Modi's Image Making

নমো-পূজার ছলে ভাবমূর্তি নির্মাণ

সম্পাদকীয় বিভাগ

শান্তনু চক্রবর্তী

তারপর নমো মঞ্চের ঠিক মাঝখানে এসে দাঁড়ান। তিনি তো এমন একজন পুরুষ, মঞ্চের মাঝখানটা ছাড়া যাঁকে কখনো মানায় না। বিশ্ব রাজনীতি, কূটনীতির মহামঞ্চে, দুনিয়ার তাবড় তাবড় নেতাদের ভিড়েও তিনিই তো মধ্যমণি হয়ে বিরাজ করেন। অমুক রাষ্ট্রপ্রধান, তমুক রাষ্ট্র নেত্রীকে এমন খপ করে জ‍‌ড়িয়ে ধরেন, যেন কলেজের পুনর্মিলন অনুষ্ঠানে আচমকা দেখা হয়েছে। 
যদিও তাঁর সম্পর্কে আলোচনায় স্কুল-কলেজের মতো শব্দ ব্যবহার নিষিদ্ধ। তাঁর শিক্ষা সংক্রান্ত যাবতীয় কাগজপত্রও দেশের নিরাপত্তা বিষয়ক নথির মতই ‘কঠোরভাবে গোপনীয়’। কারণ এইসব কেতাবি ডিগ্রি-টিগ্রি তাঁদেরই লাগে যাঁরা মামুলি, ছাপোষা, নেহাতই সাধারণজন। চিরকালে, পাতি জৈব-প্রক্রিয়ায় যাঁদের জন্ম। তিনি নমো, 'নন-বায়োলজিক্যাল"! গেরস্ত-বুদ্ধিতে তাঁর ক্ষমতা মাপামাপি যারা করে, তারা দেশদ্রোহী, 'দিমাগি-নকশাল"। তাঁর এই ইশারায় রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ ঝুপ করে থেমে যায়। দু’দেশের সেনারা দ্রোন-মিসাইল ছোঁড়াছুঁড়ি বন্ধ রেখে সীমান্তে কবাডি-কবাডি খেলতে লেগে যায়। সেই ফাঁকে নমোজী ইউক্রেনে আটকে থাকা হাজার হাজার ভারতীয়কে, লঙ্কা থেকে সীতা উদ্ধারের মতো করে আধুনিক পুষ্পক রথে চাপিয়ে দেশে ফেরত নিয়ে আসেন।
আর নমো-র সেই আশ্চর্য-অলৌকিক দৈবী পরাক্রমে চমৎকৃত-আপ্লুত কোনও ভারত-কন্যা, সরকারি ভক্তি-গদগদ আহ্লাদে বলে ফেলেন: ‘মোদীজি বন ওয়ার রুকা দি পাপা!’ এমন সৎ-সরল-স্বতঃস্ফূর্ত আবেগে ভসভসিয়ে বেড়িয়ে আসা আতিশয্য নিয়ে যারা সেদিন ‘ট্রোল’ করেছিল, তাদের মুখের ওপর জবাব ছুঁড়ে দিতেই মোদীজি এই মুহূর্তে মঞ্চের মাঝখানে, ৫৬ ইঞ্চি ছাতির ন্যায্য অহঙ্কার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। এইবার, তাঁর মুখে উচ্চারিত হবে সেই অমোঘ সংলাপ— তাঁর শপথ, সংকল্প, হৃদয়ের কলম আবেগের দোয়াতে চুবিয়ে লেখা সেই ‘মন কি বাত’ সৌগন্ধ আমাকে এই মাটির দেশকে মিটতে দেব না— আমি দেশ ঝুঁকতে দেব না। 
যাঁরা এই ধরনের সংলাপে হোঁচট খাবেন, মান্য বাংলা বাক্য-গঠন খুঁজে না পেয়ে মাথা চুলকাবেন, সেইসব বকবক, বুঝদিল বাঙালিদের বলছি। দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন করে নিন। মোদীজি যেটা বলছেন, সেটাই হলো মান্য ‘রাষ্ট্রবাদী বাংলা’। আজ্ঞে হ্যাঁ। এই তো সেদিন ঈশ্বরচন্দ্রের জন্মদিনে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, এতদিন বিদ্যাসাগরকে বামপন্থী ধারায় ‘উপস্থাপনা’ করা হয়েছে। এইবার ‘রাষ্ট্রবাদের আলোকে’ তাঁকে প্রতিষ্ঠা করা হবে। অবশ্য এই ‘প্রতিষ্ঠা’র কাজ কিভাবে হবে মন্ত্রীমশাই সে সবের কিছু ব্যাখ্যা দেননি। তার বছর কয়েক আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর রোড শো থেকে পূর্ণ ‘রাষ্ট্রীয় মর্যাদা’য় বিদ্যাসাগরের মূর্তির শিরচ্ছেদের কথা হয়তো বাঙালির স্মৃতিতে থেকে যেতে পারে।
তবে ‘বর্ণপরিচয়’-এর স্রষ্টা ঈশ্বরচন্দ্রকে য‍‌দি হিন্দি হিন্দু-হিন্দুস্তানের চাড-এ পুড়ে দেওয়ার ঘোষণা শোনা যায়, তাহলে বর্ণপরিচয়ের প্রথম-দ্বিতীয়ভাগ পড়ে বড় হওয়া বাঙালি কেন রাষ্ট্রবাদের সৌরভে ম-ম করা ‘নাটুকে’ বাংলা মেনে নিতে পারবেন না? আর শুধু সংলাপটুকু শুনিয়েই তো এই বাংলা-চর্চা থেমে যাচ্ছে না। এরপর একটা সমবেত নাচ-গানেরও ব্যবস্থা আছে। ‘‘আমি কথা দিয়েছি ভারত মাতাকে। আমি দেশকে ঝুঁকতে দেব না। ওরা যত আঁধার নামাবে। আমি তত আলো জ্বালব। ওরা যত রাত বাড়াবে। আমি তত সূর্য উদয় করব...।’’ এবং ইত্যাদি ইত্যাদি।
এখন প্রশ্ন হলো এই ‘ওরা’-টা কে? ওরা কী খান মার্কেট বা টুকরে টুকরে গ্যাং? আরবান কিংবা দিমাগি নকশাল? আজকের ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চ? নাকি সেকালের সনিয়া গান্ধী, ‍যিনি তাঁকে ‘মওত্‌ কা সওদাগর’ ব‍‌লেছিলেন? কিংবা অটলবিহারী বাজপেয়ী, যিনি তাঁকে ‘রাজধর্ম’ পালন করতে বলেছিলেন? অথবা এই ‘ওরা’ থাকে ওধারে! মানে সীমান্তের ওপারে? পড়শি পাকিস্তান বা চীন? নাকি জর্জ সোরসের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে থাকা ‘ডিপ স্টেট’-এর কোনো ছুপা রুস্তম, নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এখনও যার খোঁজ পাননি?
তবে? যেই হোক, একটা কথা না বললে, ইতিহাস বা সাংবাদিকতার ‘সত্যে’র (!) ভয়ানক অপলাপ হবে। এই যে মোদীজি নিজের বন্দনা-গানে গাইছেন ‘সূর্য উদয় করব’, ভারতবর্ষে এর আগে একজনই এই কাজটা করে দেখিয়েছেন। তিনি ‘বিরিঞ্চি বাবা’। সত্যজিৎ রায়ের মহাপুরুষ-এর ওই দৃশ্যটা নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। একদম ভোরবেলা চলন্ত ট্রেনের জানালা দিয়ে ‘ওঠ্‌ ওঠ্’ করে ধমক দিয়ে দিয়ে বাবাজী যেমন করে সূর্যকে জাগালেন মানে ‘উদয় করালেন’! তারপর বিস্ময়ে ভঙ্গিতে হাঁ হ‍‌য়ে যাওয়া সহযাত্রীদের দিকে লাজুক হেসে বলেন, রোজ এভাবেই ডেকে ডেকে তুলতে হয়। ভারি ফাঁকিবাজ! চন্দ্র-সূর্য সুদ্ধ গোটা ভুবনের ভার যাঁর ওপরে, ছবির ক্লাইম্যাক্সে সেই গুল বাজ ভণ্ড, প্রতারক ফেকু বাবাজীকে নিজের সাজানো রাজ্যপাট ছেড়ে কী করে পালাতে হয়েছিল, সেটাও আমাদের জানা আছে। আমাদের ‘অজৈবিক’ বিশ্বগুরু স্বয়ং গণেশের মাথার প্লাস্টিক সার্জারি পর্বে অপারেশন থিয়েটারে হাজির থাকতেও পারেন বলে যদি ভক্ত কুলের কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, তাতেও অসুবিধে নেই।
কিন্তু কথা হলো, হঠাৎ করে একমাস ধরে প্রধানমন্ত্রীজীর জন্মদিন ও কর্মদিন, মানে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রিত্বের অমৃতকাল মিলিয়ে সিকি-শতকের প্রশাসকগিরির বর্ষপূর্তির ধুম পড়ল কেন? এই যে রীতিমতো সরকারি বিজ্ঞাপন দিয়ে, কোটি কোটি টাকা খরচ করে, দিকে দিকে ‘সেবা-সংকল্প’ অভিযান চলল বা চলছে, সেটা কার সেবা? কাদের সংকল্প? কিসেরই বা অভিযান? এই প্রসঙ্গেও আমাদের আবার সত্যজিতের ছবির কথাই মনে পড়ছে। হীরক রাজ্য থেকে যখন শুণ্ডি রাজার দরবারে, হীরক রাজের শাসনের বর্ষপূর্তি উৎসবে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণপত্র এল, তখন সেটা নিয়ে গুপি-বাঘার অসাধারণ একটা কথোপকথন আছে। তারা বর্ষপূর্তিকে নাম দেয় ‘ভরসা-পূর্তি’! বাঘা তার ব্যাখ্যাও দেয় — ‘ভরসা পেয়ে গেছে তো তাই ফূর্তি! এখন নমো-জীর জন্মোৎসব তথা কর্মজীবনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এই সরকারি ফূর্তিকেও কি ‘ভরসা-ফূর্তি’ বলা যায়? নাকি সাম্প্রতিক দেশজোড়া ‘জেন-জি বিদ্রোহে’ ভরসা ‘আউট’ আর ‘ইন’ হয়ে দল ও প্রশাসনের অন্দরে যে কাঁপুনি ধরিয়েছে, সেটা থেকে মানুষের নজর ঘোরাতেই এই উৎসব-উৎসব ভাব? নিজেকে ‘আত্মবিশ্বাসী’ দেখানোর এই রাজ‍‌সিক আয়োজন?
‘হীরক রাজার দেশে’-র স্বৈরাচারীর রাজার মূর্তি উন্মোচনের দিনে, দেশ-বিদেশের রাষ্ট্রীয় অভ্যাগতদের সামনেই এক বেপরোয়া-বিদ্রোহী বিদ্যার্থী বালক গুলতি ছুঁড়ে ঠকাং করে মূর্তির নাক উড়িয়ে দেয়। রাজার কালাকানুন তার বই-খাতা-কলম-পাঠশালা কেড়েছে। সে ছেলেও শিক্ষাঙ্গনে স্বৈর-রাষ্ট্রের অকারণ নাক-গলানোর শোধ তুলে নেয় হাতে-হাতে। অনেকটা যেন সত্যজিতের পিতামহ উপেন্দ্রকিশোরের ‘টুনটুনির বই’-এর পাতা থেকে তুলে আনা নাক কাটা রাজা রে, দ্যাখ তো কেমন সাজা রে’ গোছের শাস্তিবিধান! কিন্তু সেসব তো সিনেমা বা গল্পের রূপক-কাহিনি। কিন্তু প্রবল পরাক্রান্ত নমো-জীও কী নিজেকে নিয়ে উৎসবের সরকারি ফতোয়া জারি করে দিকে ‍‌দিকে অবাধ্যতার ঢেউ ওঠার আশঙ্কা করছেন? সে জন্যই কী কোটি কোটি টাকা খরচ করে, তাঁর জন্মদিনে অকাল দীপাবলী উদ্‌যাপনের জন্য লক্ষ লক্ষ প্রদীপ, কিলো-কিলো ভোজ্য তেল বিলি করেও তাঁকে ও তাঁর সরকারকে উদ্বিগ্ন থাকতে হয়। নমো-উৎসবের ভিডিও পাঠানো বাধ্যতামূলক করতে হয়।
আসলে দেশের মানুষ, স্কুল-কলেজের পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রী তাদের দিদিমণি-মাস্টারমশাই, মোদীজি কাউকেই, বোধহয় বিশ্বাস করতে পারছেন না। তাই আলোচনার শুরুতেই আমরা যে নাটকটার কথা বলছিলাম, সেই ‘নমো সেবা — অজানা কাহিনি’-র পুরো স্ক্রিপ্ট, এমন কী তার সংশোধিত সংস্করণও কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই প্রত্যেকটা সরকারি ও সরকার পোষিত স্কুল-কলেজে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে শুধু চরিত্রদের নাম, বয়েস বা মুখের সংলাপই সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে তাই নয়, মঞ্চ বিন্যাস, স্থাপত্য, মঞ্চে ব্যবহৃত ‘প্রপ্‌স’। মঞ্চের ওপর অভিনেতাদের নির্দিষ্ট অবস্থান— মানে কুশীলবদের ‘তোলন-নামন-উঠন-বসন-ছড়ান-গুটোন’ সবটাই দিল্লি থেকে নির্ধারিত করে পাঠানো হয়েছে। কোনও ‘উলটো-পালটা, ঘূর্ণি চালটা’ দেওয়ার কথা রাখা হয়নি। বলা তো যায় না, কোন দিমাগি-নকশাল দিদিমণি বা মাস্টারমশাই, মঞ্চের সামনে নাটকের স্ক্রিপ্ট-মাফিক ছাত্র-ছাত্রীদের দিয়ে মোদী-জমানায় বিপুল প্রচার অভিনয় করেও, মঞ্চের পেছনে সাইক্লোরমা-র হয়তো গুজরাট দাঙ্গা, নোটবন্দির লাইনে দাঁড়ানো মানুষ বা আচমকা লক-আউট-এ দিশাহারা-অসহায় পরিয়ায়ী শ্রমিকদের ছবি বা ভিডিও দেখিয়ে দিলেন।
অন্তর্ঘাতের এই ভয় ছিল বলেই নাটকের নাম ‘নমো সেবা-অজানা কাহিনি’ হলেও, গুজরাট থেকে দিল্লি অবধি নরেন্দ্র মাহাত্ম্য প্রচারের অতি চেনা ন্যারেটিভগুলোই এখানে আরেকবার আওড়ানো হয়েছে। এমনকি, সাম্প্রতিক যন্তর মন্তর পর্বে বামপন্থী ছাত্র-ছাত্রীদের তরফে ‘কল নরেন্দ্র’-কে রক্ত-তামাশা দেশজুড়ে বা দেশ পেরিয়েও ‘ভাইরাল’ হয়ে গিয়েছিল। তাই ‘নমো-সেবা’-র অজানা কাহিনি থেকে নদী থেকে কুমির ধরা ইত্যাদি বাল্যলীলা প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এখানে কয়েকজন ‘মিলেনিয়াম’ নারী-পুরুষ, যারা কোনোকালে একসঙ্গে ইস্কুলে পড়ত, তারা তাদের জেন-আলফা বাচ্চাদের নিয়ে একটা কফিশপ-এ পুনর্মিলনের নামে জড় হয় আর পুরনো স্মৃতির জাবড় কাটার নামে কে কত বড় মোদী-ভক্ত সেটা প্রমাণের প্রতিযোগিতা চালায়। এবং দেখা যায় তারা প্রত্যেকেই ভক্তগিরিতে অন্তত কঙ্গনা রানওয়াতের কয়েক ধাপ এগিয়ে আছে। কারণ বলিউড তারকা ২০১৪ সালকে ভারতের প্রকৃত স্বাধীনতার বছর বলেছিলেন। একা সেটাকে পিছিয়ে ২০০১-এ মোদীর মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসার সময়ে নিয়ে যেতে চায়। অবশ্য অনেক গুণকীর্তন, ক্লাইম্যাক্সকে মোদী-চরিত্রটির আবেগ-মথিত ‘সৌগন্ধ আমাকে এই মাটির...’ ইত্যাদি সংকল্প-বাক্যের পরেও ‘জেন-আলফা’ বাচ্চাদের দিয়ে প্রতিজ্ঞা করানো হয় মোদীজির অক্লান্ত কর্মকাণ্ডের নিশান হাতে করেই তারা ২০৪৭-এ ভারতকে ‘পূর্ণাঙ্গ উন্নত রাষ্ট্র’ হিসাবে গড়ে তুলবে। জুলাই মাসের পর থেকে ‘জেন জি’-দের তো আর বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। তাই আপাতত গুরুজনদের কথা শোনা জেন-আলফাই ভরসা।
তবে ১৪ পাতার নাটকের স্ক্রিপ্ট জুড়ে এতরকম মোদী বন্দনার পরেও বোধহয় প্রধানমন্ত্রীজী ও তাঁর উপদেষ্টামণ্ডলী দর্শকের প্রতিক্রিয়া নিয়ে বোধহয় সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হতে পারেননি। তাই মঞ্চ থেকে নাটকের চরিত্ররাই দর্শকদের দিয়ে ‘মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়’ বা রামমন্দির উদ্বোধন প্রসঙ্গে ‘জয় শ্রীরাম’ জাতীয় স্লোগান বলিয়ে নিয়েছেন। এখন স্কুল-কলেজে সরকারি ব্যবস্থাপনায় এমনটা করা যায় কিনা, এসব প্রশ্ন অবান্তর। নমো সেবা-‌য় ব্রতী হতে হবে, এটাই নির্দেশ। তাই স্কটিশ চার্চ কলেজের ড্রামা ক্লাবের ছাত্র-ছাত্রীরা দিল্লির চাপানো মোদী-ভজনার নাটক করবে না চাইলেও, সরকারকে সন্তুষ্ট করতে অনেক কলেজ-কর্তৃপক্ষ আদাজল খেয়ে লেগে পড়েছেন। নাট্য প্রযোজনার আগেই প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে ৫১ প্রদীপ জ্বা‍‌লিয়ে, মোদীকে নিয়ে তথ্যচিত্রের প্রদর্শনী করে তাদের জো-হুজুরি প্রমাণ করেছেন। আসলে সাম্প্রদায়িক সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী একটি রাজনৈতিক শক্তি যখন ‘পার্সোনালিটি কান্ট’ বা ব্যক্তিপূজায় খুল্লমখুল্লা নেমে পড়ে, তখন ফ্যাসিবাদের সঙ্গে তাদের সাংগঠনিক বা কার্যকরী দূরত্ব প্রায় ঘুচে যায়।
এমনিতেই সঙ্ঘ-পারিবারিক হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি মতাদর্শগতভাবে শুরু থেকেই মুসোলিনির ফ্যাসিস্ত ইতালি ও হিটলারের নাৎসি জার্মানিকেই তাদের রোল মডেল বা ধ্রুবতারা করে এগিয়েছিল। এই দুটো দেশেই থিয়েটার ও সিনেমার মতো সাংস্কৃতিক পুঁজিকে সর্বশক্তিমান একনায়কের ভাবমূর্তি নির্মাণে সর্বতোভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। ১৯৩২-এ ডেনিম চলচ্চিত্র উৎসব শুরুই হয়েছিল ফ্যাসিবাদ তথা মুসোলিনীর জয়গান দিয়ে। নাৎসি ঘনিষ্ঠ প্রতিভাময়ী জার্মান তথ্যচিত্রকার লেনি রাইফেল স্ট্যাল ১৯৩৪-এ তৈরি করছেন ‘ট্রায়াম্ফ অব উইল’। সেখানে হিটলার যতবার পর্দায় আসছেন, ক্যামেরা-আলো-সম্পাদনার শিল্পীর প্রকৌশলে তাঁকে মনে হচ্ছে ঈশ্বরপ্রতিম-জার্মান জাতির ভাগ্যবিধাতা। মোদীজির হাতে কোনও লেনি রেইফেলস্ট্যান নেই। তাঁর অজৈবিক-অবতার এমন অক্ষম? নাট্য প্রচেষ্টায় আরও বেশি হাসির খোরাক হয়ে উঠছে কিনা সেটা অন্য প্রশ্ন। কিন্তু মোদীজিকে ভারত-ভাগ্যবিধাতা বানানোর জন্য বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবারের এই মরিয়া প্রয়াস যে আসলে দেশের আপাত গণতান্ত্রিক কাঠামোকে পুরোদস্তুর ব্যক্তি কান্ট কেন্দ্রিক ফ্যাসিস্ত-আধিপত্যবাদের খাঁচায় পুরে ফেলার প্রথম ধাপ, তাতে কোনও সন্দেহ  নেই।
 

Comments :0

Login to leave a comment