বিধানসভা ভোটের পর গো-রক্ষার নামে হামলাকারীদের দাপটে কোচবিহার জেলার ১২ ব্লকের অন্তত ১৭টি হাটে গরু কেনাবেচা পুরোপুরি বন্ধ। একই অবস্থা পাশের আলিপুরদুয়ার জেলার গরুরহাটের। যার ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়েছে। উৎসবের মরসুমে বিপাকে পড়েছেন গো-পালকেরা। সমস্যার মুখে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সেই সব মহিলারা। যারা গরু কিনে আয়ের পথ খুঁজেছিলেন।
আলিপুরদুয়ার জেলার জটেশ্বর উত্তরবঙ্গের মধ্যে গরু কেনাবেচার জন্য সব চাইতে বড় হাট ছিল। ফি সপ্তাহে শনিবার সেই হাটে ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার গরু বেচাকেনা হত। ভোটের ফলপ্রকাশের পর সেসব বন্ধ হয়ে গেছে। একই অবস্থা শিশারগোড় হাটের। জেলার আরও দুই বড় গরুর হাট ছিল বারোভিসা ও শামুকতলা। সেখানেও এখন আর গরুর হাটে ভীড় নেই ক্রেতা-বিক্রেতাদের।
তুফানগঞ্জ-২ ব্লকের শালমারা গ্রামের অধীর বর্মন বললেন, ‘‘ভোটের ফল প্রকাশের পর গরু বিক্রির হাট বন্ধ। সাধারণত ঈদের আগে এবং দুর্গাপুজোর আগে গরু বিক্রি করতাম। গত ঈদে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কেউ গরু কিনলো না। এবারে পুজোর মুখে বাড়ির ৪ টে বলদ বিক্রি করে ভেবেছিলাম অর্ধেক টাকায় ঋণ শোধ করবো বাকি টাকায় পরিবারের জন্য নতুন পোশাক কিনবো। এখন সে আশা ছেড়ে দিয়েছি।’’
একই অবস্থা শীতলখুচি আর দিনহাটা ও সিতাইয়েরও। এই সব এলাকায় হাটে গরু বিক্রি তো বন্ধ বটেই বাড়ি থেকেও কেউ গরু কিনতে আসছে না।
উল্লেখ্য জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে শীতলখুচির মন্টু মিয়া ক্রেতার বাড়িতে গরু পৌছে দিতে গিয়ে রাতের অন্ধকারে গো রক্ষক নামে হামলাকারীদের’ খুন হন। এরপর গত ২০ সেপ্টেম্বর দিনহাটার ইন্দ্রনারায়ন গ্রামের মীর আলম কবীর ‘গো রক্ষককারীদের’ হাতে খুন হন। দুই ঘটনার পর দিনহাটা, সিতাই, শীতলখুচি এলাকায় গরু বেচাকেনা পুরোপুরি বন্ধ।
এদিকে পুজোর মরসুমে জেলার হাটে হাটে গরু কেনাবেচা বন্ধ থাকায় কাপড়ের দোকানে বিক্রি কমেছে এক লাফে অনেকটাই। সাধারণ ব্যবসায়ীরা চাইছেন সরকার হস্তক্ষেপ করুক। গবাদি পশু বিক্রি শুরু হোক আগের মত।
নিয়ন্ত্রিত বাজার সমিতির আয়ও এক লাফে অনেকটাই কমেছে। সূত্রের খবর বক্সীরহাটের গরুর হাট থেকে ফি সপ্তাহে নিয়ন্ত্রিত বাজার সমিতি লক্ষাধিক টাকা আয় করতো। ঈদ ও পুজোর আগে সেই আদায় দ্বিগুন হত। গোসাইহাটের একাধিক বস্ত্র ব্যবসায়ীর বক্তব্য, ঈদের সময় গরু বিক্রি না হলেও ব্যবসা ঠিকঠাকই ছিল। কারণ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ তো গবাদি পশুর ক্রেতা। কিন্তু এবারে পুজোর আগে ছবিটা উলটো। আর গ্রামীণ এলাকার অর্থনীতিতে ফসলের পরেই গবাদিপশুর কেনাবেচা বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে।
শীতলখুচি ব্লকের গোসাইরহাট গরু বেচাকেনার বড় হাট। সপ্তাহের হাটের দিন এখানে দুশো-আড়াইশো গরু বিক্রি হত। এখন হাট বারে দু চারটে গরু এলেও ক্রেতারা আসে না। ফলে গরুর হাট শুনশান পড়ে থাকে।
উল্লেখ্য নিয়ন্ত্রিত বাজার সমিতির নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রায় সব হাটেই গরু কেনাবেচা চলে আসছিল দশকের পর দশক ধরে। ২০২৬শে বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর প্রশাসনের নির্দেশে বৈধ অনুমোদন বা প্রয়োজনীয় নথি বিহীন হাট গুলিতে গরু বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ। মাথাভাঙা -১ ব্লকের শিকারপুরের প্রেমচাঁদের হাট এবং নয়ারহাটে গরু কেনা বেচার বড় হাট হিসেবে পরিচিত। কৃষকসভার নেতা প্রসেনজিত সরকার মঙ্গলবার বলেন, ফি সপ্তাহে নয়ারহাটে ২৫০-৩০০ এবং প্রেমচাঁদের হাটে ১০০-১৫০ গরু বিক্রি হত। এখন ভয়ে দুই হাটে গরু বিক্রি করতে কেউ আসতেই চায় না। আর দু চারটে গরু বিক্রির জন্য এলেও ক্রেতার দেখা মেলে না। মূলত নিরাপত্তার কারণেই কেউ গরু কিনতে চাইছে না। গোপালকদের সংকট ক্রমশ বাড়ছে জেলাজুড়ে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার গবাদি পশু সংক্রান্ত যে নির্দেশিকা জারি করেছে, তা কেবল মুসলিম জনগোষ্ঠীকেই বিপর্যস্ত করেনি, বরং দলিত ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষ—যাদের জীবিকা গবাদি পশুর কেনাবেচা, মাংস সরবরাহ ব্যবস্থা, দুধ সংগ্রহ ও দুগ্ধজাত পণ্যের ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল তারাও আজ চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে। রাজ্যের যেসব গ্রামীণ গবাদি পশুর হাট একসময় গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করত, সেগুলো আজ নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে। কেনাবেচা পুরোপুরি থমকে যাওয়ায় লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন এবং অসংখ্য পরিবার এমন এক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে, যা শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
Cattle Trading
হাটে গরু কেনাবেচা বন্ধের প্রভাব কোচবিহার জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে
×
Comments :0