Attack on Education

‘দেশদ্রোহী’ থেকে ‘দিমাগি নকশাল’: ক্যাম্পাসে ভিন্নস্বর দমানোর কৌশল

জাতীয় রাজ্য স্পটলাইট

প্রতীম দে

বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি পাওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়। রাষ্ট্র, সমাজ, ইতিহাস, অর্থনীতি এবং রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার জায়গাও বিশ্ববিদ্যালয়। ভারতীয় গণতন্ত্রে বিশেষ করে দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (JNU), কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া কিংবা দেশের একাধিক কেন্দ্রীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরেই সেই বিতর্কের ক্ষেত্র। কিন্তু গত এক দশকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মত-ভিন্নমত নিয়ে বিতর্ককে স্তব্ধ করার চেষ্টা ধরা পড়ছে বারবার। 
বামপন্থী ছাত্র রাজনীতির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলিকে ঘিরে বিজেপি, আরএসএস ও তাদের ছাত্র সংগঠন এবিভিপি’র দখলের চেষ্টা বেপরোয়া মাত্রায় পৌঁছেছে। 
বামপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, এই সংঘাতকে শুধুমাত্র ছাত্র রাজনীতির স্বাভাবিক দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে ছবির একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়। যে সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে যুক্তিবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সামাজিক ন্যায়, শ্রেণি-অসাম্য, জাতপাত, শ্রমিক-কৃষকের অধিকার এবং রাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চর্চা হয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানগুলিকে একটি উগ্র সংখ্যাগুরুবাদী জাতীয়তাবাদের ভাবধারার কাঠামোয় নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। ২০১৬ সালে একটি প্রতিবেদনে ‘হিন্দুস্তান টাইমস’-ও উল্লেখ করেছিল, আরএসএসের অভ্যন্তরে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজকে ‘বামপন্থীদের ঘাঁটি’ হিসেবে দেখে সেই জায়গায় মতাদর্শগত লড়াই জোরদার করার কথা বলা হয়েছিল।
জেএনইউ এই বিতর্কের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ। বিশ্ববিদ্যালয়টিকে দীর্ঘদিন ধরে ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ বা ‘দেশবিরোধী’ চিন্তার কেন্দ্র বলে আক্রমণ করেছে দক্ষিণপন্থী আরএসএস-বিজেপি এবং তাদের অনুগামী বিভিন্ন সংগঠন। ২০১৫ সালে আরএসএস’র মুখপত্র পাঞ্চজন্য-তেও জেএনইউ-কে ‘দেশ বিরোধী’ বলা হয়। পরবর্তী সময়ে ক্যাম্পাসে ‘দেশপ্রেম’ বনাম ‘দেশবিরোধিতার’ বিতর্ক এতটাই তীব্র হয় যে ছাত্রদের রাজনৈতিক বক্তব্য, সেমিনার, পোস্টার, স্লোগান—সবই বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী বিতর্কের অংশ হয়ে ওঠে।
বামপন্থীদের বক্তব্যের মূল জায়গাটি এখানেই যে রাষ্ট্র বা সরকারের নীতির বিরোধিতা করা আর রাষ্ট্রবিরোধী হওয়া এক কথা নয়। সরকারের সমালোচনা, সামরিক নীতির প্রশ্ন তোলা, কাশ্মীর বা আদিবাসী অঞ্চলে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক করা কিংবা পুঁজিবাদ, বেসরকারিকরণ ও সামাজিক বৈষম্যের সমালোচনা গণতান্ত্রিক অধিকার। তাঁদের মতে, এই মতপ্রকাশকে যদি ‘দেশদ্রোহিতা’ বা ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ তকমা দিয়ে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন চিন্তার পরিসর সংকুচিত হতে বাধ্য। প্রশ্ন তোলার সুযোগ না থাকলে স্বাধীন চিন্তা বিকশিত হওয়ার সুযোগও থাকে না। 
হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে রোহিত ভেমুলার মৃত্যুর পর ছাত্র আন্দোলন, জেএনইউ-তে ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ এবং এফটিআইআই-তে সরকারি নিয়োগ ঘিরে ছাত্রদের আন্দোলন— এই ঘটনাগুলিও একই বৃহত্তর বিতর্কের অংশ হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, সরকারি নীতি এবং ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও ভারতের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ, ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।
আর সেই বিতর্কের সাম্প্রতিকতম প্রতীক হয়ে উঠেছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯ আগস্ট গভীর রাতে ফেটসু-র সাধারণ সভাকে কেন্দ্র করে এবিভিপি একেবারে ক্যাম্পাসে ঢুকে অরবিন্দ ভবনে আক্রমণ চালায়। আগুন জ্বালানো হয়।  ইট-পাথর ছোড়া, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও হামলার অভিযোগ উঠেছে। সেদিন সকালের পর থেকে শুরু হয় বহিরাগত এনে যাদবপুরে তাণ্ডব। সেখানে দেখা গিয়েছে যাদবপুরের বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখার্জিকে। ঘটনায় একাধিক ছাত্র আহত হয়েছেন।
যাদবপুরের ইতিহাস এই ঘটনাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে। ২০১৪ সালের ‘হোক কলরব’ আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নারী নিরাপত্তা, ছাত্র অধিকার, ফি, শিক্ষার বেসরকারিকরণ এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নে প্রতিবাদের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়েছে। ফলে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির কাছে যাদবপুর যেমন একটি আদর্শগত চ্যালেঞ্জ, তেমনই বাম ছাত্র রাজনীতির কাছে এটি স্বাধীন ও প্রতিবাদী ক্যাম্পাস সংস্কৃতির প্রতীক।
২০২৬ সালের মে মাসে আরএসএস ঘনিষ্ঠ সংগঠন ‘ক্রীড়া ভারতী’-র একটি যোগ দিবসের পোস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশকে ঘিরেও আপত্তি উঠেছিল। শিক্ষক, ছাত্র ও প্রাক্তনীদের একাংশের প্রতিবাদের পরে পোস্টারটি সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁদের বক্তব্য ছিল, কোনও নির্দিষ্ট মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত বাইরের সংগঠনের প্রচার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক ‘দিমাগি নকশাল’ মন্তব্য নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ১৫ আগস্ট লালকেল্লার ভাষণে মোদি বলেন, সশস্ত্র নকশালদের বিরুদ্ধে সাফল্য এলেও ‘দিমাগি নকশাল’ বা নকশালপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
সমালোচকদের প্রশ্ন, ‘দিমাগি নকশাল’ শব্দটির সংজ্ঞা কী? এর আগে ‘শহুরে নকশাল’ বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। অথচ সংসদে তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে কথার ব্যাখ্যাই দিতে পারেনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। ফলে প্রশ্ন উঠছে কোনও ব্যক্তি যদি সরকারের অর্থনৈতিক নীতি, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নীতি, কর্পোরেট প্রভাব, বেসরকারিকরণ বা সামাজিক বৈষম্যের সমালোচনা করেন, তাঁকেও কি সেই তকমা দেওয়া হবে? 
বামপন্থীদের আশঙ্কা, এই ধরনের শব্দবন্ধ ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক এবং ছাত্রদের উপর রাজনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হতে পারে।
ঘটনা হলো, যন্তর মন্তরে দুর্বার আন্দোলনের জেরে নরেন্দ্র মোদী সরকারকে পিছু হটতে হয়েছে। পদত্যাগ করতে হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে। পিছু হটলেও নবীন এবং প্রতিবাদী অংশকে আক্রমণের নির্দিষ্ট লষ্য করেছে বিজেপি-আরএসএস। 
অন্যদিকে বিজেপির যুক্তি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আড়ালে যদি রাষ্ট্রবিরোধী সহিংসতা বা সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদকে সমর্থন করা হয়, তা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই জায়গায় বিতর্কের মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত কোনও নির্দিষ্ট মতকে অপছন্দ করা আর তাকে নিষিদ্ধ করা কি এক জিনিস?
বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্র শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় তার প্রশ্ন করার ক্ষমতায়। সেখানে মুক্ত চিন্তা থাকবে। কিন্তু কোনও একটি মতকে ‘দেশপ্রেম’ এবং অন্য মতকে ‘দেশদ্রোহ’ বলে চিহ্নিত করে দিলে বিশ্ববিদ্যালয় আর বিতর্কের জায়গা থাকে না তা পরিণত হয় রাজনৈতিক আনুগত্য পরীক্ষার কেন্দ্রে।
যাদবপুর থেকে জেএনইউ এই লড়াই তাই কেবল ছাত্র সংগঠনের নয়। এটি আসলে ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভবিষ্যতে কতটা স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করতে পারবে, সেই প্রশ্ন। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সম্ভবত সংসদে নয়, শ্রেণিকক্ষ ও ক্যাম্পাসেই যেখানে একজন ছাত্রকে প্রশ্ন করার অধিকার দেওয়া হবে, উত্তরটি সরকারের পছন্দের হোক বা অপছন্দের।

Comments :0

Login to leave a comment