Dooars

নদী ও মানুষের অস্তিত্ব সংকটে ডুয়ার্স, হড়পা বানের গ্রাসে জনজীবন

জেলা

কৌশিক দাম
নদীখাত ভরাট, নির্বিচার বৃক্ষচ্ছেদ এবং পাহাড় কাটা—এই তিনের অভিঘাতে সামান্য বৃষ্টিতেই ডুয়ার্সের নদী ও ঝোরাগুলি ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। গত এক বছরে অন্তত ১৮ থেকে ২০ বার বিভিন্ন নদী ও ঝোরায় হড়পা বান এসেছে। আকস্মিক ভাবে প্রায়শই নদীর জলস্তর বেড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। ফলে নদী, পরিবেশ ও মানুষের জীবন—তিনই ক্রমশ অস্তিত্ব সংকটের মুখে।
নাগরাকাটা ও সংলগ্ন এলাকায় গত তিন মাসে অন্তত পাঁচবার পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। গত ৫ জুন ক্যারন চা-বাগান সংলগ্ন চুপাতাং নদীতে আচমকা হড়পা বানে দুই ব্যক্তির ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়। স্থানীয়দের তৎপরতায় তাঁদের উদ্ধার করা হয়। ৭ আগস্ট একই নদীতে আটকে পড়া এক তরুণকেও উদ্ধার করতে হয়।ওই দিনই তিন শ্রমিক গ্রাসমোড় চা-বাগান সংলগ্ন বালুখোলা নদীতে হড়পা বানে আটকে পড়েন। শেষ পর্যন্ত একটি আর্থমুভারে উঠে কোনওক্রমে প্রাণে বাঁচে।
জুলাইয়ের হড়পা বানে কুজি ডায়না নদীর উপর জাতীয় সড়কের সেতুর একাংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গত বছর গাঠিয়া নদীতেও আচমকা হড়পা বানে পাইপলাইনের কর্মীরা বিপদের মুখে পড়েছিলেন। একের পর এক ঘটনায় নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে।
পরিবেশবিদ ও গবেষকদের মতে, এই বিপর্যয়ের তাৎক্ষণিক কারণ অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি। ভূগোল বিভাগের শিক্ষক বরুন দাস বলেন, স্বল্প সময়ে বিপুল বৃষ্টিপাত হড়পা বান বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। তবে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের লাগাতার হস্তক্ষেপ। নির্বিচারে বৃক্ষচ্ছেদের ফলে বৃষ্টির জল ধরে রাখার মাটির স্বাভাবিক ক্ষমতা কমছে। গাছের শিকড় যে জল শোষণ করত, তা দ্রুত নেমে এসে নদীতে জমা হচ্ছে। বনসৃজনের ক্ষেত্রেও দেশীয় প্রজাতির পরিবর্তে অনেক সময় ভিনদেশী গাছ লাগানোর ফলে জলধারণের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ।


এর পাশাপাশি ভুটানের সামচি জেলায় শিল্পকেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য পাহাড় কাটার বিষয়টিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।পরিবেশপ্রেমী অভিযান সাহার দাবি, পাহাড় কাটার ফলে বিপুল পাথর ও মাটি নেমে এসে নদীখাত ভরাট করছে।জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সমস্যার স্থায়ী সমাধানে ভারত ও ভুটানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক ও নদী গবেষক সুপ্রতিম বিশ্বাসের মতে, বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও ভুটানের পাহাড় কাটা ডুয়ার্সের নদী-বাস্তুতন্ত্রে প্রভাব ফেলছে। তাই দ্রুত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধানসূত্র বের করতে হবে। একই সঙ্গে ভারত ও ভুটানের যৌথ উদ্যোগে একটি যৌথ নদী কমিশন গঠনের দাবিও উঠেছে।


প্রকৃতি ও নদীর উপর লাগাতার হস্তক্ষেপ বন্ধ না হলে আগামী দিনে ডুয়ার্সের একাধিক নদী, নদীখাত এবং জনবসতি আরও বড় বিপদের মুখে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে বহু নদী ও জনবসতির অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। নদী, বন ও মানুষের জীবন রক্ষায় এখনই সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের দাবি জোরালো হচ্ছে।

Comments :0

Login to leave a comment