উৎপল সরকার
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ফ্যাসিবাদ-বিরোধী চেতনার আলোচনা সাধারণত আন্তর্জাতিক রাজনীতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্নভাবে করা হয়। অথচ ত্রিশের দশকের ভারতীয় রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক জগতে ফ্যাসিবাদের উত্থান নিয়ে যে তীক্ষ্ণ আলোচনা গড়ে উঠেছিল, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবারের সদস্য হওয়া তাঁর পরিচয়ের একটি দিক মাত্র; তাঁর প্রকৃত রাজনৈতিক পরিচয় নির্মিত হয়েছিল শ্রমিক আন্দোলন, কমিউনিস্ট রাজনীতি, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতা এবং আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদ-বিরোধী সংগ্রামের ভিতর দিয়ে। ১৯০১ সালে জন্ম নেওয়া সৌমেন্দ্রনাথ বিশের দশকে গান্ধীবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হলেও পরবর্তীকালে শ্রেণি-রাজনীতির দিকে অগ্রসর হন। তিনি Workers’ and Peasants’ Party-এর সঙ্গে যুক্ত হন, শ্রমিক সংগঠনে সক্রিয় ভূমিকা নেন এবং ১৯২৭ সালে সোভিয়েত রাশিয়া সফর করে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন।
সৌমেন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল— জাতীয় মুক্তিকে তিনি কখনও কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্ন হিসাবে দেখেননি। তাঁর কাছে সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ ও ফ্যাসিবাদ ছিল পরস্পর সম্পর্কযুক্ত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শক্তি। এই কারণেই ইউরোপে হিটলারের উত্থান তাঁর কাছে ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্ন থেকেও বিচ্ছিন্ন ছিল না। ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে (Michael Ortiz-এর ২০২৪ সালের প্রবন্ধ “Saumyendranath Tagore and the Nazi Seizure of Power”, Fascism জার্নাল) সৌমেন্দ্রনাথের রাজনৈতিক দৃষ্টিতে উপনিবেশ বিরোধিতা এবং নাৎসিবাদ বিরোধিতা পরস্পর সংযুক্ত ছিল; তাঁর যুক্তি ছিল, যে শক্তি ইউরোপে আধিপত্য ও জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তারা ভারতের মতো উপনিবেশের আত্মনিয়ন্ত্রণকেও স্বীকার করবে না।
১৯৩৩ সালে হিটলার জার্মানির ক্ষমতা দখল করার পর সৌমেন্দ্রনাথ সরাসরি নাৎসি সন্ত্রাসের মুখোমুখি হন। এপ্রিল মাসে তাঁকে গেস্টাপো গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ ছিল, তিনি হিটলারকে হত্যার ষড়যন্ত্রে যুক্ত। পরে মুক্তি পেয়ে তিনি প্যারিসে যান এবং সেখানকার ফ্যাসিবাদ-বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হন। সেই সময় ইউরোপে ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ঐক্য গড়ে তোলার যে প্রচেষ্টা চলছিল, সৌমেন্দ্রনাথ তার সক্রিয় অংশীদার ছিলেন।
১৯৩৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্যারিসে রাইখস্টাগ অগ্নিকাণ্ডের প্রসঙ্গে অনুষ্ঠিত এক ফ্যাসিবাদ-বিরোধী সভায় সৌমেন্দ্রনাথের বক্তৃতা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। সেখানে তিনি নাৎসি শাসনের সন্ত্রাসকে নিছক পুলিশি দমন হিসাবে দেখেননি। তাঁর বিশ্লেষণে অর্থনৈতিক সঙ্কটে বিপর্যস্ত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসাবেও ফ্যাসিবাদকে বোঝার চেষ্টা ছিল। তিনি দেখিয়েছিলেন, বেকারত্ব ও শ্রমজীবী মানুষের দারিদ্র দূর করতে ব্যর্থ হলে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র অর্থনৈতিক ব্যর্থতা আড়াল করতে ভয়, উসকানি ও কৃত্রিম শত্রু নির্মাণের আশ্রয় নেয়।
এই বিশ্লেষণের সঙ্গে যুক্ত ছিল তাঁর বর্ণবাদ-বিরোধী অবস্থান। ইহুদিদের বিরুদ্ধে নাৎসি প্রচারকে তিনি নিছক জাতিগত বিদ্বেষ হিসাবে দেখেননি; তাঁর বক্তব্য ছিল, শ্রমিক শ্রেণির প্রকৃত শ্রেণিসংগ্রামকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে এবং অর্থনৈতিক সঙ্কটের জন্য একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে দায়ী করতে এই বর্ণবাদী প্রচার ব্যবহৃত হচ্ছে। অর্থাৎ ফ্যাসিবাদ জনগণের বাস্তব অর্থনৈতিক ক্ষোভকে শ্রেণি-সচেতনতার দিকে না নিয়ে জাতিগত বিদ্বেষের দিকে পরিচালিত করে। এই যুক্তি সৌমেন্দ্রনাথের মার্কসবাদী ফ্যাসিবাদ-বিশ্লেষণের কেন্দ্রে অবস্থান করে।
এখানেই তাঁর রবীন্দ্রনাথকে লেখা চিঠির রাজনৈতিক তাৎপর্য। ১৯৩৩ সালের ১ নভেম্বর প্যারিস থেকে সৌমেন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে চিঠি লিখেছিলেন। ইউরোপের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের কিছু মন্তব্যকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সৌমেন্দ্রনাথ তা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অবস্থানের মূল বক্তব্য ছিল—ফ্যাসিবাদকে বিচার করার ক্ষেত্রে ইতালীয় ফ্যাসিবাদ এবং জার্মান নাৎসিবাদকে আলাদা নৈতিক মানদণ্ডে দেখা যায় না। তাঁর এই হস্তক্ষেপ ছিল পারিবারিক সম্পর্কের ঊর্ধ্বে রাজনৈতিক সত্যকে স্থান দেওয়ার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
তবে রবীন্দ্রনাথের ফ্যাসিবাদ-বিষয়ক অবস্থানকে সরলভাবে ‘ফ্যাসিবাদ-সমর্থক’ বলে চিহ্নিত করা ইতিহাসসম্মত নয়। ইতালিতে মুসোলিনির শাসন সম্পর্কে তাঁর প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু ইতিবাচক ধারণা পরবর্তীকালে পরিবর্তিত হয়। ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস সম্পর্কে প্রত্যক্ষ তথ্য পাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ মুসোলিনির শাসনের সমালোচনা করেন। ফলে সৌমেন্দ্রনাথের চিঠিকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসাবে নয়, তৎকালীন আন্তর্জাতিক বৌদ্ধিক বিতর্কের একটি দলিল হিসাবে দেখা অধিক যুক্তিসঙ্গত।
সৌমেন্দ্রনাথের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল তথ্য ও রাজনৈতিক প্রচারের প্রশ্নে তাঁর সতর্কতা। ১৯৩৪ সালে রেজিনাল্ড ব্রিজম্যানকে লেখা চিঠিতে তিনি ব্রিটিশ সেন্সরশিপের কারণে ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে ভারতীয়দের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য না পৌঁছানোর কথা উল্লেখ করেন। তিনি ফ্যাসিবাদী রাজনীতির বিকাশ সম্পর্কে বিস্তারিত উপাদান চেয়েছিলেন, যাতে ভারতীয় সংবাদপত্রে সেই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা যায়। একই চিঠিতে তিনি ভারতে ফ্যাসিবাদী সংগঠনের বিকাশের কথাও উল্লেখ করেন।
এই প্রসঙ্গে তাঁর বাংলা গ্রন্থ Fascism বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। গবেষণায় দেখা যায়, গ্রন্থটিতে তিনি ফ্যাসিবাদকে উগ্র জাতীয়তাবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ এবং পুঁজিবাদী সঙ্কটের সঙ্গে সম্পর্কিত করে বিশ্লেষণ করেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, সঙ্কটের সময় ক্ষুদ্র-মধ্যবিত্তের নিরাপত্তাহীনতা ও জাতীয়তাবাদী আবেগকে কাজে লাগিয়ে ফ্যাসিবাদী শক্তি বৃহত্তর পুঁজিবাদী স্বার্থ রক্ষা করতে পারে।
সৌমেন্দ্রনাথের এই রাজনৈতিক পাঠ আজও ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ—কারণ তিনি ফ্যাসিবাদকে কোনও এক ব্যক্তির স্বৈরাচার হিসাবে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর বিশ্লেষণে ফ্যাসিবাদ ছিল অর্থনৈতিক সঙ্কট, শ্রেণি-স্বার্থ, সাম্রাজ্যবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ, বর্ণবিদ্বেষ এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের সঙ্কোচনের একটি জটিল রাজনৈতিক সমন্বয়। একই সঙ্গে তিনি দেখিয়েছিলেন, ফ্যাসিবাদ-বিরোধিতা যদি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তবে তার সামাজিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
রবীন্দ্রনাথকে লেখা চিঠি এবং ইউরোপের ফ্যাসিবাদ-বিরোধী বক্তৃতাগুলিকে পাশাপাশি রাখলে সৌমেন্দ্রনাথের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বটি আরও স্পষ্ট হয়। তিনি ছিলেন এমন এক মার্কসবাদী, যিনি আন্তর্জাতিক ঘটনাকে ভারতীয় স্বাধীনতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছিলেন। তাঁর কাছে বার্লিনের শ্রমিকের ওপর নেমে আসা দমন এবং ভারতের ঔপনিবেশিক নিপীড়ন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; উভয়ের মধ্যেই ক্ষমতা, শ্রেণি ও আধিপত্যের প্রশ্ন কাজ করছিল।
তাই ইতিহাসের বিস্মৃত পৃষ্ঠা থেকে সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে পুনরুদ্ধার করা শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মীর স্মরণ নয়। এটি ভারতীয় বামপন্থী চিন্তার সেই আন্তর্জাতিকতাবাদী ধারাকে পুনরায় আলোচনায় আনা, যেখানে স্বাধীনতা মানে কেবল বিদেশি শাসনের অবসান নয়—শোষণ, সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদ ও ফ্যাসিবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে মানুষের মুক্তির বৃহত্তর সংগ্রাম। তাঁর জীবন ও লেখা সেই কারণেই আজও ইতিহাস, রাজনীতি ও সমাজচিন্তার গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হয়ে থাকতে পারে।
Comments :0