IRAN USA Ceasefire

ডেডলাইনের মাত্র ৯০ মিনিট আগে আমেরিকা-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি

আন্তর্জাতিক

ভয়ঙ্কর এক হুমকি। শিয়রে সমন। আর ঠিক শেষ মুহূর্তে রফা। 
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘পুরো একটি সভ্যতা মুছে ফেলার’ হুমকির সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র ৯০ মিনিট আগে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলো প্রবল পরাক্রমশালী আমেরিকা এবং ইরান।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিয়স (Axios)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের শুরুতে বিমান হামলায় নিহত প্রাক্তন সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেইয়ের ছেলে এবং ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার মোজতাবা খামেনেই এই চুক্তির পথে হাঁটতে রাজি হন।
ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তির অধীনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে সামুদ্রিক যান চলাচল সুরক্ষিত থাকবে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লেখেন, ‘ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সাথে সমন্বয় এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে এই ট্রানজিট সম্ভব হবে।’
মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এই যুদ্ধবিরতিকে আমেরিকার জন্য একটি জয় বলে প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সামরিক বাহিনীর সাফল্য চরম চাপ সৃষ্টি করেছিল, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার দলকে কঠোর আলোচনায় অংশ নিতে এবং একটি কূটনৈতিক সমাধান ও দীর্ঘমেয়াদী শান্তির পথ প্রশস্ত করতে সাহায্য করেছে।’
যুদ্ধবিরতির এই খবরে বিশ্বজুড়ে শেয়ার বাজারেও ব্যাপক উত্থান দেখা গেছে। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দেওয়া এই সংকটের অবসান হবে বলে বিনিয়োগকারীরা আশাবাদী।
একদিকে ট্রাম্প যখন প্রকাশ্যে ব্যাপক ধ্বংসলীলার হুমকি দিচ্ছিলেন, তখন পর্দার আড়ালে চলছিল জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা।
মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সেনা এবং পেন্টাগনের কর্মকর্তারা শেষ কয়েক ঘণ্টা ইরানের পরিকাঠামোর ওপর বড় ধরনের বোমা হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং ট্রাম্প ঠিক কোন দিকে ঝুঁকছেন তা বোঝার চেষ্টা করছিলেন। অন্যদিকে, অভূতপূর্ব মাত্রায় ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কায় প্রহর গুনছিল ওই অঞ্চলের মার্কিন মিত্র দেশগুলি।
এক্সিয়স-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, সোমবার হোয়াইট হাউসে ইস্টার উদযাপনের সময় মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ টেলিফোনে মধ্যস্থতাকারীদের সাথে ক্রমাগত কথা বলে যাচ্ছিলেন। ওয়াশিংটন সদ্য ইরানের কাছ থেকে যে ১০-দফা পাল্টা প্রস্তাব পেয়েছিল, তা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ উইটকফের ভাষায় ছিল একটি ‘চরম বিপর্যয়’।
এরপর দিনভর চলে খসড়া সংশোধনের চরম ব্যস্ততা। পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা উইটকফ এবং ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির মধ্যে নতুন খসড়া আদান-প্রদান করতে থাকেন। ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করেন মিশরীয় ও তুর্কি বিদেশমন্ত্রীরাও। অবশেষে সোমবার গভীর রাতে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির একটি সংশোধিত প্রস্তাবে মার্কিন অনুমোদন আদায় করেন মধ্যস্থতাকারীরা।
এরপর বল ছিল মোজতাবা খামেনেইয়ের কোর্টে। সুপ্রিম লিডার হিসেবে নাম ঘোষণার পর থেকে যিনি এখনও জনসমক্ষে আসেননি। ইজরায়েলের গুপ্তহত্যার হুমকির মুখে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর তৃতীয় এই সর্বোচ্চ নেতা মূলত রানারদের মাধ্যমে চিরকুট পাঠিয়ে যোগাযোগ রাখছেন।
এক্সিয়স দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, চুক্তির জন্য খামেনেইয়ের সবুজ সংকেত ছিল একটি বড় ‘ব্রেকথ্রু’ বা যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বিদেশমন্ত্রী আরাগচিও এই আলোচনায় এবং এলিট ফোর্স রেভল্যুশনারি গার্ডস-এর কমান্ডারদের চুক্তিতে রাজি করানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পাশাপাশি, চিনও ইরানকে এই সংঘাত থেকে সরে আসার পরামর্শ দিচ্ছিল।
তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত খামেনেইয়ের হাতেই ছিল। দুই দিনের এই ম্যারাথন আলোচনার সমস্ত বড় সিদ্ধান্ত তার মাধ্যমেই নেওয়া হয়েছে। একটি আঞ্চলিক সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, ‘তার সবুজ সংকেত ছাড়া এই চুক্তি সম্ভব হতো না।’
মঙ্গলবার সকালের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে আলোচনা ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ট্রাম্প তার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হুমকিটি দিতে পিছপা হননি। মার্কিন মিডিয়ার একাংশ দাবি করতে শুরু করে যে ইরান আলোচনা থেকে সরে আসছে, তবে আলোচনায় জড়িত সূত্ররা স্পষ্ট করে দেয় যে সেই খবর সত্য নয়।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি ভ্যান্স হাঙ্গেরি থেকে টেলিফোনে মূলত পাকিস্তানের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। অন্যদিকে, ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সারা দিন ট্রাম্প এবং তার দলের সাথে যোগাযোগ রাখছিলেন যদিও ইজরায়েল ক্রমশ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছিল যে গোটা প্রক্রিয়ার উপর থেকে তারা নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।
মঙ্গলবার দুপুরের মধ্যে চুক্তির বিষয়ে একটি সাধারণ ঐকমত্য তৈরি হয়। কয়েক ঘণ্টা পর, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এক্স-এ যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্তাবলী প্রকাশ করেন এবং উভয় পক্ষকে তা মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান।
অবশেষে ট্রাম্প এই প্রস্তাবে সম্মতি জানান। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লেখেন, ‘আমি দুই সপ্তাহের জন্য ইরানে বোমা হামলা ও আক্রমণ স্থগিত রাখতে রাজি হচ্ছি।’ চুক্তি চূড়ান্ত করতে তিনি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সাথে কথা বলেন। শেহবাজ শরিফ এক্স-এ জানান, তিনি আগামী শুক্রবার ইসলামাবাদে ইরান ও মার্কিন প্রতিনিধি দলকে বৈঠকে বসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
ট্রাম্পের পোস্টের মাত্র ১৫ মিনিট পর মার্কিন বাহিনীকে আক্রমণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। আরাগচিও নিশ্চিত করেন যে ইরান যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে।
আপাতত, পরিস্থিতি শান্ত বলেই মনে হচ্ছে।

Comments :0

Login to leave a comment