মুক্তধারা
গল্প
ডেমোলিশন
দীপ মুখার্জি
৪ অক্টোবর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
ফুটপাথের ধার দিয়ে কোনোক্রমে গা বাঁচিয়ে যাওয়ার মতো এক ফালি সরু জায়গা আছে। গুমটি গুলো এমন ভাবে ফুটপাথ জুড়ে পসার সাজিয়ে বসে আছে যে যাওয়ার কোনো রকম রাস্তা প্রায় নেই বললে চলে। একটু এগিয়ে যেতেই একটা সুনির্মল বাবুর নাকে একটা পচা গন্ধ এলো। কোনো রকমে নাকে চাপা দিয়ে তিনি আস্তাকুঁড়ের ঢিবি টা পার করে মেইন রাস্তা তে এলেন। একটা মরা কুকুর এর ওপর শ'খানেক মাছি ভন ভন করছে।
সুনির্মল বাবু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালোবাসেন। তার ওপর আজকে বিশেষ দিন, আজ তিনি মিউনিসিপালিটি এর হেড ক্লার্ক পদ থেকে রিটায়ার করবেন, তাই একটা ধবধবে সাদা জামা পরেছেন । আজ দুপুরের খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করেছেন, পাঁঠার মাংস আর ভাত । বিকেল বেলা একটা ছোট্ট অনুষ্ঠান হবে। চেয়ারম্যান সাহেব থাকবেন বলেছেন। নোংরা কাদা থেকে পোশাকটাকে বাঁচিয়ে চলা দায় । যদিও আর পাঁচ মিনিট হাঁটলেই মিউনিসিপালিটি অফিস, অগত্যা একটা রিক্সা ডাকতেই হলো।
"১৫ টাকা লাগবে বাবু ।"
"১৫ টাকা কি রে ? ১০ টাকা তো? পাঁচ মিনিটের রাস্তা। "
"রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ বাবু। কালকের বিষ্টি তে জল জমে আছে। ১৫ টাকাই লাগবে।"
সুনির্মল বাবুর এদিকে দেরী হয়ে যাচ্ছে। কোনো উপায় না দেখে রাজি হতেই হলো। এদের কোনো ওয়ার্ক এথিক্স নেই। সব চিটিং বাজ। শুধু লোক ঠকানোর সুযোগ খোঁজে।
মিউনিসিপালিটি বিল্ডিং টা ৪ তলা । নতুন সরকার আসার পর বিল্ডিং টার সংস্কার হয়েছে দু'বছর হলো। অফিসের মধ্যে একটা নতুন এ সি লাগানো হয়েছে। আগে রীতিমতো গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা ছিল। এ সি আসার পর এখন এমনি অবস্থা যে একটা মাঙ্কি টুপি পরে থাকতে হয় ওনাকে। টুপি টা উনি অফিসেই রেখে আসেন। প্রয়োজন হলে পরেন । এই নিয়ে সুবীর খুব হাসাহাসি করে। সুবীর ওনার দশ বছরের জুনিয়র, উনি বেশি গায়ে মাখেন না । সুবীর এমনি তেই একটু হোমরাচোমরা। তার ওপর আবার ইউনিয়নের সেক্রেটারি । সুনির্মল বাবুর অকারণ ঝামেলা পছন্দ না। রিটায়ারমেন্টের পর পেনশনের হিসাব পত্র সব আবার ওর হাতের মধ্যে দিয়েই হবে।
দোতলা তে উঠতেই প্রথম ঘরটা হলো অফিস । সুনির্মল বাবু সিঁড়িতে হেঁটেই ওঠেন। লিফ্ট ব্যবহার করেন না। ডায়াবিটিস ধরার পর থেকে চা তে চিনিও খান না, হাঁটাহাঁটিও বাড়িয়ে দিয়েছেন। মিউনিসিপালিটি অফিসে রোজ কিছু না কিছু খাওয়া দাওয়া লেগেই থাকে, আজ এই কন্ট্রাক্টর মিষ্টির প্যাকেট দিয়ে গেলো তো কাল ওই কন্ট্রাক্টর । যদিও শুধুই মিষ্টির প্যাকেট না। সুনির্মল বাবু সবই জানতেন। সুবীরই সাধারণত প্যাকেট গুলো নিতো । সুনির্মল বাবু শুধু একটা মিষ্টি খেতেন, ডায়াবেটিস হওয়ার পর থেকে সেটাও ছেড়ে দিয়েছেন। সুবীর জোরাজুরি করে না। তবে সুনির্মল বাবু সুবীরের কথা মতো যখন যা কাজ করার তেমন করেন। ছেলেটা করিৎকর্মা আছে। তার ওপর চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে ওর আবার খুব খাতির। প্রায় পনের বছর ধরে ওকে দেখছেন, যে পার্টিরই চেয়ারম্যান হন না কেন , সবাই সুবীর কে খুব পছন্দ করে। সুবীর তিন খানা গাড়ি কিনেছে । তবে পুরোনো মোটর সাইকেল টা করেই অফিসে আসে। গাড়ি গুলোকে ভাড়া খাটায় ।
সুনির্মল বাবু প্রত্যেক দিন সকাল দশটার মধ্যে অফিস ঢোকেন। আজ ও তার কোনো অন্যথা হয় নি। সুবীর এখনো এসে পৌঁছয়নি । ও আসতে আসতে ১২ টা বাজবে। মাংস কেনার দায়িত্বটা ওকেই দিয়েছেন সুনির্মল বাবু। গতবছর অফিস পিকনিকের সমস্ত জোগাড়যন্তর ও ই করেছিল। মাংস টা খুব ই ভালো কোয়ালিটির ছিল। অফিসের পিকনিক গুলো সাধারণত স্পন্সর্ড হয়। তবে কে স্পনসর করে তাতে সুনির্মল বাবুর কোনো ইন্টারেস্ট নেই। সুবীর বলছিলো, " তোমার খাওয়ানো টা স্পনসর করে দেব নাকি? " সুনির্মল বাবু একেবারে জিভ কেটে বারণ করে দিয়েছেন।
সাড়ে এগারোটা নাগাদ সুবীর ঢুকলো। সুবীর ঢুকলে তবে তিনি ফাইল পত্তরে হাত দেন। সুবীর জানে, কোন কাজ টা আগে করতে হবে। কিসে চেয়ারম্যানের এপ্রুভাল আছে, আর কিসে নেই। সুবীর ঘেমে নেয়ে এসেছে। চেয়ার টা ঠেলে ধপ করে বসে পড়ল, তারপর এ সি টা কে ২২ ডিগ্ৰী তে করে দিল। সুনির্মল বাবু মাঙ্কি ক্যাপ টা পরে নিলেন।
"সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। দশ কেজি নিলাম, বুঝেছো। একটু বেশিই, তবে কারোর যাতে কম না হয়।"
" কোথা থেকে নিলি?"
"এইতো পুরোনো বাজারের মোহন মিট শপ। পুরোনো বাজারের কথায় মনে পড়লো। ওই ডিমোলিশনের নোটিশ টা সই করে রেখো তো। গোলাপি ফাইল টার মধ্যেই আছে। "
সুনির্মল বাবু ফাইল টা খুলে সই করে দিলেন । চেয়ারম্যান আর এক্সেকিউটিভ অফিসারের পারমিশন লাগবে। ওঁরা পারমিশন দিয়ে দিয়েছেন নিশ্চই ।সুবীর বলছে যখন।
তবুও সুনির্মল বাবুর কৌতূহল হল। ওই ডেমোলিশনের ওপর একটা স্টে অর্ডার ছিল না?
"তুমি তো কিছুই খবর রাখো না। ইন্ডিয়া মার্কেটের একটা মল খোলার কথা ছিল না? রফা হয়ে গেছে। স্টে অর্ডার উঠে যাবে। "
সুনির্মল বাবু শুনলেন, কার সাথে রফা হল , কে রফা করল তাতে সুনির্মল বাবুর কোনো ইন্টারেস্ট নেই।
অনুষ্ঠান ভালো মতো কাটলো। সবাই মাংসের খুব প্রশংসা করলো। চেয়ারম্যান সাহেব পিঠ চাপড়ে দিলেন। বিকেল বেলা হাতে ফেয়ারওয়েলের গিফট হাতে সেই পুরোনো বাজারের রাস্তা ধরেই সুনির্মল বাবু বাড়ি ফিরছেন। এই ঘিঞ্জি গুমটি, এই ময়লা আবর্জনা কিছুদিন বাদেই আর থাকবে না।
একটা গুমটির দিকে ওনার নজর পড়লো, তার ওপরে সাইন বোর্ডে লেখা আছে ,'মোহন মিট শপ । এখানে উৎকৃষ্ট মানের মাটন পাওয়া যায় । '
ঠিক তার সামনে যে আবর্জনার স্তুপ রয়েছে, সেখানে একটা পাঁঠার কাটা মুণ্ডুর ওপর ওনার চোখ পড়লো, যেন তার দিকেই তাকিয়ে আছে । গা টা কেমন গুলিয়ে উঠলো। উনি হাত দিয়ে মুখটা চাপা দিলেন। এখনো হাতে পাঁঠার মাংসের সুঘ্রাণ রয়েছে
Comments :0