Spotlight

আঠারো বছর বয়স থেকে জেন-জি: প্রতিবাদের নতুন অভিধান লিখছে তরুণেরা

জাতীয় স্পটলাইট

প্রতীম দে

এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্য
বাষ্পের বেগে ষ্টীমারের মতো চলে, 
প্রাণ, দেওয়া নেওয়া ঝুলিটা থাকে না শূন্য
সঁপে আত্মাকে শপথের কোলাহলে...

বাংলা সাহিত্যে তরুণের শক্তি, ক্ষোভ এবং সম্ভাবনার এমন শক্তিশালী উচ্চারণ খুব কমই আছে, যেমনটি করেছিলেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁর 'আঠারো বছর বয়স'-এ। সুকান্তের সেই আঠারো বছরের তরুণ আজ আর শুধু বাংলার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। একবিংশ শতাব্দীর জেন-জি, যাদের জন্ম মূলত ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে আজ বিশ্বের নানা প্রান্তে অন্যায়, বৈষম্য, দুর্নীতি, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং ভবিষ্যতের দাবিতে রাস্তায় নেমেছে। তাদের হাতে শুধু প্ল্যাকার্ড নয়, রয়েছে স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া এবং মুহূর্তে বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা।
সাম্প্রতিক কয়েক বছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরুণদের নেতৃত্বে যে সব আন্দোলন হয়েছে, সেগুলি দেখিয়ে দিয়েছে যে নতুন প্রজন্ম কেবল দর্শক হয়ে থাকতে রাজি নয়। তারা রাষ্ট্র, সমাজ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে জবাবদিহি দাবি করছে।
স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া নিট দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেন-জি আন্দোলন এক অন্যতম উদাহরণ।
ভারতেও তরুণদের আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ। স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে জরুরি অবস্থার বিরোধিতা, মণ্ডল কমিশন, দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন কিংবা নাগরিক অধিকার—প্রতিটি সময়েই ছাত্রসমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে নিট (NEET) পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস এবং পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ছাত্রদের ক্ষোভ নতুন মাত্রা পায়। দিল্লিতে সংসদ অভিযানের ডাক, বিভিন্ন রাজ্যে বিক্ষোভ, শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতার দাবি এবং পরীক্ষা সংস্কারের প্রশ্নে তরুণদের প্রতিবাদ জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে। আন্দোলনের জেরে কেন্দ্রীয় সরকার পরীক্ষা সংস্কারের উদ্যোগ ঘোষণা করে। প্রশ্ন ফাঁস বিরোধী আইন আরও কঠোর করার জন্য সংশোধনী বিল এনেছে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্ক ফোর্স গঠনের কথাও জানিয়েছে। একই সময়ে আন্দোলন মোকাবিলায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয় এবং বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। সেখানেও প্রশ্নের মুখে পড়েছে সরকার। এসব ঘটনায় গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ, আইন-শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
যে ‘মোদী সরকার’ আলোচনায় বসতেই অরাজি থেকেছে, এমনকি সংসদেও জবাবদিহির তোয়াক্কা করছিল না, সেই সরকারের শিক্ষামন্ত্রী চাপে পড়ে বাধ্য হয়েছেন পদত্যাগ করতে। মণিপুরের জাতি হিংসাকে কেন্দ্র করে যখন দেশ উত্তাল হয়েছিল তখনও প্রধানমন্ত্রীকে কোনও কথা বলতে শোনা যায়নি। 
পড়ুয়াদের আন্দোলনে গোড়ায় চুপ থাকলেও পরে মাথা নোয়াতে হয়েছে। বার বার সামাজিক মাধ্যমে রিল পোস্ট করতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে। 
তবে এই আন্দোলনকে অনেক ভাবেই কলঙ্কিত করতে চেয়েছে বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী বার্তা দিচ্ছেন পড়ুয়াদের স্বার্থ সরকার দেখবে। অন্যদিকে তার দলের নেতারা এই আন্দোলনকে বলেছেন রাষ্ট্রবিরোধী উন্মাদনা। রাজ্য বিজেপি’র মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেন, ‘প্রচন্ড রাষ্ট্রবিরোধী উন্মাদনা। ছাত্র ও যুব সমাজের নামে সরকারের বিরোধিতা করতে গিয়ে রাষ্ট্রের বিরোধিতা করছে।’
এই সবের আক্রমণের মুখে পড়েও আন্দোলনের পথ ছাড়েননি পড়ুয়ারা। তাদের জেদের কাছে মাথা নত করে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ধর্মেন্দ্র প্রধান।
তবে শুধু এদেশেই নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তেই জেন-জি রা শাসকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে পথে নেমেছে। যেমন বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন তার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত বৃহত্তর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহির দাবিতে রূপ নেয়। সংঘর্ষ, প্রাণহানি এবং অস্থিরতার মধ্য দিয়ে দেশটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়। এই আন্দোলন দেখিয়ে দেয়, সংগঠিত ছাত্রসমাজ একটি দেশের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও এর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে এখনও নানা বিতর্ক রয়েছে, তবু তরুণদের ভূমিকা ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
সার্বিয়াতেও সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা দুর্নীতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং জননিরাপত্তার প্রশ্নে ধারাবাহিক বিক্ষোভ গড়ে তুলেছে। একটি মর্মান্তিক অবকাঠামোগত দুর্ঘটনার পর শুরু হওয়া প্রতিবাদ ক্রমে সরকারের জবাবদিহির দাবিতে পরিণত হয়। শান্তিপূর্ণ অবস্থান, বিশ্ববিদ্যালয় দখল কর্মসূচি এবং নাগরিক সমাজের সমর্থন এই আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক মনোযোগ এনে দেয়।
কেনিয়ায় ২০২৪ সালে অর্থ বিলের বিরুদ্ধে তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া বিক্ষোভও বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়। সামাজিক মাধ্যমে সংগঠিত এই আন্দোলনে হাজার হাজার তরুণ অংশ নেন। প্রবল জনচাপের মুখে সরকার বিতর্কিত অর্থ বিল প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। যদিও সংঘর্ষে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে, তবু এই আন্দোলন প্রমাণ করে যে ডিজিটাল যুগে সংগঠিত জনমত রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ায়ও সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ছাত্রসমাজ নির্বাচন, দুর্নীতি এবং বিভিন্ন আইন সংশোধনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে রাস্তায় নেমেছে। তরুণদের এই প্রতিবাদ সরকারকে একাধিক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে। একইভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জলবায়ু পরিবর্তন, শিক্ষা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নেও জেন-জি প্রজন্ম আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছে।
এই আন্দোলনগুলির মধ্যে একটি মৌলিক মিল রয়েছে। সেগুলি কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি নয়। বরং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, স্বচ্ছতা, সমান সুযোগ এবং মর্যাদার দাবিও। আজকের তরুণেরা শুধু স্লোগান দেয় না, তথ্য সংগ্রহ করে, সামাজিক মাধ্যমে প্রচার চালায়, আন্তর্জাতিক সংহতি গড়ে তোলে এবং নিজেদের বক্তব্য বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেয়।
তবে জেন-জি আন্দোলনের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়ো তথ্যের বিস্তার, রাজনৈতিক মেরুকরণ, উস্কানি, সহিংসতার ঝুঁকি এবং আন্দোলনের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা প্রায় সব দেশেই দেখা যায়। তাই প্রতিবাদের পাশাপাশি তথ্য যাচাই, অহিংস অবস্থান এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সুকান্ত ভট্টাচার্য যখন 'আঠারো বছর বয়স' লিখেছিলেন, তখন তিনি তরুণদের মধ্যে দেখেছিলেন পরিবর্তনের আগুন। সেই আগুন ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, শোষণের বিরুদ্ধে, ভয়কে অস্বীকার করার সাহস। প্রায় আট দশক পর সেই একই চেতনা নতুন রূপে ফিরে এসেছে জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে। আজকের তরুণের হাতে কলমের পাশাপাশি রয়েছে ক্যামেরা, স্মার্টফোন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু তার প্রশ্ন একই সমাজ কি আরও ন্যায়সঙ্গত হবে? রাষ্ট্র কি আরও স্বচ্ছ হবে? শিক্ষা কি সত্যিই যোগ্যতার ভিত্তিতে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে?
সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, আন্দোলনের ভাষা বদলেছে। কিন্তু তরুণদের স্বপ্ন বদলায়নি। সুকান্তের 'আঠারো বছর'-এর সাহস আজও বিশ্বের নানা প্রান্তে জেন-জি প্রজন্মের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়। তারা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসের প্রতিটি বড় পরিবর্তনের পেছনে তরুণদের স্বপ্ন, সাহস এবং প্রশ্ন করার ক্ষমতাই সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই কারণেই জেন-জি-র আন্দোলন কেবল বর্তমানের খবর নয়। এটি আগামী পৃথিবীর রূপরেখা লেখার এক চলমান অধ্যায়।

Comments :0

Login to leave a comment