BOOK | "Scientific Temper" | SHYAMAL CHAKRABORTY | MUKTADHARA | 4th YEAR | 23 JUNE 2026

বই | বিজ্ঞানভাবনা প্রসারের এক আবশ্যিক গ্রন্থ | শ্যামল চক্রবর্তী | মুক্তধারা | বর্ষ ৪ | ২৩ জুন ২০২৬

নতুনপাতা/মুক্তধারা

BOOK  Scientific Temper  SHYAMAL CHAKRABORTY  MUKTADHARA  4th YEAR  23 JUNE 2026

বই | বিজ্ঞানভাবনা প্রসারের এক আবশ্যিক গ্রন্থ
       শ্যামল চক্রবর্তী

মুক্তধারা | বর্ষ ৪ | ২৩ জুন ২০২৬
 

বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ প্রকাশিত ‘রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী স্মৃতি পুস্তকমালা’ ইতোমধ্যে বিজ্ঞান আগ্রহী পাঠক পঠিকার কাছে যথেষ্ট পরিচিতি অর্জন করেছে। এই পুস্তকমালার সপ্তদশ সংযোজন হিসাবে অর্ণব রায়ের লেখা ‘বিজ্ঞানমনস্কতার বনিয়াদ’ বইটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। ইতিহাসের আলোকে বিজ্ঞানের দর্শন ভাবনা বইটির মুখ্য আলোচনার বিষয়। বইয়ে রয়েছে মোট পনেরোটি পরিচ্ছেদ। এদের শিরোনাম খুবই স্পষ্ট যা থেকে পাঠকবন্ধুরা আলোচ্য বিষয়বস্তুগুলি অনুমান করতে সমর্থ হবেন। ক্রমান্বয়ে পরিচ্ছেদগুলির একটা সাধারণ পরিচয় আমরা পেশ করব। লেখকের অভীপ্সার কথা আগে বলে নিই। লেখক চেয়েছেন, ‘বিজ্ঞানচিন্তা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদ প্রসারের’ কাজে বইটি যেন সহায়ক সামগ্রী হয়ে ওঠে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই এই বইয়ের পরিবেশনাগুলি আমরা আলোচনা  করব। 
শুরুর পরিচ্ছেদে লেখক বিজ্ঞান, বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদের সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। ‘বিজ্ঞান’  বলতে গেলে  ‘প্রযুক্তি’র কথা বলতেই হয়। জীবনমানের বদলে সরাসরি কাজ করে ‘প্রযুক্তি’। প্রেক্ষাপটে থাকে  ‘বিজ্ঞান’। বিজ্ঞানের রয়েছে বহুমাত্রিক সংজ্ঞা। প্রকৃতির নিয়মকে ‘বিজ্ঞান’ বলা হয়। ‘প্রকৃতির উপর বিজ্ঞানের আধিপত্য’ যদিও বলেছেন ক্রাউমান, ‘প্রযুক্তির আধিপত্য’ বললেই যথার্থ হতো বলে মনে হয়। বিজ্ঞান ঐতিহাসিক জর্জ সার্টন ও জে ডি বার্নাল দু’জনের কেউই বিজ্ঞানের কোনও একমাত্রিক সংজ্ঞা দানে আগ্রহ দেখাননি। বিজ্ঞানমনস্কতার কথা বলতে গিয়ে লেখক যথার্থভাবেই আইনস্টাইনের উদ্ধৃতি কাজে লাগিয়েছেন। যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ করলেই কেউ বিজ্ঞানমনস্ক নাও হতে পারেন। তার উদাহরণতো আমাদের চারপাশে রয়েছেই। লেখক সঠিক উপলব্ধি থেকেই লিখেছেন, ‘বিজ্ঞানের সুদীর্থ ইতিহাস, তার জানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ঘাত-প্রতিঘাত, উত্থান-পতন, চিন্তার সংগ্রাম ও তার জয়-পরাজয়—এমন সবকিছু থেকেই বিজ্ঞানমনস্কতার ভিত্তি ও সৌধ গড়ে ওঠে।’ যুক্তিবাদের সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্ক খুঁজতে গিয়ে লেখক আমাদের জানিয়েছেন, ‘বিজ্ঞানের ইতিহাস যুক্তিবাদের ইতিহাস, বিজ্ঞানের দর্শন যুক্তিবাদের দর্শন, বিজ্ঞানের চেতনা যুক্তিবাদের চেতনা।’ 
কেমন করে উদ্ভব হলো বিজ্ঞানের, বইয়ের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে সে কথা আলোচিত হয়েছে। উদ্ভবের সাল তারিখ দেওয়া অসম্ভব। আদিম জীবনে কেমন করে বিজ্ঞানের ধারণা গড়ে উঠেছে, সংক্ষেপে আলোচনা করেছেন লেখক। তৃতীয় পরিচ্ছেদে এসেছে কৃষি ও ধাতু প্রযুক্তির কথা। এসেছে পশুপালন, বয়ন ও মৃৎশিল্পের  আলোচনা। প্রাচীন নানা সভ্যতা কেমন করে বিজ্ঞানের অবয়ব দান করেছে, স্বল্প পরিসরে লেখক তা উল্লেখ করেছেন। চতুর্থ অধ্যায়ে লৌহ যুগ ও তারপরের বিজ্ঞান-প্রযুক্তির কথা বলেছেন। ভারতীয় সভ্যতায় তার কী প্রভাব পড়েছে সে কথা আলোচনায় এনেছেন। অন্য প্রাচীন সভ্যতারও উল্লেখ রয়েছে। 
পঞ্চম পরিচ্ছেদে আমরা বস্তুবাদ ও বিজ্ঞান দর্শনের পরিচয় পাই। স্বভাবতই শুরুতে গ্রিক দার্শনিকদের কথা রয়েছে। এসেছে প্রাচীন ভারতের বস্তুবাদী দর্শনের কথা। পরের অধ্যায়ে লেখক আরব দেশের বিজ্ঞান ও ইসলামিক দার্শনিকদের পরিচয় দিয়েছেন। সপ্তম অধ্যায়ে এসেছে ইউরোপীয় রেনেসাঁসের কথা। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কেননা সেখানে লেখক জানিয়েছেন, প্রচলিত ধারণার অবসান ঘটিয়ে কেমন করে, নতুন দর্শন বিকশিত হলো। আ্যারিস্টটলীয় ভাবনা থেকে বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর ভাবনা জায়গা পেল বিজ্ঞানের ইতিহাসে। দেকার্তে ও ফ্রান্সিস বেকনের কথা এসেছে। অষ্টম পরিচ্ছেদের সংযোজন বইটিকে নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ করেছে। এখানে এসেছে টমাস কুনের ‘প্যারাডাইস বিতর্ক’ নিয়ে আলোচনা। নবম পরিচ্ছেদে লেখক বিজ্ঞান ইতিহাসের চারটি ধ্রপদী গ্রন্থের প্রাথমিক পরিচিতি দান করেছেন— বার্নালের ‘সায়েন্স ইন হিস্ট্রি’, সার্টনের ‘ইনট্রোডাকশন টু দ্য হিস্ট্রি অব সায়েন্স’, যোসেফ নীডহ্যামের ‘সায়েন্স ‌অ্যান্ড সিভিলাইজেশন ইন চায়না’ ও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের ‘এ হিস্ট্রি অব হিন্দু কেমিস্ট্রি’। দশম পরিচ্ছেদের শিরোনাম ‘আধুনিক বিজ্ঞানের পদ্ধতিতন্ত্র ও মূল্যবোধ’। নিছক তথ্যনির্ভর পরিচ্ছেদ নয়। নানা ভাবনাকে উসকে দিতে লেখক সমর্থ হয়েছেন।বিজ্ঞানের সত্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যে বিজ্ঞানীরা নির্যাতিত হয়েছেন তেমন কয়েকজনের কথা লেখক একাদশ অধ্যায়ে যুক্ত করেছেন। তালিকায় রয়েছেন গ্যালিলিও, ডারউইন, সক্রেটিস, চার্বাক সম্প্রদায়, অ্যানাক্সাগোরাস, অ্যারিস্টর্কাস, ইবন রুসদি, উইলিয়াম অব ওকাম, হাইপেশিয়া, উলুঘ বেগ, প্যারাসেলসাস, জিওর্দানো ব্রুনো, লুইগি গ্যালভানি ও নরেন্দ্র দাভোলকর। অপবিজ্ঞান, অন্ধবিশ্বাস, ও কুসংস্কার নিয়ে লেখক পরের অধ্যায়ে আলোচনা করেন। প্রসঙ্গক্রমে এই অধ্যায়ে লেখক সুন্দরভাবে তা পেশ করেছেন। 
বইটির শেষ পরিচ্ছেদে রয়েছে ভারতে বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে তোলার প্রচেষ্টার ইতিহাস। বাংলায় বিজ্ঞানচর্চা ও বিজ্ঞান সংস্কৃতির একটা চেহারা তুলে ধরেছেন লেখক। 
একথা বলতেই হবে যে লেখক অতি বড় পরিসরেও ইতিহাস সচেতনতাকে গুরুত্ব দিয়ে বিজ্ঞান, দর্শন ও বিজ্ঞানমনস্কতার কথা আমাদের কাছে নিবেদন করেছেন। দুশো পৃষ্ঠায় এমন বহুবিধ ভাবনার যথার্থ সম্পর্ক রচনা খুব সহজসাধ্য নয়। লেখক সেকাজে সফল হয়েছেন। দেশে আজ বিজ্ঞানমনস্কতার বড় সঙ্কট। এই বইটি সে সঙ্কট নিরসনে সহায়ক হয়ে উঠবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। বইটিতে রয়েছে অনেক আলোকচিত্র। বানান ভুল নেই। সুদৃশ্য প্রচ্ছদ। যে স্বপ্ন নিয়ে বিজ্ঞানী সত্যন্দ্রনাথ বসু ‘বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ’ গড়ে তুলেছিলেন, এই বইটি সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নে নিশিচত ভূমিকা পালন করবে। 
 

বিজ্ঞানমনস্কতার বনিয়াদ
অর্ণব রায়। বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ। ৩০০ টাকা

Comments :0

Login to leave a comment