তারিখে দুই দফার ভোট শেষ হবে। ৪ তারিখে ভোটের ফলাফল। অর্থাৎ ভোট পর্বেই আইপ্যাক গুটিয়ে নিচ্ছে! ছয় দিন আগেই কয়লা পাচারকাণ্ডে আইপ্যাক’র অন্যতম কর্ণধার বিনেশ চাণ্ডেলকে গ্রেপ্তার করা হয়। আপাতত তিনি ইডি’ হেপাজতে। এরইমধ্যে এবার আইপ্যাক’র তরফে পশ্চিমবঙ্গে তাদের কাজ বন্ধ রাখার খবরে স্বাভাবিক ভাবেই চাঞ্চল্য তৈরি হয়। আইপ্যাক শাসক তৃণমূলের ভোট লুটের কৌশলের অন্যতম মস্তিষ্কও বটে। জানা গিয়েছে, শনিবার বিভিন্ন বিধানসভায় কর্মরত কর্মীদের সল্টলেকের দপ্তরে ডেকে পাঠিয়েছিল আইপ্যাক কর্তৃপক্ষ। এরপরেই কর্মীদের কাছে কাজ বন্ধের এই ই-মেল আসে বলে খবর।
আশ্চর্যজনক ভাবে এদিন রাত পর্যন্ত আইপ্যাকের তরফে সরকারি ভাবে এবিষয়ে কোনও কিছু বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়নি। এই খবরের সত্যতা নিয়েও কোনও মন্তব্য করা হয়নি। তবে শাসক তৃণমূলের তরফে এদিন সকালেই এই খবরকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে, ‘আমরা একটি সংবাদ প্রতিবেদন দেখেছি, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে আইপ্যাক আগামী ২০ দিনের জন্য পশ্চিমবঙ্গে তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছে। এই দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং এটি দলের নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা বলে মনে হচ্ছে। আইপ্যাক-এর পশ্চিমবঙ্গ টিম সর্বতোভাবে তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজ্যজুড়ে নির্বাচনী প্রচারেও রয়েছে।’
শাসক দলের তরফে এমন দাবি করা হলেও এদিন দুপুরে যদিও মমতা ব্যানার্জি ভোটের মুখে এরাজ্যের আইপ্যাক্’র কাজ গুটিয়ে নেওয়া খবরকে বৈধতা দিয়েই উলটে ওই সংস্থার কর্মীদের চাকরি দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন! মমতার কথায়্, ‘‘যারা আমাদের পার্টির কাজ করে তাদের বলছে বাংলা ছেড়ে চলে যাও। তোমাদের তো পঞ্চাশটা আছে। আমাদের একটা আছে। শুনুন ওদের ভয় দেখালে, ওরা আমাদের দলের সঙ্গে যুক্ত হবে। আমরা ওদের চাকরি দেব। আমি একটি ছেলেকেও চাকরিছাড়া করব না। সকালে আমি অভিষেকের সঙ্গে কথা বলেই এসেছি।’’
আইপ্যাক নিছকই ভোটের কৌশল বা ভোট কেনা বা লুট করার ছক বাতলে দেওয়ার সংস্থা নয়। আইপ্যাক’র মাধ্যমে অর্থ তছরুপ হয়েছে কয়লা পাচারে। আইপ্যাক’র মাধ্যমে প্রভাবশালীর টাকা ঘুরপথে হাওয়ালার মাধ্যমে অন্যত্র বিনিয়োগও হয়েছে বলে দাবি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার। এরকম দাগী একটা সংস্থাই রাজ্যের নির্বাচকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে কাজ করছে গত কয়েক বছর ধরে এই বাংলায়। এখন এরাজ্যে প্রতীক জৈন সেই আয়োজনের অন্যতম মাথা। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার দাবি, ৫০ কোটি টাকা বেআইনি লেনদেনের হদিশ মিলেছে। কয়লা পাচারের অর্থ নয়ছয়ের তদন্তে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার একটি সুত্রের দাবি, হাওয়ালার মাধ্যমে কয়লা পাচারে টাকা বিদেশে শুধু বিনিয়োগ করাই নয়, গত পাঁচ বছরে আইপ্যাক’র মাধ্যমে তিনটি রাজ্যে বিধানসভা ভোটে টাকা বিলি করা হয়েছিল। ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোট, ২৩ সালে ত্রিপুরার ভোটে এবং ২২’ সালে গোয়ার বিধানসভা ভোটে শাসক তৃণমূলের হয়ে আইপ্যাক’র কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়েছিল। সেই টাকা কয়লা পাচারের।
আইপ্যাক’র কর্ণধারের বাড়িতে তল্লাশি ঠেকাতেই তাই ছুটতে হয়েছিল মুখ্যমন্ত্রীকে, ইডি’র আধিকারিকদের সামনে থেকেই বেমালুম নথি, হার্ডডিক্স কার্যত ছিনতাই করে দলের নামে কেনা গাড়িতে করে নিয়ে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী এবং ঘটনার সময় দর্শক সেজে থাকল ইডি। পরে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তদন্তে হস্তক্ষেপের অভিযোগে আদালতে পৌঁছালো ইডি। পালটা পুলিশের তরফেও দায়ের হলো এফআইআর! কার্যত গত জানুয়ারি মাস থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে আইপ্যাক বারেবারে শিরোনামে এসেছে।
আইপ্যাক’র মতো বেসরকারি সংস্থার অফিসে তল্লাশি বা জেরা বা কোনও কর্ণধারের গ্রেপ্তারিতে মমতা-অভিষেকের উদ্বেগেই স্পষ্ট শুধু ভোটের কৌশল নয়, আরও অনেক লেনদেনে আইপ্যাক’র সঙ্গেই সম্পৃক্ত হয়ে রয়েছে তৃণমূল। তাই আইপ্যাক’র কর্মীদের ই-মেল পাঠানো নিয়ে সংস্থা কোনও বিবৃতি দেওয়ার আগেই তৃণমূলকে বিবৃতি দিতে হয়, মুখ্যমন্ত্রীকে আইপ্যাক’র কর্মীদের বিকল্প চাকরির কথা জানাতে হয় ভোট প্রচারের মাঝেই!
I-PAC Election
ভোটের মাঝেই কর্মীদের ২০ দিনের ছুটিতে যাওয়ার নির্দেশ আইপ্যাক’র
×
Comments :0