Editorial

অকারণ ভয় দেখানো

সম্পাদকীয় বিভাগ

চলতি বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি’র পালে হাওয়া তুলতে ঘুসপেটিয়া তথা অনুপ্রবেশই যে অন্যতম প্রধান ইস্যু সেটা রাজ্যের (কোচবিহারে) প্রথম নির্বাচনী জনসভাতে স্পষ্ট করে দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এটা অবশ্য নতুন কিছু নয়, এর আগে যতবার তিনি রাজ্য সফরে এসেছেন এবং সভা অনুষ্ঠানে ভাষণ দিয়েছেন তাতে বড় অংশজুড়ে ছিল অবৈধ বাংলাদেশি তথা মুসলিম অনুপ্রবেশকারী নিয়ে হিন্দুদের মধ্যে প্রবল ভীতি ও আতঙ্ক ছাড়ানো। একইভাবে মোদীর প্রধান সেনাপতি অমিত শাহও যতবার রাজ্যে এসেছেন অনুপ্রবেশকেই প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিয়েছেন। আরএসএস, বিজেপি বুঝে নিয়েছে বাংলায় তাদের পায়ের নিচে জমি শক্ত করতে হলে আর কোনও ইস্যু কাজ করবে না। অনুপ্রবেশই একমাত্র সম্বল। সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকাকে ঘিরে অজস্র ইস্যু থাকলেও আরএসএস লেবেলে তৃণমূলের সঙ্গে বোঝাপড়ার সুবাদে সেগুলিকে ভোটের ইস্যু না করার রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা আছে। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর থেকে সারদা, নারদ, কয়লা, গোরু, বালি-পাথর, রেশন, চাকরি ইত্যাদি যত চুরি-দুর্নীতি-কেলেঙ্কারি হয়েছে তার বেশির ভাগেরই তদন্তে দায়িত্ব বর্তেছে কেন্দ্রীয় সংস্থা ইডি এবং সিবিআই’র উপর। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য আজ পর্যন্ত কোনও দুর্নীতির তদন্ত মোদী-শাহদের পরিচালিত সংস্থা সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যায়নি। সবগুলিই কার্যত ঠান্ডা ঘরে ফেলে রাখা হয়েছে। তৃণমূলকে অপসারণ করার জন্য এই তদন্তগুলিই যথেষ্ট ছিল। যদি তদন্ত হতো তাহলে তৃণমূলের কোনও নেতাই জেলের বাইরে ভোটে লড়ার জন্য থাকত না। মোদীরা সচেতনভাবেই এইসব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলি এড়িয়ে আনছেন অনুপ্রবেশকে। কারণ দুর্নীতি নিয়ে বিজেপি’র বিশেষ মাথা ব্যথা নেই। মানুষের রুজি রোজগার, কৃষকের ফসলের দাম, বেকারদের চাকরি ইত্যাদিও তাদের অগ্রাধিকারে নেই। হিন্দুত্ববাদী আদর্শকে সামনে রেখে তারা হিন্দুদের ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িকভাবে জোটবদ্ধ করতে চায়। তারজন্য দরকার তীব্র মুসলিম বিদ্বেষ ও ঘৃণা। প্রবল মুসলিম ভীতি ও আতঙ্ক তৈরি করে হিন্দুদের বিভ্রান্ত করতে চায়। সেইজন্যই অনর্গল বলে যায় সীমান্ত পেরিয়ে হাজারে হাজারে, লাখে লাখে বাংলাদেশি মুসলিম এরাজ্যে ঢুকেছে। দ্রুত বাড়ছে মুসলিম জনসংখ্যা। এভাবে চললে অচিরেই বাংলায় হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়ে যাবে। বাংলা দখল করবে মুসলিমরা। বাংলার হিন্দুরা আবার উদ্বাস্তু হবেন।
মোদী-শাহ’রা অনর্গল অনুপ্রবেশ নিয়ে প্রচার চালিয়ে গেলে অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত কোনও নির্ভরযোগ্য বা বিশ্বাসযোগ্য কোনও তথ্য পরিসংখ্যান সরকারের হাতে নেই। বিভিন্ন নেতারা যখন যেমন মনে হয় কিছু মনগড়া সংখ্যা বলে যান। প্রথমে পূর্ববঙ্গ পরে বাংলাদেশ হবার পর আজপর্যন্ত যত জনগণনা হয়েছে তাতে এরাজ্যে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি কখনোই কোনও অস্বাভাবিক স্তরে যায়নি। ভারতে জন্ম হারের ক্ষেত্রে হিন্দু অপেক্ষা মুসলিমদের বৃদ্ধির হার বেশি কমছে। কিছু বছর উভয় সম্প্রদায়ের বৃদ্ধির হার সমান হয়ে যাবে।
বিশ্বের যেকোনও দেশেই অনুপ্রবেশ আছে। সাধারণত অপেক্ষাকৃত অনুন্নত দেশ থেকে উন্নত দেশে বেশি আয় ও উন্নত জীবনের জন্য মানুষ যায়। সে বৈধ পথে যেমন হয় অবৈধ পথেও হয়। যেমন আমেরিকায় অবৈধ পথে যত ভারতীয় অনুপ্রবেশ করে তার বেশিটাই যায় গুজরাট থেকে। সীমান্ত প্রহরাকে ফাঁকি দিয়ে কিছু অনুপ্রবেশ নিঃসন্দেহে ঘটে তবে সেটা সংখ্যা বড় কিছু নয়। তাদের চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানোও হয়। মোদী জমানায় এই ফেরত পাঠানোর থেকে পরিষ্কার প্রচারের সংখ্যার যৎকিঞ্চিৎও বাস্তবে অনুপ্রবেশ হয়। আসামে এনআরসি করে কার্যত কোনও অনুপ্রবেশকারীই খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিহারে এসআইআর করে কত অনুপ্রবেশকারীর খোঁজ মিলেছে সরকার বলতে পারেনি। এরাজ্যেও অনুপ্রবেশকারী মিলেছে এমন খবর সরকারিভাবে জানা যায়নি। অনুপ্রবেশ অতীতে ছিল, এখনও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। তবে সেই সংখ্যাটা কখনোই বড়সড় কিছু নয়। সরকারি ব্যব্স্থাতেই অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত হয় এবং ফেরত পাঠানো হয়। কিছু অনুপ্রবেশকারী আছে, যারা সাময়িকভাবে কাজের জন্য আসে আবার চলেও যায়। তারজন্য জনবিন্যাসের কিছুই বদল হয় না। এতবছর ধরে যখন জনবিন্যাসের কোনও পরিবর্তন হয়নি তখন মোদী জমানাতেও হবে না।

 

Comments :0

Login to leave a comment