ফ্যাসিবাদী হামলায় বামপন্থীদের প্রতিবাদকে দমানো যাবে না, বরং প্রতিবাদ আরও তীব্র হবে, দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়ে দিলেন সিপিআই(এম)’র রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। রবিবার মহিষবাথানে সিপিআই(এম)’র ডাকা একটি জনসভায় তিনি বলেছেন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে, সিপিআই(এম)’র পার্টি অফিস থেকে সভাস্থলে, এমনকি আইনজীবীদের ওপরেও হামলা চালিয়ে এবং তারপর মিথ্যা মামলা সাজিয়ে প্রতিবাদের কণ্ঠরোধ করে দেবে ভাবলে ভুল ভেবেছে বিজেপি। ১৫ বছরে তৃণমূল অনেক হামলা করে, ৮৫ হাজার মিথ্যা মামলা দিয়েও লাল ঝান্ডাকে শেষ করতে পারেনি। হিটলার পারেনি, ইতিহাসে মুছে গেছে, হিটলারের নাতিপুতিদেরও সেই হালই হবে।
এদিন সন্ধ্যায় মহিষবাথান তিন মাথার মোড়ে সিপিআই(এম)’র বিধাননগর এরিয়া কমিটি ২-এর ডাকে এই জনসভায় মহম্মদ সেলিম ছাড়াও ভাষণ দেন আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য ও সিপিআই(এম)’র উত্তর ২৪ পরগনা জেলা সম্পাদক পলাশ দাশ। সভাপতিত্ব করেন সোমেন চক্রবর্তী। বিজেপি যেভাবে সর্বত্র বামপন্থীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে তার উল্লেখ করে নেতৃবৃন্দ বলেছেন, বিজেপি’র বুলডোজারের সামনে প্রথম থেকেই লাল ঝান্ডা হাতে বামপন্থীরা প্রতিরোধে নেমেছে বলেই বামপন্থীদের ওপর হামলা করা হচ্ছে। এই কঠিন সময়ে আরও বেশি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে, সম্প্রীতি রক্ষা করে প্রতিরোধকে তীব্রতর করতে হবে।
মহম্মদ সেলিম বলেছেন, বিরাটিতে এসএফআই’র সভাস্থলে হামলা করার পরে পুলিশ দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে এসএফআই নেতা আকাশ করকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করেছে। গড়বেতায় আক্রান্ত গ্রামবাসীদের পাশে দাঁড়াতে যাওয়া আইনজীবীদের ওপরেও হামলার পরে পুলিশ তাদের এফআইআর দায়ের করতে চায়নি। বিজেপি যা করছে তাতে এরপরে তো বিচারপতিরাও নিরাপদ থাকবেন না, তাঁদের ওপরেও হামলা হবে! আরএসএস বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে সংঘর্ষ ঘটিয়ে অরাজকতা তৈরি করতে চাইছে। আমরা বামপন্থীরা দাবি করছি, পুলিশ আইনের শাসন ফিরিয়ে আনতে আইনের পথে চলুক। নইলে পুলিশও নিস্তার পাবে না। এই আক্রমণ শুধু সিপিআই(এম)’র ওপর নয়, সবার অধিকার আক্রান্ত হচ্ছে। ভোটের আগে বিজেপি’র প্রতীক ছিল ফুল, ভোটের পরে বিজেপি’র প্রতীক হয়ে গেছে বুলডোজার। কিন্তু লাল ঝান্ডা বুলডোজারের সামনে দাঁড়াতেও ভয় পায় না।
সেলিম বলেন, তৃণমূলের খুন ধর্ষণ দুর্নীতি লুটের শাসনে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে মুক্তি চেয়েছিল। কিন্তু এটা তৃণমূল সরকারের এক্সটেনশন এসেছে। আজকেও এসআরএফটিআই’তে আবার হামলা করেছে গেরুয়া ঝান্ডাধারীরা। যাদবপুর, এসআরএফটিআই সহ যেখানেই মুক্তচিন্তার চর্চা হয় সেখানেই আক্রমণ করছে। জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা, মুক্তচিন্তা ও প্রশ্ন করার অভ্যাসকে ভয় পায় বলেই এই আধিপত্যের রাজনীতি। তৃণমূল লাইব্রেরি পুড়িয়েছিল, বিজেপি বলছে শারদোৎসবে বামপন্থীদের বুক স্টল করতে দেবে না। স্বৈরশাসকরা, মৌলবাদীরা এই কণ্ঠস্বরেই কথা বলে। ইরানে আয়েতুল্লাহ খোমেইনি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়কে শয়তান তৈরির কারখানা বলেছিলেন, এখানেও ভক্তদের মাথায় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সেটাই ঢোকাতে চাইছে বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী তাঁদের দিমাগি নকশাল বলছেন, কারণ মননের চর্চাকেই তিনি ভয় পাচ্ছেন, কেবল বশ্যতা দেখতে চাইছেন।
সেলিম বলেন, বারো বছর মানে এক যুগ, মোদীর শাসনে একটা প্রজন্ম শিক্ষা কর্মসংস্থান নিয়ে কেবল হতাশ হয়েছে। ক্ষোভে তাঁরা পথে নেমেছেন দেশজুড়ে, বিশ্বগুরু সাজা প্রধানমন্ত্রীকে তাঁরা বিশ্বাস করছে না। ভোটে জেতার জন্য এখানকার অতিরিক্ত সিইও’কে দিয়ে আরএসএস বিজেপি লক্ষ লক্ষ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। এখন জ্ঞানেশ কুমারকে তাড়াতে নতুন প্রজন্মও রাস্তায় নেমেছে, দেশজুড়ে প্রতিবাদের চাপে নির্বাচন কমিশন নিজেই বাদ দেওয়া নাম ফেরানোর কথা বলতে বাধ্য হচ্ছে। নিজেদের অপকর্মের বমি নিজেদেরই চাটতে হচ্ছে। আমরা বামপন্থীরা এক বছর ধরে ভোটাধিকার ফেরানোর দাবিতে লড়াইতে আছি। ভোটাধিকার গণতন্ত্রের বুনিয়াদি অধিকার সেটা ফেরানোর লড়াই আরও তীব্র করা হবে।
সভায় বিকাশ ভট্টাচার্য বলেন, ভারতের সংবিধানের স্বাধীনতা ও সমতার নির্দেশকে অমান্য করে বিজেপি মানুষের অর্জিত অধিকারকেও কেড়ে নিচ্ছে। এরা গান্ধী হত্যাকারী নাথুরাম গডসেকে পুজো করে। বাংলার নবজাগণের ধারা, রামমোহন বিদ্যাসাগরের অবদানকে অস্বীকার করে। সেই জন্যই সরকারি স্কুল তুলে দিয়ে আরএসএস’র স্কুলে হনুমান চালিশা পড়াতে চাইছে। আদালতে পর্যন্ত সরকারি সংস্থাকে দিয়ে রিপোর্ট দায়ের করিয়েছে যে একটা বস্তির অস্তিত্ব নাকি সাম্প্রদায়িক বিপদ!
পাশেই সল্টলেকের সেক্টর ফাইভের দিকে আঙুল তুলে পলাশ দাশ বলেছেন, বামফ্রন্ট সরকারের প্রচেষ্টায় এখানে কর্মসংস্থান হয়েছিল। পনেরো বছরে সেক্টর ফাইভের অনেক অফিসের আলো নিভে গেছে। ক্রমশ অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে রাজ্য। মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে সরকার পরিবর্তন করেছে। কিন্তু বিজেপি যে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা পালনের বদলে অপশাসনে তৃণমূল সরকারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে, চার মাসেই বিগত সরকারকে ছাপিয়ে গেছে। কোয়েল মল্লিককে রাজ্যসভায় পাঠাচ্ছে বিজেপি। কেবল জার্সি বদল করানো হচ্ছে। দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল নেতাদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়ার বদলে কয়েকটা ডিম ছুঁড়ছে, অথবা পুনর্বাসন দিচ্ছে বিজেপি’তে। গো হত্যা বন্ধের নামে মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিষ ছড়াচ্ছে, আর বিজেপি নেতাদের ঘনিষ্ঠ কোম্পানিগুলি বিদেশে বিফ রপ্তানি করছে।
Md Salim Mahishbathan
ফ্যাসিবাদী হামলা করে বামপন্থীদের দমানো যাবে না, তীব্র হবে প্রতিবাদ, মহিষবাথানের সভায় মহম্মদ সেলিম
×
Comments :0