Fall of Sensex

শেয়ার বাজারে অস্থিরতা কিসের ইঙ্গিত

সম্পাদকীয় বিভাগ

অক্টোবরের শুরুতেই দেশের শেয়ার বাজারে বড়সড় ধস নেমেছে। গত বৃহস্পতিবার লেনদেনের মাঝে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেয়ার বাজারের সূচক ‘সেনসেক্স’ নেমে যায় এক হাজার পয়েন্টের বেশি, ‘নিফটি’ও ২২,৩০০-র নিচে নেমে যায়। বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে(বিএসই)’র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিএসই-তে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলির মোট বাজার মূলধন প্রায় ৯লক্ষ কোটি টাকা কমে গিয়েছে। এটি এখন প্রায় ৪৭৩লক্ষ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এদিকে, মার্কিন ডলারের তুলনায় ভারতীয় মুদ্রার উল্লেখযোগ্য পতন ঘটেছে এবং তা এখন ৯৬-এর নিচে নেমে গিয়েছে। ডলারের তুলনায় ভারতীয় ‘রুপি’র দর কমে ৯৬.৩৩-এ এসে দাঁড়িয়েছে, যা গত ২৮সেপ্টেম্বরের তুলনায় ৩৫পয়সা কম। 
দেশের সরকারের পক্ষ থেকে চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে জিডিপি বৃদ্ধির হার ৭.৮শতাংশ দাবি করা সত্ত্বেও তার প্রতিফলন শেয়ারবাজারে ঘটছে না কেন, স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্ন উঠছে। শেয়ার বাজারে পতনের একটা বড় কারণ বিদেশি লগ্নিকারীদের টাকা তুলে নেওয়ায়। গত ৩০সেপ্টেম্বর এক দিনেই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় শেয়ার বাজার থেকে প্রায় ১০হাজার ১৪৮কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছেন। সেপ্টেম্বরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট শেয়ার বিক্রির পরিমাণ পৌঁছেছে প্রায় ৪৬হাজার কোটি টাকায়। স্টক এক্সচেঞ্জ এনএসই-র তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবারের শেষ ট্রেডিং সেশনে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মোট ৩,৬৯৪কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে যে, এমাসে এখনও পর্যন্ত মোট শেয়ার প্রত্যাহারের পরিমাণ ২৫,৬৮২কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বিদেশিদের এই প্রবণতার পিছনে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি রয়েছে বলে মনে করছে শেয়ার বাজারের একাংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বন্ডের সুদ বাড়ায় তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদে লগ্নি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। ফলে ভারতের মতো উদীয়মান বাজার থেকে বিদেশি পুঁজি বেরিয়ে যাওয়ার চাপ ক্রমশ বাড়ছে। 
শেয়ার বাজারের এই টালমাটাল অবস্থার পিছনে কারণ হিসাবে বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার প্রতিফলন ঘটছে শেয়ার বাজারে। যদিও বাজার বিশেষজ্ঞরা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির তুলনায় পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান সংঘাত, অপরিশোধিত তেলের দামে তীব্র বৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রি এবং ডলারের তুলনায় টাকার দুর্বলতাকেই  দেশের শেয়ার বাজারে ক্রমাবনতির কারণ হিসাবে চিহ্নিত করতে চাইছেন। 
এটা ঠিকই যে পশ্চিম এশিয়ায় ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত প্রশমিত হওয়ার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাত হরমুজ প্রণালীকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। ভারত সহ বহু দেশের জন্য অপরিশোধিত তেলের এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস এই সমুদ্রপথটি এখন বন্ধ হয়ে রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এই পরিস্থিতিতে তেলের দাম ক্রমশ বাড়ছে। অপরিশোধিত তেলের দামে উল্লেখযোগ্য ২শতাংশ বৃদ্ধি ঘটেছে, যা ব্যারেল প্রতি ১০৭-১১০ডলারে পৌঁছেছে। বাজার বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে, কারণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার আশু কোনও সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ভারত তার প্রয়োজনীয় তেলের ৮৫শতাংশের বেশি আমদানি করে, ফলে এই মূল্যবৃদ্ধি দেশের মুদ্রাস্ফীতি ও টাকার মূল্যের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে। 
এসব কারণ দেখিয়েই বিশেষজ্ঞরা, ভারতের শেয়ার বাজারের বর্তমান অস্থিরতা বা পতনকে এককভাবে দেশের রাজনীতিতে সরকারের প্রতি অনাস্থার প্রতিফলন বলতে রাজি নন। আসলে ভারতের ৭.৮ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধির হারের দাবি বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশের বাস্তবতার প্রেক্ষিতে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি। কৃষির সংকট গভীরতর হওয়া এবং কৃষিক্ষেত্রে যেখানে বিকাশের হার মাত্র ৩.৬শতাংশ, মূ্ল্যবৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান অপুষ্টি, বেকারত্ব বিকাশের এই হারের দাবির সঙ্গে বেমানান। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে দেশজুড়ে মানুষের মধ্যে সংশয়ের ঝড় ক্রমশ উত্তাল হয়ে ওঠার ঘটনাও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি করার পরিস্থিতি তৈরি করেছে। অদূর ভবিষ্যতে শেয়ার বাজারে আরও বড় আকারের ধস নামার আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে।

Comments :0

Login to leave a comment