বড়জোড়ার সুভাষ দাস একসময় অত্যাধুনিক ইলেকট্রিক বোর্ডে নজর রেখে মেশিন চালানো বন্ধ করার দায়িত্বে ছিলেন। অদক্ষ শ্রমিক হিসাবে একটি কারখানায় ঢুকে নিজের যোগ্যতায় দক্ষ শ্রমিক হয়েছিলেন। সময়, যন্ত্রের আওয়াজ সব কিছুর উপরই তাঁকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হত। না হলেই প্রান চলে যাবে। সেই সুভাষ দাস আজ বেকার। বন্ধ হয়ে গেল কারখানা।অন্য একটি কারখানায় ঢুকেছিলেন তিনি। কয়েকদিন পর সেই কারখানার গেটেও তালা ঝুলল। এখন সুভাষ দাস বড়জোড়ায় মুরগি কাটে। অভ্যাস নেই, তাই মাঝে মধ্যে হাত কাটছে তাঁর। কিন্তু কি করবেন? বাড়িতে ৬জন লোক, পেট তো চালাতে হবে। কারখানা বন্ধ হওয়ার সময় যা পাওনা টাকাটুকু ও পাননি তিনি। আর কোন দিন পাবেন সেই আশাও করেননা। কিন্তু কারখানা খোলার দাবীতে সিআইটিইউ’র লড়াইয়ের প্রথম সারিতেই থাকেন তিনি।
কয়েক কিলোমিটার দুরে মেজিয়ার বাসিন্দা ধর্মেন্দ্র গোপ মেজিয়ার একটি কারখানায় কাজ করতেন। যে কারখানায় কাজ করতেন সেই কারখানার জমি নেওয়া থেকে শুরু করে, কারখানার বিল্ডিং, যন্ত্রপাতি বসানো সবেতেই তিনি বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেছেন। কারখানা চালু হওয়ার পর কাজও পেয়েছিলেন। রাজ্যে রাজনৈতিক পালা বদলের পর সেই কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। তাঁর কথায় ‘‘তৃণমূলের এক একটা গ্রুপের লোকজন বারে বারে এসে মালিকের কাছে তোলা আদায় করত। আবার অন্যের কাছ থেকে টাকা নিয়ে সেই ব্যক্তিকে জোর করে কাজে ঢোকানোর হুমকি দিত। এই অবস্থায় মালিকপক্ষ কারখানা গুটিয়ে বন্ধ করে দিল, কাজ গেল আমাদের’’ মাঝবয়সি ধর্মেন্দ্র গোপ এখন পায়ে টানা টেম্পো চালান। বিনা চিকিৎসায় তাঁর ছেলে মারা গেল। জীর্ণ শরীর নিয়ে এখন কোন রকমে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন তিনি।
মেজিয়ার পাশে শালতোড়া গেলে দেখা যাবে একের পর এক পাথর খাদান, ক্র্যাসার বন্ধ হয়ে আছে, কোন কারন নেই। ২০২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস এই শালতোড়া কেন্দ্রে পরাজিত হওয়ার পর পাথর খাদানগুলো বন্ধ করে দেয়। প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক এক ঝটকায় বেকার হয়ে গেলেন। এখানকার বেকার যুবক জয়ন্ত মল্লিক, বাবু চক্রবর্তী'রা জানান, পরিবারে আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পাথর ভাঙ্গার মেশিন কিনেছিলাম, অনেকে আবার ব্যাঙ্ক থেকেও টাকা ধার করেছিলেন, টাকা ধার করেছিলেন মোটা সুদে ব্যক্তি মহাজনের কাছ থেকেও। খাদান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দিশাহীন অবস্থায় তাঁরা ঘুরছেন। বহু শিক্ষিত যুবক আজ পরিযায়ি শ্রমিক হিসাবে বাইরে কাজ করতে চলে গেছেন। এই বড়জোড়া, শালতোড়া বিধানসভা এলাকার মানুষের মুখে একটাই কথা, বাম আমলে তো এই জিনিস ছিলনা। আমরা তো গতর খাটানোর সুযোগ পেতাম। কোথায় হারিয়ে গেল আমাদের কাজগুলো।
ফিরিয়ে আনতে হবে এই কাজ। এই দুটি বিধানসভা এলাকায় এবারের নির্বাচনের প্রধান আওয়াজ’ই হল বড়জোড়া, মেজিয়া, শালতোড়া এলাকায় বন্ধ হওয়া কারখানা খুলতে হবে। এই কারখানা গুলি খোলার দাবীতে ২০১৬-২১ এই পাঁচবছর বড়জোড়া কেন্দ্র থেকে জয়ী হওয়া সিপিআই(এম) বিধায়ক সুজিত চক্রবর্তী দিনের পর দিন বিধানসভায় আলোচনা করেছেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। বামফ্রন্টের সময়ই এলাকার মানুষ জমি দিয়েছিলেন কারখানার জন্য। কোথাও কোন সমস্যা হয়নি। শালতোড়া এলাকায় চাষের অবস্থা খুবই খারাপ। পাথর শিল্পের উপর নির্ভর করেই মানুষের অস্তিত্ব টিকে ছিল, সেটাও কেড়ে নেওয়া হল তৃণমূলের জমানায়। বড়জোড়ার বর্তমান বিধায়ক তৃণমূলের ও শালতোড়ার বিধায়ক বিজেপি’র। এঁরা কোনদিন বিধানসভায় কারখানা খোলা, শ্রমিকদের কাজ দেওয়া নিয়ে একটি কথাও তো বলেননি। জেলা প্রশাসনও নিরব। এমনটাই জানান, সিআইটিইউ নেতা মহাদেব সিংহ, বানেশ্বর গুপ্ত।
এবারের নির্বাচনে সুজিত চক্রবর্তী বড়জোড়া ও নন্দদুলাল বাউরি শালতোড়া কেন্দ্রে বামফ্রন্টের সিপিআই(এম) প্রার্থী হয়ে লড়ছেন। এই দুটি বিধানসভার একটি বড় অংশই হল কারখানা,পাথর খাদানের শ্রমিক। তাঁদের জীবিকার জন্য লালঝান্ডার লাগাতার লড়াই এই এলাকার মানুষ জানেন, তাতে সামিলও হন। নির্বাচনে তাঁদের অংশগ্রহন আরও বেশি করে হচ্ছে। কারখানা খুলতে হবে। ফিরিয়ে দিতে হবে কাজ। সেটা লালঝান্ডাই করতে পারে। এটাই আওয়াজ বড়জোড়া, শালতোড়া কেন্দ্রে।
Comments :0