editorial

কার অপরাধে

সম্পাদকীয় বিভাগ

একদিকে নির্বাচন কমিশন অন্য দিকে বিচার ব্যবস্থা— এই দুইয়ের মাঝখানে পড়ে দেশের নাগরিকরা শুধু বিভ্রান্ত নন, রীতিমতো তাদের নাজেহাল অবস্থা। প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিককে (প্রাপ্ত বয়স্ক) ভোটাধিকার দি‍‌য়েছে সংবিধান। ভোট দেওয়া এবং ভোট দিয়ে লোকসভা ও বিধানসভা গঠন করা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার কেড়ে নেবার ক্ষমতা কোনও সংস্থাকে সংবিধান দেয়নি। ইদানীং লক্ষ্য করা যাচ্ছে নানা অছিলায় নির্বাচন কমিশন বিপুল সংখ্যক নাগরিকের ভোটাধিকার সাময়িকভাবে অথবা স্থায়ীভাবে কেড়ে নেবার আয়োজন করছে। একাজে বিচার ব্যবস্থার দিক থেকেও পরোক্ষ বা প্রচ্ছন্ন মদত মিলছে। প্রশ্ন হলো নির্বাচন কমিশন কোন সাংবিধানিক ক্ষমতার জোরে ১৩ কোটি ভারতীয়র নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে পারছে? তেমনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট অবস্থান না নিয়ে পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করার সুযোগ দিচ্ছে কেন?
নির্বাচন কমিশনের এসআইআর করার সাংবিধানিক ছাড়পত্র আছে কিনা সেই প্রশ্ন আপাতত মুলতবি রেখে এই প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে এমন যুদ্ধকালীন তৎপরতায় এসআইআর করতে হচ্ছে কেন? কেনই বা অতি সীমিত সময়ের মধ্যে অতি দ্রুততার সঙ্গে এসআইআর করে বিহারে এবং পশ্চিমবঙ্গ সহ কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচন করতে হয়েছে? ধীরে সুস্থে সময় নিয়ে নির্ভুলভাবে কি এসআইআর করা যেত না? কে কমিশনকে বাধ্য করেছে এসআইআর করে বিপুল সংখ্যক ভোটারের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে নির্বাচন করতে। এর সদুত্তর জানা জরুরি।
এসআইআর-র ধাক্কায় পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে লক্ষ লক্ষ মানুষরে নাম বাদ যাবার পর নিষ্পত্তি হবার আগেই ভোট করা মানে বৈধ ভোটারের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া। এই অধিকার কমিশনের আছে কিনা সেই প্রশ্ন সুপ্রিম কোর্টে ওঠার পর প্রধান বিচারপতির নির্লিপ্ত ভাষ্য একটা নির্বাচনে ভোট দেওয়া যাবে না। অর্থাৎ পরোক্ষে সর্বোচ্চ আদালত ভোটাধিকার কাড়ায় সায় দিচ্ছে।
প্রতি বছরই নির্দিষ্ট নিয়মে ভোটার তালিকা সংশোধন হয়। এবার সেভাবেই সংশোধন হতো এবং ভোটের পর এসআইআর করা যেত। এমন নির্দেশ মানুষ সর্বোচ্চ আদালতের কাছে আশা করেছিল। কিন্তু আদালত প্রত্যাশা পূরণ করেনি। পশ্চিমবঙ্গে আদালতের নির্দেশে বিচার বিভাগীয় আধিকারিক নিয়োগ করে যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি ক্ষেত্রে বিচারের ব্যবস্থা হয়। কেটে যায় দীর্ঘ সময়। এখন জানা যাচ্ছে বিচার বিভাগীয় আধিকারিক যাদের বৈধ বলে রায় দিয়েছেন তাদের একটা বড় অংশের নাম তালিকায় ওঠেনি। সেই অসম্পূর্ণ তালিকার ভিত্তিতে ভোট হয়ে গেল এবং বিজেপি ক্ষমতায় এসে গেল। এখন বাতিল ২৭ লক্ষের নাম তোলা এবং তালিকায় নাম থাকাদের নাম বাদ দেবার আবেদন বিচার করতে সুপ্রিম কোর্ট এসআইআর ট্রাইবুনাল গঠন করেছে। যে গতিতে কাজ চলছে তাতে আগামী ১৫ বছরেও সব আবেদন বিচার করা সম্ভব হবে না। এদিকে যে কটির বিচার হয়েছে তার ৯৩ শতাংশই ভোটাধিকার ফেরত পেয়েছে। এর থেকে পরিষ্কার এসআইআর আসলে অবৈধভাবে বৈধ ভোটারের নাম ছাঁটার গভীর ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। মাঝখান থেকে লক্ষ মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলেন না। এটা গণতন্ত্রের লজ্জা। ভোট দেবার সাংবিধানিক অধিকার হরণের এই অপরাধের দায় কে নেবে? সংবিধানের রক্ষককে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে না?

Comments :0

Login to leave a comment