Potters of Bangladesh

আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন বাংলাদেশের মৃৎশিল্পীদের

আন্তর্জাতিক

মীর আফরোজ জামান: ঢাকা 
দুর্গোৎসব আসন্ন। বাংলাদেশের পুজোমণ্ডপগুলোতে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। বাঁশের কাঠামো তৈরি, খড় দিয়ে অবয়ব গড়া, কোথাও চলছে মাটির প্রলেপ ও প্রতিমায় রং-তুলির কাজ। দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, কার্তিক এবং মহিষাসুরের প্রতিমা তৈরিতে দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। উৎসবের আলোয় যখন চারপাশ ঝলমল করে, তখন তাদের হাতের তুলিতেই পূর্ণতা পায় দুর্গা। কিন্তু সেই শিল্পীদের নিজেদের জীবনেই যেন অন্ধকার কাটে না। পুজো এলেই বাড়ে কদর ও ব্যস্ততা, অথচ সারা বছর অভাব-অনটন আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করেই কাটে তাদের দিন।
প্রতিমা তৈরির মাটি, খড়, বাঁশ, রং ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়ও। কিন্তু সেই তুলনায় বাড়েনি প্রতিমা শিল্পীদের পারিশ্রমিক। ফলে উৎসবের মৌসুমে কাজের চাপ বাড়লেও আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা।
শুধু প্রতিমা শিল্পী নন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে নির্মাণসংশ্লিষ্ট কারিগর ও শ্রমজীবী মানুষের অবস্থাও প্রায় একই। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একই বাস্তবতা—যাদের শ্রমে উৎসবের সৌন্দর্য তৈরি হয়, তাদের জীবনেই নেই স্বস্তির নিশ্চয়তা।
রাজবাড়ীর সজজন কান্দার দুর্গা মন্দিরের দায়িত্বে আছেন ধীরেশ চক্রবর্তী ‘দোদো’। তিনি বলেন ‘‘ কাজের চাপে কখনও একবেলা, কখনো দুইবেলা খেয়ে কাজ করতে হয়। প্রতিমাশিল্পের সঙ্গে পারিবারিক ঐতিহ্য জড়িয়ে থাকায় এই পেশা। এটাকে টিকিয়ে রাখার তাগিদেই প্রতিকূলতার মধ্যেও কাজ করে যেতে হচ্ছে। প্রতিবছর আমরা সরকারি অনুদান পাই ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। এই টাকা দিয়ে কি প্রতিমা নির্মাণ করা সম্ভব? প্যান্ডেল তৈরি করা সম্ভব? আরও তো আনুষঙ্গিক খরচও আছে! তার উপর জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়েছে!’’ 
মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতির চিত্রে এখনও উৎসবের প্রাণ আছে। প্রতিমা তৈরি হচ্ছে, মণ্ডপ সাজানো হচ্ছে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মহড়া চলছে, পুজোর সামগ্রী কেনাকাটা হচ্ছে। ঢাকেশ্বরী মন্দিরসহ বিভিন্ন মন্দিরে প্রস্তুতির ব্যস্ততা তারই প্রমাণ। সরকারও বারবার বলছে, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তা গোপন না করে তদন্ত করা হবে। উল্লেখ্য, প্রতিবছর সরকারিভাবে জাতীয় পুজো উদযাপন পরিষদকে ২ কোটি টাকা অনুদান দেওয়া হয়। এবছর ৫ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন তারেক রহমান সরকার। চট্টগ্রামেই এবার ২ হাজার ৪৮৫টির বেশি মণ্ডপের প্রস্তুতি চলছে। কুমিল্লার লাকসামসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিমা তৈরির কাজও চলছে পুরোদমে। 
ঢাকের বাদ্য, মৃৎশিল্পীর ব্যস্ততা, প্রতিমায় রঙের শেষ আঁচড় আর মণ্ডপ সাজানোর তোড়জোড় চলছে বাংলাদেশে। দুর্গোৎসবকে ঘিরে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে। এবছর বাংলাদেশের ৩৩ হাজার ৮৫১টি পুজোমণ্ডপে পুজো অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় পুজো উদযাপন পরিষদ। গত বছরের তুলনায় মণ্ডপের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার বেড়েছে। একই সঙ্গে পুজোকে কেন্দ্র করে তিন দিনের সরকারি ছুটি এবং সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে মোট পাঁচ দিনের অবকাশও থাকছে।
বাংলদেশের মৃৎশিল্পীদের বক্তব্য, ‘‘একসময় দুর্গাপুজোর মৌসুম তাদের জন্য ছিল বাড়তি আয়ের অন্যতম সুযোগ। এখন সেই জায়গায় এসেছে টিকে থাকার লড়াই। পূর্বপুরুষের পেশা ধরে রাখা এবং প্রতিমাশিল্পের ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার তাগিদেই অনেকে কম লাভে কাজ করতে হয়। একটি প্রতিমার জন্য যদি এক লক্ষ টাকা হয়, তারমধ্যে প্রায় ৯০ হাজার টাকাই খবর হয় প্রতিমা তৈরিতে। এরপর রয়েছে যাতায়াত সহ আনুষঙ্গিক খরচ। একটি প্রতিমা তৈরি করে লাভ পরিমাণ খুবই সামান্য।’’

Comments :0

Login to leave a comment