বাংলার বুকে শারদোৎসবের অন্যতম অপরিহার্য অঙ্গ শারদ বুক স্টল। ৭৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ধারা অব্যাহত। পূজা মণ্ডপ বা উৎসব অঙ্গনের আশপাশে এবং জনবহুল জায়গায় প্রতি বছর নিয়ম করে বুক স্টল তৈরি হয়। শারদোৎসবকে কেন্দ্র করে যেমন বঙ্গবাসী যেমন নতুন জামা-কাপড়, সাজ-সজ্জার উপকরণ, ঘরের বা সংসারের প্রয়োজনীয় নতুন জিনিসপত্র কেনেন তেমনি এই সময় নতুন বইপত্রও কেনেন মানুষ। এটাই বাংলা ও বাঙালির চিরন্তন ঐতিহ্য। হিন্দুত্ববাদী ধর্মান্ধরা রাজ্যে ক্ষমতায় এসে সেই ঐতিহ্যকে মুছে ফেলতে অতি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজে প্রকাশ্যে একাধিকবার বামপন্থীদের বুক স্টল করতে না দেবার কথা জোরালোভাবে ঘোষণা করেছেন। পূজা কমিটিগুলিকে বলেছেন বামেদের বুক স্টল করতে না দিতে। সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় জিগির তুলে এমনও বলেছেন কোথাও ‘শারদোৎসব’ লেখা যাবে না, লিখতে হবে ‘দুর্গা পূজা’। বামপন্থী ভাবধারার বই বিক্রিতেও তিনি ঘোরতর আপত্তি জানান।
কোনও আইন বা বিধিতে বামপন্থীদের বুক স্টল বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাই মুখ্যমন্ত্রী বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ও দুষ্কৃতীদের উস্কে দিয়েছেন যাতে তারা সর্বত্র হামলা চালিয়ে, ভয় দেখিয়ে, মারধর করে বামপন্থীদের স্টল বন্ধ করে দেয়। ইতিমধ্যে বহু জায়গায় তৈরি করা স্টল ভেঙে দিয়েছে। অনেক জায়গায় স্টল বানাতেই দেয়নি। আবার কোথাও বাধা দিয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো সব ক্ষেত্রেই পুলিশ হস্তক্ষেপ না করে নীরব দর্শক ছিল। উলটে আক্রান্ত বামকর্মীদের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়েছে।
ঘটনা হলো, শারদোৎসবের সময় শুধু সিপিআই(এম) বা বামপন্থীরাই বুক স্টল দেয় না। কংগ্রেস সহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলও বুক স্টল করে। এমনকি বিজেপি, আরএসএস সহ বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী ও ধর্মীয় সংগঠনও স্টল করে। অথচ মুখ্যমন্ত্রী একমাত্র সিপিআই(এম) তথা বামপন্থীদের স্টলের বিরুদ্ধেই উসকানি দিয়েছেন। পুলিশকেও একই কাজে পরোক্ষ নির্দেশ দিয়েছেন। এটা ঠিক আরএসএস’র মতাদর্শগত বিরুদ্ধ শক্তি বামপন্থা। আধুনিক যুক্তি ও বিজ্ঞানবিরোধী ধর্মান্ধ হিন্দুত্ববাদীরা বামপন্থাকে ভয় পায়। তারা জানে যুক্তি, তর্ক, জ্ঞানচর্চায় বামপন্থার সঙ্গে পেরে ওঠা যাবে না। তাই তারা মানুষকে যুক্তিবোধহীন অন্ধ বিশ্বাসের দিকে ঠেলে দিতে চায়। মিথ্যা আর বিকৃত ইতিহাসকে অন্ধ বিশ্বাস দিয়ে মান্যতা দিতে চায়। বামপন্থীরা জ্ঞানচর্চার সর্বক্ষেত্রে যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানকে আশ্রয় করে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে। তাই বামেদের সহ্য করতে পারে না হিন্দুসত্ববাদীরা। সেই ভীতি থেকেই ক্ষমতায় এসে শুভেন্দুরা প্রথমেই বাম ও প্রগতিশীল জ্ঞান চর্চার ধারাকেই ধ্বংস করতে চায়। কিন্তু চাইলেই তা সম্ভব হয় না। বামকর্মীরা, বামমনস্করা তা হতে দেবেন না। যত বাধাই আসুক বুক স্টল হয়েছে, হচ্ছে এবং হবেও। ভাঙলে নতুন করে গড়া হবে। এক জায়গায় না করতে দিলে অন্য জায়গায় হবে। কারও ক্ষমতা নেই আটকায়। যত বাধা দেবে ততই তাদের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী চরিত্র প্রকট হয়ে উঠবে। বাংলায় ফ্যাসিবাদের জায়গা নেই।
Book stalls
বুক স্টল হবেই
×
Comments :0