কৌশিক দাম: ধূপগুড়ি
ক্যালেন্ডারের পাতায় চৈত্র শেষ হতে চলল। দু’দিন পরেই পয়লা বৈশাখ, নতুন খাতা। কিন্তু উত্তরবঙ্গের কৃষিপ্রধান ধূপগুড়িতে বাজারের চিরাচরিত সেই চৈত্র সেলের হাঁকডাক নেই, নেই ক্রেতাদের চেনা ভিড়। উৎসবের মুখেও কেন খাঁ খাঁ করছে বাজার? উত্তর খুঁজতে গেলেই বেরিয়ে আসছে আলু চাষিদের বুকফাটা আর্তনাদ। চলতি মরশুমে আলু চাষে যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও ধসা রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে, তার সরাসরি মরণকামড় পড়েছে গ্রামীণ অর্থনীতিতে।
বাজারে কেনাকাটা না হওয়ার জন্য চাষের ক্ষতি এবং কৃষকের হাতে নগদ অর্থের অভাবকেই দায়ী করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। বস্ত্র ব্যবসায়ী প্রবীর কুন্ডুরর কথায়, "অতীতে এই সময়ের অনেক আগেই চৈত্র সেল শুরু হয়ে যেত। এবার বাজার পুরোপুরি স্তব্ধ। খুব প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাজারমুখো হচ্ছেন না। আমরা নতুন করে বৈশাখের মালও তুলিনি, পুরোনো স্টকই শেষ হচ্ছে না।" একই সুর জুতো ব্যবসায়ী রাজা দাস ও বিশ্ব বসাকের গলায়। তাঁদের দাবি, আলুর ন্যায্য দাম না পাওয়া এবং ফলন মার খাওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা তলানিতে ঠেকেছে।
আলু চাষিদের এই চরম দুর্দশা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন চালাচ্ছে সারা ভারত কৃষক সভা। বামফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থীর সমর্থনে গ্রামে গ্রামে প্রচারে গিয়ে কৃষকদের ক্ষোভের বাস্তব ছবিটা দেখছেন কর্মীরা। কৃষক সভার জলপাইগুড়ি জেলা সম্পাদক প্রাণ গোপাল ভাওয়াল ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, "সরকার ন্যায্যমূল্যের প্রচার করলেও আদতে কৃষকরা বঞ্চিত। বিমার টাকা মেলেনি, অথচ হিমঘরে আলু রাখতে গেলে পচন ধরার আশঙ্কায় আলুর বন্ডে লিখে দেওয়া হচ্ছে 'পচনশীল'। এটি কৃষকদের ওপর চরম মানসিক ও আর্থিক অত্যাচার। সরকার বা প্রশাসন—কেউই কৃষকের চোখের জল মোছাতে পাশে নেই।"
ধূপগুড়ির বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিআই (এম) প্রার্থী নিরঞ্জন রায় প্রচারের ময়দান থেকে সরাসরি শাসক ও প্রধান বিরোধী দলকে আক্রমণ শানিয়ে বলছেন, "তৃণমূল আর বিজেপি দুজনেই ইস্তাহারে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, কিন্তু যখন অকাল বৃষ্টি আর ধসা রোগে আলু পচছিল, তখন কোনো নেতাকে মাঠে দেখা যায়নি। রাজ্য সরকার বলছে তারা আলু কিনছে, কিন্তু সাধারণ চাষি সেই সুবিধা পাচ্ছে না। ফড়ে-ব্যবসায়ীরা পকেট ভরছে, আর ঋণের দায়ে চাষি আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।" তিনি আরও যোগ করেন, ইভিএম-এ আঙুল রাখার আগে কৃষকরা এবার হিসাব বুঝে নেবেন যে, কে বিপদে পাশে ছিল আর কে শুধু 'বসন্তের কোকিল'।
চাষি দিলীপ রায়ের মতো শত শত কৃষক এখন দিশেহারা। তিনি ভেজা চোখে জানান, "জমি বৃষ্টির জলে শেষ হয়ে গেছে। হিমঘর থেকে আলু বের করার পর কী অবস্থা হবে কেউ জানে না।" অথচ অভিযোগ, শাসকদলের প্রার্থীরা আলুর ক্ষতির প্রসঙ্গ উঠলে সুকৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছেন অথবা দায়সারা আশ্বাস দিচ্ছেন।
ভোটের বাজারে রাজনীতির পারদ যতটা চড়ছে, কৃষকের হেঁশেলের অবস্থা ঠিক ততটাই হিমশীতল। যে আলু বাংলাকে খাওয়ায়, আজ সেই আলুর ক্ষতির জেরেই বন্ধ হতে বসেছে পয়লা বৈশাখের নতুন জামাকাপড় কেনা। চাষি ও ব্যবসায়ীদের এই নীরব প্রতিবাদ ভোটের বাক্সে কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার।
Comments :0