সংবিধানের উর্ধ্বে কেউ নয়। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন তো নয়ই এমনকি সংবিধানের ‘রক্ষক’ সুপ্রিম কোর্টও নয়। স্বশাসিত সাংবিধানিক সংস্থা বলে নির্বাচন কমিশনের যেমন খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার নেই তেমনি সংবিধানের নির্দেশকে অবজ্ঞা ও অমান্য করারও অধিকার নেই। যদি তেমন কিছু ঘটে থাকে তাহলে সর্বোচ্চ আদালতকে সক্রিয় হতে হয় এবং হস্তক্ষেপ করতে হয়।
এসআইআর-কে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যা চলছে তা শুধু অভূতপূর্ব নয় ভারতের সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে উদ্বেগেরও। কারণ আইনি রক্ষাকবচ সহ সাংবিধানিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে শাসক দলের ক্ষমতার রাজনীতির স্বার্থে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার একতরফা যে সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং নিয়েছেন সেটা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকেই উপড়ে ফেলতে চাইছে। বিষয়টা নিয়ে দেশের সমগ্র বিরোধী রাজনৈতিক দল, গণতান্ত্রিক নাগরিক সমাজ, সংবিধান রাজনীতি ও আইন বিশেষজ্ঞরা, বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রতিনিধিস্থানীয় বিশেষজ্ঞরা প্রবল উদ্বেগের মধ্যে থাকলেও তার তেমন কোনও প্রতিফলন সর্বোচ্চ আদালতে লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
মানুষ যখন বুঝতে পারছেন নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে মানুষের গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক অধিকারের মূল ধরেই টান দেওয়া হয়েছে তখন তারা দেশজুড়ে বিক্ষোভে নেমে পড়েছেন। রাজধানীতে গত কয়েক দিন ধরে ধারাবাহিক বিক্ষোভ, প্রতিবাদ, মিছিল, সমাবেশ চলছে। পরিচিত রাজনীতির পরিসরের বাইরে থেকে বিপুল জনসমাগম বাড়ছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ছাত্র-যুব সমাজ যারা সাধারণভাবে এমন প্রতিবাদ-বিক্ষোভে অভ্যস্ত নয় তারাও দলে দলে যোগ দিচ্ছেন। প্রতিবাদের বহর যত বাড়ছে রাষ্ট্রীয় হিংস্রতা ও বর্বরতাও তত বাড়ছে। মোদী সরকার বিক্ষোভ ঠেকাতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আরএসএস-বিজেপি’র শীর্ষ নেতারা অনুভব করছেন সরকার বিরোধী ও শাসকবিরোধী প্রতিবাদের ঝড় যেভাবে গতি বাড়াচ্ছে তাতে ক্ষমতায় টিকে থাকা কঠিন। যত পরাজয়, ক্ষমতা হারানোর ভয় তাদের গ্রাস করছে ততই তারা শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে নির্মম পীড়ন নামিয়ে আনছে।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, চলমান এই বিক্ষোভ-প্রতিবাদ প্রধানত এসআইআর বন্ধ করা এবং জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের বিরুদ্ধে। অথচ আন্দোলন দমনে মরিয়া মোদী সরকার। অর্থাৎ জ্ঞানেশকে রক্ষাই মোদী সরকারের লক্ষ্য। জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে উত্থাপিত ভয়ানক অভিযোগ মোদী সরকার মানতে নারাজ। সরকার জ্ঞানেশের একতরফা স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত সংবিধানের নির্দেশ অমান্য করে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়াকে অন্যায় বা অবৈধ মনে করে না। অর্থাৎ জ্ঞানেশকে রক্ষার দায়িত্ব মোদী সরকার নিজের হাতে তুলে নিয়েছে। জ্ঞানেশ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসাবে যেভাবে যে কাজগুলি করছে তাতে পূর্ণ সমর্থন আছে সরকার ও শাসক দলের। বস্তুত বিজেপি’র রাজনৈতিক স্বার্থে এ কাজগুলি করার জন্যই জ্ঞানেশকে মোদীরা ওই পদে বসিয়েছেন। তেমনি ওই পদে বসে অবৈধ, বেআইনি ও অসাংবিধানিক কাজ করে যাতে তার বিরুদ্ধে কোনোরকম আইনি পদক্ষেপ না নেওয়া যায় তার জন্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন সংশোধন করে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ জ্ঞানেশ অপরাধ করার নির্দেশ এবং আইনের উর্ধ্বে থাকার সুযোগ পেয়েছেন শাসকের কাছ থেকে। এখন সর্বোচ্চ আদালতকেই সংবিধান ও গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হবে। না হলে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক মানুষই রাস্তায় নেমে সেই দায়িত্ব পালন করবেন।
Editorial
গণতন্ত্রের স্তম্ভের ঘাটতি পূরণ করবেন জনগণ
×
Comments :0