দেবাশিস মিথিয়া
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বিশ্বজুড়ে ‘৪এফ’— অর্থাৎ ফুড (খাদ্য), ফুয়েল (জ্বালানি), ফার্টিলাইজার (সার) ও ফাইনান্স (অর্থায়ন)-এর চরম সঙ্কট তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, খাদ্যশস্য সরবরাহে বিঘ্ন এবং সারের ব্যাপক ঘাটতির কারণে বিশ্ব খুব শীঘ্রই বড় ধরনের খাদ্য সঙ্কটের মুখে পড়তে যাচ্ছে, যার সর্বনাশা প্রভাব পড়বে মূলত ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর (উন্নয়নশীল ও অনুন্নত) দেশগুলোর ওপর। এই আসন্ন খাদ্য সঙ্কটের নেপথ্যে মূলত দুটি কারণকে তিনি চিহ্নিত করেছেন— এক, রাশিয়া-ইউক্রেন ও ইজরায়েল-ইরান যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা ও সামুদ্রিক পথ অবরোধ; দুই, নজিরবিহীন জলবায়ু বিপর্যয়ের ধাক্কা।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে পণ্য পরিবহণে অদ্ভুত এক জটিলতা তৈরি হয়েছে; অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়েই ইউক্রেন ও রাশিয়ার গম সহ অন্যান্য খাদ্যশস্য রপ্তানি হতো, যা এই মুহূর্তে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারে নজিরবিহীন অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি সার সরবরাহেও বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। রাশিয়া একাই বিশ্ব সার বাজারের প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে একদিকে আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, অন্যদিকে ইউক্রেনীয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তাদের তেল শোধনাগার ও শিল্প পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের জোগান আরও সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। আবার, ইজরায়েল-ইরান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালীতে নৌ-পরিবহণ বিঘ্নিত হচ্ছে। উল্লেখ্য, নাইট্রোজেন ভিত্তিক সারের মূল কাঁচামাল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে শুরু করে বৈশ্বিক সার বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই পরিচালিত হয় এই জলপথ দিয়ে। ফলে, এই সামুদ্রিক পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় সারের কাঁচামালের প্রচণ্ড অভাব দেখা দিয়েছে এবং সার পরিবহণের ব্যয় বেড়ে গেছে-যা আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দামকে আকাশছোঁয়া করে দিয়েছে। সারের এই অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষকের উৎপাদন খরচ যেমন বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে, তেমনি অর্থাভাবে জমিতে পর্যাপ্ত সার দিতে না পারায় ফসলের ফলনও মার খাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাবে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের দাম একলাফে বেড়ে গিয়ে বৈশ্বিক খাদ্যসঙ্কটকে আরও উসকে দিচ্ছে।
এই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও বড় আঘাত হানছে। সঙ্কটকালীন পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক মূলধন গ্লোবাল সাউথ (উন্নয়নশীল দেশগুলো) থেকে সরে গিয়ে উন্নত বিশ্বের নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এর পরিণতিতে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর দেশীয় মুদ্রার মারাত্মক অবমূল্যায়ন ঘটছে এবং লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিচ্ছে। একই সাথে, বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় তলানিতে ঠেকায় খাদ্য ও কৃষি-উপকরণ আমদানির ক্ষমতাও আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। এই সঙ্কট এখন আর শস্য ঘাটতির মধ্যেই আটকে থাকছে না, বরং তা সার্বিক অর্থনৈতিক অনটন ও অস্থিরতায় রূপ নিচ্ছে।
কৃষি ব্যবস্থার ওপর এই ভূ-রাজনৈতিক চাপের সাথে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু সঙ্কট। বিশ্বব্যাপী সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ‘সুপার এল নিনো’ নতুন এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব-এর গবেষণা অনুসারে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে ‘সুপার এল নিনো’-র প্রভাব যুক্ত হওয়ায় বিশ্বের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। যা সার্বিক বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধারা ও কৃষি মরশুমকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে দেওয়ার পাশাপাশি তীব্র খরা, মাটির উর্বরতা হ্রাস এবং নদীগুলোতে জলের প্রবাহ কমিয়ে দিয়েছে। এসব কারণেই এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে ফলন ব্যাপক হারে হ্রাস পাচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, তাপপ্রবাহ ও অনিয়মিত বর্ষার কারণে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ধান ও ভুট্টার উৎপাদন প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে; আবার লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে খাদ্যশস্যের ফলন ২০ শতাংশের বেশি হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ফাও), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল, ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)—রাষ্ট্রসঙ্ঘের এই পাঁচটি বিশেষ সংস্থার যৌথ প্রকাশনা ‘দি স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দি ওয়ার্ল্ড’ প্রতিবেদনের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাহীনতার এক আশঙ্কাজনক ছবি ফুটে ওঠে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে অপুষ্টির হার সামান্য কমেছে, কিন্তু সত্যটা অত্যন্ত নির্মম—আজও বিশ্বের প্রায় সাড়ে ৬৪ কোটি মানুষ (৭.৮%) প্রতিদিন পেট ভরে না খেয়ে চরম অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। তার চেয়েও ভয়াবহ তথ্য হলো, বিশ্বজুড়ে প্রায় ২১০ কোটি মানুষ অর্থাৎ প্রতি চারজনের মধ্যে একজন জানেন না তাঁর পরের বেলার খাবার কোথা থেকে আসবে বা আদৌ তিনি পুষ্টিকর কিছু খেতে পারবেন কিনা। বর্তমানে এক বেলার স্বাস্থ্যকর খাবারের গড় খরচ বেড়ে ৪.২৮ পিপিপি ডলারে পৌঁছানোয় বিশ্বের প্রায় ২৭০ কোটি মানুষ (এক-তৃতীয়াংশের বেশি জনগণ) কেবল অর্থাভাবে পুষ্টিকর খাদ্য কিনে খাওয়ার ক্ষমতা হারিয়েছেন। জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া ব্যয় আর লাগামহীন খাদ্য মূল্যস্ফীতি বিশ্ববাসীকে এমন এক সঙ্কটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে রাষ্ট্রসঙ্ঘের ২০৩০ সালের মধ্যে ‘ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব’ গড়ার লক্ষ্য স্রেফ অলীক কল্পনায় পরিণত হতে চলেছে। যুদ্ধ, সার ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি আর বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার কারণে ২০৩০ সালেও যদি ৫০ কোটির বেশি মানুষ অনাহারে থাকেন, তবে তা মানবসভ্যতার জন্য লজ্জার।
বর্তমান আন্তর্জাতিক খাদ্য সঙ্কটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলো। বিশ্বজুড়ে অনাহারী মানুষের মোট সংখ্যা এতদিন এশিয়াতেই সবচেয়ে বেশি ছিল (বিপুল জনসংখ্যার কারণে)। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতির চরম অবনতিতে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মোট অনাহারী মানুষের সংখ্যার দিক থেকে আফ্রিকা, এশিয়াকে টপকে গিয়েছে। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, আফ্রিকার মোট ৩০৯ মিলিয়ন মানুষ ক্ষুধার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে এশিয়ায় এই সংখ্যা ২৯২ মিলিয়ন এবং লাতিন আমেরিকায় তা ৩২ মিলিয়ন। এখন আফ্রিকার মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ অপুষ্টিতে ভুগছে এবং মহাদেশটির অর্ধেকেরও বেশি মানুষ (৫৬.৬ শতাংশ) মাঝারি থেকে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। স্থানীয় কৃষিব্যবস্থা ধ্বংস হওয়া, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তহবিল ঘাটতির কারণে ত্রাণ কমে যাওয়ায় সেখানে লাখ লাখ মানুষ প্রাণঘাতী ক্ষুধার মুখোমুখি। একই পরিণতি নেমে এসেছে গাজা ভূখণ্ডেও। সেখানে ধারাবাহিক সামরিক হামলা ও সর্বাত্মক অবরোধের কারণে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। এর ওপর বিশ্বজুড়ে সার ও জ্বালানি সঙ্কট যুক্ত হয়ে খাদ্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
বর্তমানে ভারত নিজেকে বিশ্বের দরবারে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র হিসাবে তুলে ধরছে। অথচ বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া ‘৪এফ সঙ্কট’ (খাদ্য, জ্বালানি, সার ও অর্থায়ন) দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে অভ্যন্তরীণ বাজারে জোগানের ঘাটতি ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি—যা দেশকে এক জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ‘এল নিনো’র প্রভাবে ২০২৬-২৭ অর্থ বছরে যেখানে ভারতের খাদ্যশস্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৩৭৬.৫৬ মিলিয়ন টন ধরা হয়েছিল তা ইতিমধ্যেই কমিয়ে ৩৭৩.৯৩ মিলিয়ন টন করা হয়েছে। উৎপাদনের এই ঘাটতির মুখে দাঁড়িয়েও জ্বালানি সুরক্ষার অজুহাতে ইথানল মিশ্রণ নীতি বাস্তবায়নে সরকারের অতি-সক্রিয়তা দেশের খাদ্য সুরক্ষাকেই সরাসরি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সরকারের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল পেট্রোলিয়ামের আমদানি কমাতে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ লিটার পেট্রলে ২০ লিটার ইথানল মেশানো বা ‘ই ২০’ লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো। কিন্তু সরকার হঠাৎ করেই ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে এটি বাধ্যতামূলক করে দেয়। এই নীতির ফলে দেশে হয়তো কিছুটা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়েছে, অপরিশোধিত তেল প্রতিস্থাপিত হয়েছে এবং কার্বন নির্গমনও কিছুটা কমেছে; কিন্তু এর মাশুল হিসাবে দেশের সাধারণ মানুষকে আজ খাদ্য ও পুষ্টি সুরক্ষার সাথে আপস করতে হচ্ছে। কারণ, প্রাথমিক পর্যায়ে এই কর্মসূচি আখের রস ও উদ্বৃত্ত চিনির ওপর ভিত্তি করে শুরু হলেও দ্রুত তা শস্যভিত্তিক ইথানলের দিকে মোড় নেয়। ফলে আজ দেশের খাদ্য ও পশুখাদ্যের বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। পরিসংখ্যানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে— ইথানল উৎপাদনে ভুট্টার ব্যবহার যেখানে প্রায় শূন্য শতাংশ ছিল, তা এক লাফে বেড়ে ৩৭ শতাংশে পৌঁছানোয় দেশীয় বাজারে ভুট্টার দর প্রতি কেজি ১২-১৫ টাকা থেকে বেড়ে ২৫-৩২ টাকায় ঠেকেছে। পোল্ট্রি ফিডের প্রধান কাঁচামাল ভুট্টা হওয়ায় প্রতি ডিমের উৎপাদন খরচ বিপুল পরিমাণে বেড়েছে। খুচরা বাজারে ডিমের দাম প্রতি পিস ৮-১০ টাকা ছুঁয়েছে, যা সাধারণ মানুষের প্রোটিন ও পুষ্টি বাজেটে বড় আঘাত। একসময় ভুট্টায় স্বনির্ভর ভারত এখন নিজস্ব ঘাটতি মেটাতে চড়া শুল্ক দিয়ে বিদেশ থেকে তা আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছে। ইথানল নীতিতো তেল আমদানিতে হয়তো দেশের কিছুটা খরচ বেঁচেছে; কিন্তু খাদ্যশস্যের গতিপথ বদলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি উসকে দেওয়ায় সরকারের এই তথাকথিত অর্থনৈতিক সাফল্যের নিট হিসাব আজ বড়সড় প্রশ্নের মুখে।
খাদ্য ও জ্বালানির এই দ্বিমুখী সঙ্কটের আগুনে ঘি ঢেলেছে আন্তর্জাতিক বাজারে রাসায়নিক সারের লাগামহীন দাম। এর ধাক্কায় দেশের সার ভরতুকির খরচ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে যায়— যা সরকারের সার্বিক বাজেট ব্যবস্থাপনায় এক নজিরবিহীন আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। এই বিপুল আর্থিক চাপ সামলাতে সরকার ‘পিএম-প্রণাম’ প্রকল্পের মাধ্যমে সারের ব্যবহার কমিয়ে ভরতুকি সাশ্রয়ের চেষ্টা করছে এবং ‘ন্যাশনাল মিশন অন ন্যাচারাল ফার্মিং’-এর অধীনে বিকল্প কৃষির পরিধি বাড়াচ্ছে। একে কাজে লাগিয়ে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে প্রায় ১৫ লাখ টন রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে কেন্দ্র ৩,১৫৭ কোটি টাকা সাশ্রয় করলেও, খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা এবং টেকসই কৃষি পরিকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারের অগ্রাধিকার ঠিক কোথায়— তা নিয়ে নীতিগত অস্পষ্টতা থেকেই যাচ্ছে। একটি উদাহরণেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে ওঠে—রবি মরশুমের শুরুতে দেশে সারের মজুত প্রায় ১৬৩ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছানো এবং খাদ্য নিগমের গুদামে পর্যাপ্ত শস্য জমা থাকা সত্ত্বেও, সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে পুষ্টিকর খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় কাঠামোগত গলদ ফুটে উঠছে।
গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেশের এই প্রশাসনিক ও নীতিগত ব্যর্থতাকেই সামনে নিয়ে আসে। এই সূচকে ১২৫টি দেশের মধ্যে ভারতের ১১১তম স্থান অর্জন প্রমাণ করে যে দেশের অপুষ্টির মাত্রা অত্যন্ত ‘গুরুতর’। পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক, তার প্রমাণ মেলে শিশুদের অপুষ্টির তথ্যে—ভারতে ১৮.৭ শতাংশ শিশু কৃশতার শিকার, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ; ৩৫.৫ শতাংশ শিশু স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি থেকে বঞ্চিত এবং প্রায় ২২ কোটি ৪৩ লাখ মানুষ দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টিতে ভুগছেন। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী যেখানে ইতিমধ্যেই পুষ্টিহীনতার প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে, সেখানে জ্বালানি সুরক্ষার তাগিদে ইথানল নীতিতে শস্যের গতিপথ পরিবর্তন বাজার মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে। ফলে নিত্যপণ্য ও প্রোটিনজাত খাবারের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের পুষ্টিকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য সরাসরি হ্রাস পাচ্ছে—যা বিদ্যমান পুষ্টি সঙ্কটকে আরও ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশ্ব খাদ্য ব্যবস্থা আজ এক জটিল ও বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। কৃষ্ণসাগর থেকে হরমুজ প্রণালী পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া সামরিক উত্তেজনা এবং ‘সুপার এল নিনো’-র মতো জলবায়ু বিপর্যয়ের ধাক্কায় বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা আজ হুমকির মুখে। আফ্রিকার কোটি কোটি মানুষের অনাহার ও সুদানের সাম্প্রতিক মানবিক সঙ্কট যে বিষয়টি প্রকট করে তোলে তা হলো— বিশ্বজুড়ে খাদ্য কাঠামোর জরুরি পুনর্গঠন এখনই প্রয়োজন। অর্থনৈতিক বৃদ্ধি বা জ্বালানি সুরক্ষার তাগিদে ভারতের সাধারণ মানুষের মৌলিক খাদ্যের অধিকারকে কোনোভাবেই কেড়ে নেওয়া যায় না। কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, সার ব্যবহারে ভারসাম্য, খাদ্যবান্ধব নীতি এবং কূটনৈতিক দূরদর্শিতার সমন্বয়ই পারে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জলবায়ুর দাপট সামলে দেশের প্রতিটি নাগরিকের পুষ্টির অধিকার রক্ষা করতে।
Food Crisis
দরজায় কড়া নাড়ছে খাদ্য সঙ্কট
×
Comments :0