সবুজ গালিচায় নীল-সাদা জার্সি গায়ে রাইট উইং হোক বা ডাউন দ্য মিডল! লিওনেল মেসিকে আর বল ধরে ছুটতে দেখা যাবে না। তাঁর সময় থামিয়ে দেওয়া ড্রিবল, কোমরের দোলায় ডিফেন্ডারদের ছিটকে দেওয়া, জাদুকরি পাস কিংবা বাঁ-পায়ের শটে জাল কাঁপিয়ে দেওয়া অবিশ্বাস্য মুহূর্তগুলি আর চাক্ষুষ করা হবে না ফুটবলপ্রেমীদের।
সোমবার ফুটবলের চিরন্তন জাদুকর লিওনেল মেসি জানিয়ে দিলেন তাঁর সরে যাওয়ার বার্তা— আর্জেন্টিনার সেই বিখ্যাত ‘১০ নম্বর’ জার্সিটি এবার তুলে রাখলেন আলবিসেলেস্তেদের মহানায়ক। তাঁর এই বিদায় দেশের হয়ে শুধু একটি বুটজোড়া তুলে রাখা নয়, বরং এক যুগের অবসান।
রোজারিও-র সেই ছোট্ট ছেলেটি, হরমোনজনিত সমস্যায় যাঁর ফুটবলার হওয়া নিয়েই একদিন তৈরি হয়েছিল সংশয়, তিনিই একদিন পায়ের জাদুতে শাসন করে গেলেন গোটা বিশ্বকে। কোপা আমেরিকা থেকে শুরু করে কাতারের মাটিতে অধরা বিশ্বকাপ ছুঁয়ে দেখার সেই দীর্ঘ এবং কন্টকাবৃত পথ— সবকিছুতে মিশে ছিল তাঁর শ্রম। বলা ভালো, জাদু।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির মাঠে থাকা মানেই ছিল অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রচেষ্টা, তাঁর জাদুকরি স্কিল মাঠে বসে বা টেলিভিশনের পর্দায় যাঁরা চাক্ষুষ দেখেছেন, তাঁরা অনাবিল আনন্দে ভেসেছেন। ডিফেন্ডারদের চোখের পলকে বোকা বানিয়ে যখন তিনি বল পায়ে এগিয়ে যেতেন, সেই দৃশ্য ছবির মতো, কবিতার মতো!
পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া সেই বাঁ পায়ের বাঁকানো ফ্রি কিক কিংবা মাঝমাঠ থেকে ডিফেন্স চেরা নিখুঁত পাসগুলো অনুরাগীদের চোখে ভেসে বেড়ায় প্রতিনিয়ত। সোমবারের সেই বিষাদগ্রস্ত রাত ফুটবল বিশ্বকে এক শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিলো, কারণ ফুটবল মাঠে আগামীতে হয়তো আরও নতুন তারকার জন্ম হবে, দ্বিতীয় মেসি কি আর কখনও আসবে?
ফুটবলপ্রেমীদের উদ্দেশ্যে মেসির আবেগঘন বিরাট বার্তা আলোর গতিবেগে ছড়িয়ে পড়ল। মেসি লিখেছেন, ‘আমি এই কথাগুলো লিখেছিলাম ২১ জুলাই, ফাইনালের ঠিক দুই দিন পর… আজ, আমার বাবার সাথে যা ঘটেছে তার পরে, আমি এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আগের চেয়েও অনেক বেশি নিশ্চিত। ফাইনালের পর থেকে এই এতখানি সময় পার হওয়ার পর, এবং অনেক চিন্তাভাবনা করার পর, জানাচ্ছি আমি জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছি। এটি এমন একটি সিদ্ধান্ত যা ভেতরে গভীরভাবে আঘাত করেছিল এবং এখনও কষ্ট দিচ্ছে, তবে আমি বুঝতে পারছি যে এটাই সঠিক সময়।
আমি সবসময় আমার সবকিছু উজাড় করে দিয়েছি, শুধু গত কয়েক বছর যখন আমরা সবকিছু জিতেছি তখনই নয়, বরং তার আগেও। আমি সবসময় লড়াই করেছি এবং এই জার্সির জন্য সবকিছু দিয়েছি, যাতে আপনাদের আনন্দ দিতে পারি এবং ফুটবলের মাধ্যমে আপনাদের আর্জেন্টাইন হিসেবে গর্বিত বোধ করাতে পারি।’
মেসি আরও লিখেছেন, ‘এই কুড়ি বছর ধরে এত ভালোবাসার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। ভেতর থেকে আপনাদের চিৎকার ও সমর্থন মিস করব। এখন থেকে আমি আপনাদেরই একজন হয়ে যাব, সবসময় বাইরে থেকে সমর্থন করব—ভালো সময়ে এবং খারাপ সময়ে আরও বেশি করে। সবাইকে ধন্যবাদ। আমি শান্তি এবং গর্ব নিয়ে বিদায় নিচ্ছি, কারণ আমি জানি আমার সতীর্থদের সাথে মিলে আমরা আপনাদের এমন কিছু মুহূর্ত উপহার দিয়েছি যা আমরা একসময় কেবল স্বপ্নেই দেখতাম। আপনাদের সাথে এই সবকিছু অভিজ্ঞতা করা সত্যিই অবিশ্বাস্য ছিল। আমি আপনাদের ভালোবাসি! আমাকে আর্জেন্টাইন হিসেবে সৃষ্টি করার জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। ভামোস আর্জেন্টিনা।’
মারাদোনার অভাব পূরণ করেছেন তিনি। একুশ বছরের কেরিয়ার দেশের জার্সিতে চারটি ট্রফি জিতেছেন। অধিনায়ক হিসেবেই। তাঁর ক্যাবিনেটে রয়েছে একটি বিশ্বকাপ, দু’টি কোপা আমেরিকা ও ফিনালিজিমা। ২০৭ ম্যাচ খেলেছেন। গোল করেছেন ১২৫টি। যা আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের মধ্যে সর্বাধিক। বিশ্বকাপে ৩৪ ম্যাচ খেলে গোল রয়েছে ২১। দ্বিতীয় সর্বাধিক। কিলিয়ান এমবাপে পরের তাঁর স্থান। ১৩ অ্যাসিস্ট করেছেন, ছ’টি বিশ্বকাপে। বিশ্বমঞ্চে এত অ্যাসিস্ট করার নজির আর কোনও ফুটবলারের নেই। মেসির বিদায়ে তাই ভারাক্রান্ত ফুটবল বিশ্ব।
Messi
বিদায় নীল-সাদা জার্সিকে এটাই সঠিক সময়, অবসরের সিদ্ধান্তে মেসি
×
Comments :0