TMC and BJP

হারাধনের সন্তান ও নীলকণ্ঠ মহাদেব

স্পটলাইট

জহর সরকার 
তৃণমূল কংগ্রেস গোহারান হারার পরে যে বিধায়কদের হঠাৎ বিবেক জেগে উঠেছে— প্রায় সকলকেই আমি চিনি— তাঁদের কাছে আমার একটি আবেদন। 
আপনারা দলের এই দুর্দিনে টিএমসি-বিরোধী সুনামি থাকা সত্ত্বেও তৃণমূলের টিকিটে জিতেছেন। ভোটাররা আপনাদের পাঠিয়েছে বিজেপি’র বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে — ঠিক যেভাবে শুভেন্দু অধিকারী একনিষ্ঠভাবে তৃণমূল সরকারের একের পর এক পর্দা ফাঁস করতেন। 
যাইহোক, এই জনপ্রতিনিধিদের কাছে আমার আবেদন— আপনারা যদি বিজেপি’র সঙ্গে যেতে চান বা বাইরে থেকে তাদের সমর্থন করতে চান, নিশ্চই করুন— কিন্তু আগে ইস্তফা দিন। অনেকেই সারা জীবন মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন — এখন আদর্শের সাথে সমঝোতা করছেন। আর যাঁরা মুসলিম— তাঁদের গেরুয়া হিন্দুত্ববাদী রূপ ভোটাররা মেনে নেবে তো? আগে ইস্তফা দিয়ে তারপর ভোটে দাঁড়িয়ে পুনর্নির্বাচিত হয়ে আসুন। 
তবেই তো জনাদেশ পালন করা হবে— তাই না?  দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল থেকে সসম্মানে রেহাই পাবেন আর নিন্দুকেরা যেসব রফা বা সেটিংয়ের কথা বলছেন, তাঁদের মুখও বন্ধ হয়ে যাবে। এই সরকার প্রতিজ্ঞা করেছে দুর্নীতির সঙ্গে কোনও আপস করবে না। তাহলে এটা কী চলছে?
রাজ্য বিধানসভায় তো বিজেপি’র যথেষ্ট আসন আছে। দলছুট বা বিদ্রোহী বিধায়করা নতুন শাসকদলের বাড়িতে স্থান পাবেন না— এটা স্পষ্ট। শুনেছি তাঁরা নাকি বারান্দার আশ্রয়েই খুশি, যতক্ষণ না পর্যন্ত ওঁদের বিরুদ্ধে কোনও আইনি পদক্ষেপ হচ্ছে। তার মানে কি দুর্নীতিবাজ বিধায়ক এলাকার বাসিন্দাদের বিপদে ফেলে বেআইনি বাড়ি তৈরি করেই যাবে? এক মাসেই কি নির্বাচনের শপথ ভুলে যাবে সকলে?
কিন্তু দিল্লির সংসদে তো নরেন্দ্র মোদীর সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। তিনি সরকার গঠন করেছেন এনডিএ’র ছোট ছোট পার্টিদের সমর্থনে। আর বাইরে থেকে ২৮টি আসন দিয়ে তাঁকে সাহায্য করেছে তেলুগু দেশম (চন্দ্রবাবু) আর জনতা দল (নীতীশ)। এদিকে আপের তিনজন লোকসভা সদস্য মূল দলের সঙ্গেই রয়ে গিয়েছেন। 
এই সুযোগে শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূলের ২১ জন লোকসভা সাংসদকে বিজেপি’র দিকে টানতে চাইছেন। আর এই কাজে বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যে অনেকখানি সাফল্য হাসিল করেছেন। ওই সব সাংসদদের মূল্য কিন্তু এখন বিশাল— ওঁরা দলে ভিড়লে দিল্লিতে বিজেপি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে। 
কিন্তু একই বিবেক আবার খোঁচা দিচ্ছে। তাঁরা তো ভোটারদের বলেছিলেন, বিজেপি’র মোকাবিলা করবেন। এখন যখন ঘর করতে বসেছেন, ছাদনাতলায় যাওয়ার সময় একবার ভোটারদের সম্মতি নিলে ঠিক হতো না? কী? আর কী শর্তে যাচ্ছেন, সেটা একটু খোলসা করলে হয় না? শুধু অভিষেক অভিষেক বলে দোষারোপ করলে তো সব হয়ে যাবে না।            
এতোই যদি রাগ ছিল, তাহলে ২০২৪ সালে আমি যখন বীতশ্রদ্ধ হয়ে রাজ্যসভার সাংসদ পদে ইস্তফা দি?য়েছিলাম, তখন আপনারা সবাই চুপ করেছিলেন কেন? আমার নাম শুনলেই অভিষেক আর তাঁর পিসি রাগে জ্বলে উঠতেন, কই তখন কেউ মুখ খোলেননি তো। আসলে নতুন বাস্তবিক সত্য এটা যে, শুধু একবার বিজেপি’র ওয়াশিং মেশিনে ঢুকলেই সবাই ধপধপে সাদা হয়ে যায়। সব অভিযোগ বা দুর্নীতি চাপা পড়ে যাবে।
আর রাজ্যসভার অঙ্কটা তো একেবারেই আলাদা। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে গেলে মোদীর ১২৩টি আসন দরকার — এদিকে তাঁর হাতে আছে মোটে ১০৭ টি। তাই কয়েকদিন আগে রাঘব চাড্ডাকে দিয়ে আম আদমি পার্টি ভাঙিয়ে সাত জন রাজ্যসভার সাংসদকে পকেটে পুরেছেন। এখন বিজেপি’র হাতে আছে ১১৪ — আর ৯ জন পেলেই তারা তাদের ১২৩ টার্গেট পূরণ করে ফেলবে । 
তাই রাজ্যসভায় তৃণমূলের ১৩ জনের উপর এত নজর। তিন জন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন, এর সহজ-সরল হিসাব হলো, এই তিনটি আসনই বিজেপি পেয়ে যাবে। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় তো তাদের ২০৭ টি আসন হাতে আছেই। আর নতুন বিদ্রোহী তৃণমূল দলের সদস্য সংখ্যা ৬৪। 
রাজ্যসভার আমার এই তিন বন্ধু কী শর্তে পদত্যাগ করেছেন জানি না — জেনেই বা কী হবে? তাঁরা তিনটে আসনই বিজেপি-কে উপহার দিলেন। মোদীর ১১৪ এখন হবে ১১৭। মাত্র ৬টা রান করা বাকি।
রাজ্যসভায় হারাধনের এখন রইলো বাকি ১০টি সন্তান। দেখি ক’জন কী করে বা কী সেটিংয়ে যান। যাঁরা তৃণমূলকে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিপরায়ণ বলে নির্বাচনে জিতেছেন, এখন তাঁরাই ওই কলঙ্কিত পার্টির সদস্যদের একদম ‘সাদা’ বলছেন।
লোকে বলে বিজেপি এখন কাঁটা আর ছুরি দিয়ে, সাথে টমেটো সস লাগিয়ে, তৃণমূলকে উপভোগ করছে। বদহজম হবে না তো? সকলেই তো আর নীলকণ্ঠ মহাদেব নন।

Comments :0

Login to leave a comment