Left Alternative

ভ্রান্তিবিলাস সাজে না দুর্বিপাকে

সম্পাদকীয় বিভাগ

অনির্বাণ বসু

এক আরক্ত সময়ের মধ্যে দিয়ে আমাদের চলাচল। এ সময় হওয়া উচিত ছিল প্রকৃত চক্ষুষ্মানের, যদিও এই পোড়া দেশে আর কবেই-বা ঘটনা এবং ঔচিত্য হাত-ধরাধরি করে চলে! ফলত, বিভ্রমের। অথচ এটাও আমাদের বোঝাপড়ার মধ্যে আছে: বাস্তব যখন ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে, তখন ভ্রান্তির আশ্রয় সাময়িক স্বস্তি দিলেও শেষে  তা বিপদের গভীরতা ও সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তোলে বহুগুণে। রাজ্য-রাজনীতির বর্তমান পরিসরে দাঁড়িয়ে এই কথাটাই যেন নতুন করে প্রাসঙ্গিক ঠেকছে— বিশেষত এমন এক পরিস্থিতিতে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতার দৃশ্যমান নাটকীয়তার আড়ালে ঘাঁপটি মেরে থাকে আপাত অদৃশ্য সাযুজ্য, ঘোষিত বিরোধিতার ভিতর কাজ করে চলে অঘোষিত সমঝোতা।
আমাদের গণতান্ত্রিক কাঠামোতে বিরোধিতা, বিরোধী স্বরের মজবুত উপস্থিতি, এক অপরিহার্য উপাদান। অথচ সেই বিরোধিতা যখন হয়ে ওঠে প্রদর্শনমূলক—লোকদেখানো—মিডিয়ানির্মিত—তখন তা গণতন্ত্রের পক্ষে যত-না সহায়ক, তার চেয়ে বেশি হয়ে দাঁড়ায় এক ধরনের প্রতারণা। রাজ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমরা এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে তথাখ্যাত ‘প্রধান’ দুই শক্তির পারস্পরিক বিরোধিতা যতটা উচ্চকণ্ঠে উচ্চারিত, নীতিনির্ধারণে সে-পার্থক্যের ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না। বরং নীতি ও তার প্রয়োগের বহু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে এক মিলিজুলি বন্দোবস্ত। এই মিশ্রণের চরিত্র কেবলই প্রশাসনিক নয়, আদর্শগতও এমনকি। জাতীয় শিক্ষানীতির প্রশ্নে প্রকাশ্য মঞ্চে তীব্র বিরোধিতা, অথচ তলে-তলে তাকেই সাকার করে তোলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ভাষণ যতই চড়া সুরে বাজুক না-কেন, রাজ্য প্রশাসনের নথিতে তার ন্যূনতম ছাপও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আধার কার্ড থেকে শুরু করে হালের এসআইআর-বিতর্ক পর্যন্ত এই একই দৃশ্যের সাবলীল অভিনয় দেখে চলেছি আমরা। একদিকে আপত্তি, অন্যদিকে প্রয়োগ—দু’দলের এই সহাবস্থান সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে। মঞ্চ না দপ্তর—মানুষ বুঝতে পারে না, কাকে বিশ্বাস করবে। এই বিভ্রান্তি থেকে জন্মায় ভ্রান্তিবিলাস, যেখানে বাস্তবের সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসে।
বিভ্রমের এই গোলকধাঁধার বাইরের দুনিয়াটাই সবচেয়ে উদ্বেগের। সামাজিক পরিকাঠামোগুলো একে-একে ভাঙা চলছে সেখানে; বিশেষত, শিক্ষাক্ষেত্রে। সরকারি স্কুলের সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান, শিক্ষক-নিয়োগ বন্ধ, শিক্ষায় বরাদ্দ ক্রমশ তলানিতে, অন্যান্য সেক্টরগুলির মতো এখানেও বিপুল কন্ট্রাকচ্যুয়াল—অসংগঠিত শ্রমিক। একদিকে সরকারি শিক্ষায় ফাটল, অন্যদিকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেলাগাম ছাড়পত্র—এই দ্বৈত প্রবণতায় বৈষম্য আরও প্রকট হচ্ছে দিন-দিন। ছাত্ররা ‘স্কুল বাঁচাও, মূল বাঁচাও’ স্লোগান তুলে রাস্তায়, রিলবিলাসী যথেষ্ট রাজনৈতিক মধ্যবিত্তের যদিও তা নজরে পড়ছে না, কারণ তারা শুধুই ঝুলনের সৈন্য দেখছে, হাওয়া মোরগের লড়াই দেখছে টেলিভিশনের পর্দায়। বাহাত্তরের গণটোকাটুকি ফিরে এসেছে অন্য পোশাকে: সে-সময়, ইতিহাস সাক্ষী, টেবিলে ছুরি গেঁথে পরীক্ষা দিতে বসত নধর ছাত্রনেতা এবং তার পারিষদ দল। আজ কৃশদেহী ছাত্র টোকাটুকির লাইসেন্স আদায় করে নিতে চায় জেলযাত্রী মন্ত্রীদের উদাহরণ দিয়ে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় এক মাস্টারমশাইকে আমি চিনি, টুকতে না-দেওয়ায় পরীক্ষাশেষে প্রায় সাড়ে-পাঁচ কিলোমিটার পথ তাঁকে শাসাতে-শাসাতে গিয়েছিল তাজা ছেলের দল।
দেশজুড়ে বিজেপি যা করে চলেছে, সেই অভিন্ন কর্মসূচি মোতাবেক রাজ্য চালাচ্ছে তৃণমূল। দু’ক্ষেত্রেই সরকারি স্তরে নিয়োগ এবং বিনিয়োগ—একটারও দেখা মেলে না সেভাবে। শিক্ষায় বিনিয়োগ এবং নিয়ন্ত্রণ এতটাই শিথিল যে সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যখন দিন-আনা-দিন-খাওয়া থেকে শুরু করে নিম্ন-মধ্যবিত্ত হাড়ে-হাড়ে বুঝবে : সকলের জন্য শিক্ষা নয়; যার পয়সা আছে, একমাত্র সে-ই কিনে নিতে পারবে ওই অনির্বচনীয় হুন্ডি—বহুকে বঞ্চিত করে।
এই দুই ফুলের রকমারি বিজ্ঞাপনে বিকেলে ভোরের সরষে ফুল দেখাটা অস্বাভাবিক নয়, নিজস্ব শিশমহলে বসে ঠাহর করা তো যারপরনাই অসম্ভব। তবু তো মানুষ শেখে—দেখে কিংবা ঠেকে। বছরে দু’লাখ চাকরির ঢক্কানিনাদ কর্পূরের মতো উবে গেছে বেমালুম, নির্বাচনের প্রাকলগ্নে নাকখত দিয়ে চালু করতে হয়েছে বেকারভাতা— গালভরা নাম, যুবসাথী। তৃণমূলনেত্রী বুঝছেন, মাটি সরছে, ফাটল ধরছে বিশ্বাসে— মে মাস থেকে যে-ভাতা দেওয়ার অঙ্গীকার ছিল, প্রশাসনিক উল্লম্ফনে এপ্রিল টপকে এই মার্চ মাসেই শুরু হয়ে গেছে সেই হরির লুট। অনুদান একদিকে যেমন মানুষের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটায়, অন্যদিকে অত্যধিক ভাতা-নির্ভরতা দীর্ঘ মেয়াদে তাকেই পরনির্ভরশীল করে তোলে। এই প্রেক্ষিতে মিডিয়ার ভূমিকার কথা সবিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। দুর্ভাগ্যজনক যদিও, তবু মূলধারার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, মানুষের বাস্তব সমস্যাগুলিকে সরিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে রাজনৈতিক আকচাআকচি, দলবদলের প্রগলভতাকে; ফলত ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে শিক্ষার সার্বিক সঙ্কট, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, বেহাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, বেপরোয়া অপশাসন। নাগরিক হিসাবে ফলত প্রভাবিত হচ্ছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও। বাস্তবের বদলে আমরাও অতএব তাকাতে চাইছি প্রতিচ্ছবির দিকে, সমস্যার গভীরে ঢুকে সমাধানের বিপরীতে মন দিচ্ছি তার উপস্থাপনায়। এই অবস্থাই, প্রকৃত প্রস্তাবে, ভ্রান্তিবিলাসকে পুষ্ট করে—জল-হাওয়া দেয়, যেখানে আমরা বিশ্বাস করতে চাই সেই কথাগুলো, যা শুনতে ভালো লাগে; সে যতই বাস্তবের সঙ্গে সঙ্গতিহীন হোক-না-কেন। ইতিহাস বারে-বারে দেখিয়েছে, বিভ্রম কখনও চিরস্থায়ী হয় না। বাস্তবের চাপ যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন চোখ খুলতে বাধ্য হয় মানুষ; ঠিক যেমন সিঙ্গুরের জমি: পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের ইতিহাস বইয়ে যতই লেখা থাক, যতই ক্লাসে ছেলে-মেয়েরা পড়ুক ‘প্রাথমিক পর্যায়ে অধিগৃহীত ৯৯৭.১১ একর জমি চাষযোগ্য হয়ে ওঠে’, ওঁর নিজের কথা থেকেই মানুষ জেনে গেছে—সব ঝুট হ্যায়।
সব ঝুট হ্যায়। অতএব, তফাত যাও। একাকী যেও না এ-সময়ে। একদিন যাকে ফ্রন্টে এনে লড়াইয়ের উদাত্ত আহ্বান ছিল, তাকেও সঙ্গে নিয়ে এবার হাঁটা শুরু হোক মহাপ্রস্থানের পথে। এই লেখা যখন চলছে, ততক্ষণে খবরে প্রকাশ: আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি’র তরফে প্রার্থী হচ্ছেন তিলোত্তমার মা। এই সিদ্ধান্তে বহুজনই আহত হয়েছে, রক্তাক্ত হয়েছে মনে; তবু এও তো ঠিক যে, ভালোবেসে ব্যর্থ হলে যেমন ভালোবাসা ব্যর্থ হয় না, অন্যায়ের প্রতিবাদ করে সাময়িক থমকালেও তেমনই প্রতিবাদ তার মর্যাদা হারায় না। বস্তুত, এমনটাই হয়তো হওয়ার ছিল; কেননা এর আগেও আমরা দেখেছি, যখন-যখন সামান্যও বিপদে পড়েছে তৃণমূল, সেখানেই অবতার হয়ে আবির্ভূত হয়েছে আরএসএস—সে বসিরহাটের ভুয়ো অডিয়োই হোক, কিংবা কয়লা থেকে চাকরি চুরির তদন্ত; তিলোত্তমার আন্দোলনের সময় ভাগবতের ডেইলি প্যাসেঞ্জারি এবং রাজ্য সরকারের প্রতি মোহন-মেদুর আস্থাও তো ভোলার নয়। নবারুণ ভট্টাচার্য বেঁচে থাকলে হয়তো নিজের লেখাই কিঞ্চিৎ বদলে নিতেন তিনি: বাগানে শোভিছে যত তৃণ-ঘাসফুল/তলায় ঘাপটি মেরে বাড়ে পদ্মফুল। হয়তো এমন লিখতেন না তিনি, কিন্তু বিশ্বাস করতে আহ্লাদ হয় আমাদের। এসবের পাশাপাশি এটাও মনে করিয়ে দেওয়া এই মুহূর্তের পবিত্র কর্তব্য: তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে যে-আন্দোলনে বিজেপি থাকেনি, ফুল ফোটেনি কোনও, ফল ফলেছে সেখানেই : স্মার্ট মিটারের আন্দোলন তারই দৃষ্টান্ত।
সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগে: এই আপাত দ্বৈরথ, নিছক তু-তু-ম্যায়-ম্যায় কি ভোট-বৈতরণী পেরোনোর কূটকৌশল, নাকি এর গভীরে রয়েছে আরও সুসংহত কোনও দুরভিসন্ধি? গোটা দেশে বিজেপি যা করতে পারেনি, আরএসএস’র দুর্গার বদৌলত, এখানে তাও করে ফেলেছে তৃণমূল সরকার—জনগণের করের টাকায় বানিয়ে তুলেছে জগন্নাথ মন্দির। আপাতত নজর পড়েছে মহাকালের উপর, যেখান থেকে তলে-তলে স্থির হয়ে গেছে আরএসএস’র ভক্তিগীতি: ইস্‌ মহাকাল মে হাম-তুম করে ধামাল! হাম আর তুম—তৃণমূল আর বিজেপি। তৃণমূল জমানার সবচেয়ে কদর্য দিক এটাই যে, আরএসএস-বিজেপি’র সাহায্যে ধর্মকে হাতিয়ার করে হিন্দুত্ববাদী এক ফ্যাসিবাদী সমাজ গড়ে তুলেছে তারা। কোনও সম্প্রদায়কে ঘিরে এত বিভাজন, এত ঘৃণার বেসাতি আদৌ তো ছিল না এ রাজ্যে, তা দেশে যতই রথযাত্রা হোক, বাবরি মসজিদ ভাঙুক, গোধরা কাণ্ড ঘটুক।
চিলির বিখ্যাত সাহিত্যিক ইসাবেল আয়েন্দের ‘আ লং পেটাল অব দ্য সী’ নামে একটি উপন্যাস আছে, যেখানে তিনি ঘটনা-পরম্পরার মধ্যে দিয়ে নায়ক ডাক্তার ভিক্টর দালমাও-কে এনে ফেলেন চিলিতে, যেখানে প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি, কমিউনিস্ট সালভাদর আয়েন্দে-র সময় উঠে আসে। ১৯৭৩ সালে তাঁর বিরুদ্ধে যে-অভ্যুত্থান ঘটানো হয়, যার মধ্যে দিয়ে অগাস্তো পিনোশে সামরিক একনায়কতন্ত্র কায়েম করেন পরবর্তী প্রায় দু’দশকের জন্য, কালান্তক সেদিনের সেই ঘটনাকেও ধরে রেখেছে এই উপন্যাস। সেপ্টেম্বরের সেই অভ্যুত্থানের মুহূর্তে রাজধানী সান্তিয়াগোর রাজপথে, নায়ক ভিক্টর দালমাও, দেখেছিল, কাতারে-কাতারে ফ্যাসিস্ত, গত পাঁচ-সাত বছরে যাদের টিকিমাত্র দেখা যায়নি; বামপন্থী চিলি, চিলিতে কমিউনিস্টরা শক্তিশালী, সোশালিস্টরা শক্তিশালী, ভিক্টর জারা-র চিলি, পাবলো নেরুদা-র চিলি—এটাই চিলি—এরা হঠাৎ কোথা থেকে এল? ভিক্টর দালমাও মনে-মনে ভাবে, তার মানে একটা ডিপ ফ্যাসিস্ত চিলি ঘাপটি মেরে ছিল, ছিল উইঢিপির মতো যা নাড়ালে বেরিয়ে আসে অযুত উইপোকা।
এমনই এক নয়া ফ্যাসিস্ত স্টেটের মধ্যে আমাদের প্রাত্যহিক চলাচল। আরএসএস-বিজেপি’র বদান্যতায় যে-উইঢিপি তার বিস্তার ঘটাচ্ছে, তাকে সমূলে বিনাশ তো দূর, উলটে প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ করে চলেছে তৃণমূল কংগ্রেস। এই নির্বাচন তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য ভুলেরই চরম মাশুল দিতে হতে পারে রাজ্যবাসীকে; তেমন কিছু যদি ঘটে, তাহলে স্বভাব-বামপন্থী পশ্চিমবঙ্গ, রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের বাংলা, রামমোহন-বিদ্যাসাগরের বাংলা, মাতঙ্গিনী-প্রীতিলতার বাংলা, সংস্কৃতিমনস্ক পশ্চিমবঙ্গ তার যাবতীয় অর্জন, সবটুকু অধিকার খোয়াবে। গণতন্ত্রপ্রিয় সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বামপন্থীদের এই মুহূর্তে একমাত্র কাজ এদের নির্মূল করা। মহাভারতে পাণ্ডবদের মহাপ্রস্থানের পর রাজপাট বুঝে নিয়েছিলেন পরীক্ষিৎ। একবার অন্তত পরীক্ষায় উতরেছে যে, সে-ই তো পরীক্ষিত। সুতরাং, মিডিয়া  নির্মিত এবং লালিত বাইনারির বাইরে, ধর্ম নিয়ে রাজনীতির বিপরীতে রুটি-রুজির সংগ্রামে নজর থাকুক তৃতীয় বিকল্পে আর ভোটের দিন উদ্ধত আঙুল নামুক ইভি এমের নির্দিষ্ট বোতামে—বামপথে—রাজ্য চালানোয় ইতিপূর্বে যারা পরীক্ষিত।

Comments :0

Login to leave a comment