প্রবীর দাস: বাদুড়িয়া
প্রায় ৮০ লক্ষ টাকা এবং বিপুল সরকারি ত্রাণ সামগ্রী উদ্ধার আগেই হয়েছে। এরপর চেয়ারম্যানকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার পর পূঁড়ার বিলের পাটক্ষেত থেকে উদ্ধার হলো বস্তা বস্তা টাকা। ২০লিটার জল ধরে এমনই একটি সিল করা প্লাস্টিকের বালতি এবং দলীয় কার্যালয় থেকে আরও বেশ কিছু সরকারি ত্রাণ সামগ্রী। যেগুলি আমফান, ইয়াস ঝড়ে বিধ্বস্ত বন্যা দুর্গতদের পাওয়ার কথা ছিল সেই সমস্ত ত্রাণ সামগ্রী যেমন ত্রিপল, শাড়ি লুঙ্গি বাচ্চাদের জামাকাপড়, কম্বল, মশারি, কোদালের বাট ইত্যাদি উদ্ধার করা হলো তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ের তিনতলা থেকে।
৬ দিনের পুলিশি হেফাজতে বাদুড়িয়া পৌরসভার চেয়ারম্যান দীপঙ্কর ভট্টাচার্য। এগুতে থাকে তদন্তের গতি প্রকৃতি। বুধবার সকালে চেয়ারম্যান দীপঙ্কর ভট্টাচার্যকে সাথে নিয়ে তদন্তকারী আধিকারিকরা বাদুড়িয়া পৌরসভার ১২নং ওয়ার্ডের পূঁড়া গ্রামে পৌঁছালে চেয়ারম্যানকে লক্ষ্য করে চোর চোর স্লোগানে মুখরিত হয় আকাশ বাতাস। পুলিশি তদন্তের পাশাপাশি ইডি সিবিআই তদন্তের দাবিতে সোচ্চার হয় পূঁড়া গ্রামের হাজার হাজার বাসিন্দা। পূঁড়া গ্রামের বাসিন্দা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের বাড়ির অনতিদূরে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ের তিনতলার ঘরে ঢুকে দেখা যায় বিপুল সরকারি ত্রাণ সামগ্রী এবং মদের বোতল। চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার হওয়ার পর মঙ্গলবার রাতে গ্রেপ্তার হয় তারই ঘনিষ্ঠ দলীয় কর্মী বাটুলডাঙ্গার বাসিন্দা শামীম গাজি। বুধবার ধৃত শামীম গাজিকে বসিরহাট মহকুমা আদালতে তোলা হলে আদালত ধৃত শামীম গাজিকে ৫ দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠায়। স্থানীয় সিপিআই(এম) কর্মী সমর্থক সহ গ্রামবাসীরা বারবার দাবি করে এসেছে শুধু শামীম গাজি নয়। চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকা সিভিক ভলান্টিয়ার সিরাজ আহমেদ ও দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের ব্যক্তিগত গাড়ির চালক ফিরোজ গাজি সহ আরও অনেকেই আছে যাদেরকে তদন্তের আওতায় এনে গ্রেপ্তার করলে কোটি কোটি টাকা উদ্ধার করা যেতে পারে। যা কিনা লজ্জায় ফেলতে পারে রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি ও তার বান্ধবীর ফ্লাট থেকে উদ্ধার হওয়া কোটি কোটি টাকা ও সোনার গহনা উদ্ধারের ঘটনাকে। এখন পর্যন্ত যেটুকু উদ্ধার হয়েছে তা হিমশৈলের চূড়া মাত্র। যদিও এই আবহে পুলিশি অসহযোগিতার অভিযোগও উঠে আসতে শুরু করেছে।
প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা সহ বাদুড়িয়া পৌরসভার যাবতীয় উন্নয়নের কোটি কোটি টাকা চেয়ারম্যান এবং কাউন্সিলররা মিলে লুট করেছে। ঘর দেবে বলে কারোর কাছ থেকে ৪০ হাজার কারোর কাছ থেকে ৫০ হাজার কারোর কাছ থেকে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। টাকা দিয়েও তারা ঘর পায় নি। বরং সেই ঘর অন্যকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে পাকা একতলা দোতলা বাড়ির মালিকদের। এদিন ঘড়িতে সময় তখন সকাল ১০টা। পুলিশের কাছে খবর আসে পূঁড়া বিলের পাটক্ষেতের মধ্যে মাটি খুঁড়ে কিছু লুকিয়ে রাখা হয়েছে। আলগা মাটি চাপা দেওয়া দেখে সন্দেহ হয় মাঠে ঘাস কাটতে যাওয়া এক সিপিআই(এম) কর্মীর। খবর পেয়ে পুলিশ কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের সাথে নিয়ে ঘিরে ফেলে পাটক্ষেতটি। প্রসঙ্গত পাটক্ষেতটি গ্রেপ্তার হওয়া দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের সাগরেদ পি এ শামীম গাজিদের। আলগা মাটি সরাতেই ফের চক্ষু চড়কগাছ পুলিশের। মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছে বেশ কয়েকটি বস্তা ও ট্রলি ব্যাগ উদ্ধার করে বাদুড়িয়া থানার পুলিশ। প্রতিটি বস্তাতে প্রচুর পরিমাণে টাকা গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার করে পুলিশ। পাঁচটি বস্তা ও ট্রলিবন্দি ওই সমস্ত টাকা মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করে বাদুড়িয়া থানায় নিয়ে এসেছে পুলিশ। স্থানীয় গ্রামবাসী, কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের উপস্থিতিতে ও ব্যাঙ্কের কর্মীদের নিয়ে শুরু হয় দ্বিতীয় দফায় টাকা গোনা। রাত ৭টা তখন চলছে টাকা গোনার কাজ। সিল করা বালতি থেকে শেষমেশ কী উদ্ধার হলো জানতে ওসি বাদুড়িয়াকে বার বার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এই ঘটনার পর ওই পাট ক্ষেতের মধ্যে আর কোন বস্তা রয়েছে কিনা তা দেখতে বসিরহাট জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পাট বাগানে ড্রোন উড়িয়ে দেখা হয়।
২০১১ সালের পর থেকে বাদুড়িয়ার ঐতিহ্য ভূলুন্ঠিত।বাদুড়িয়ার হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতে হবে। এই দাবি ইতোমধ্যে তুলেছে সিপিআই(এম)। মঙ্গলবার রাতে পার্টির বাদুড়িয়া -১,২,৩ এরিয়া কমিটির পক্ষ থেকে ক্ষিতীশ মন্ডল, সুব্রত বিশ্বাস, অনিমেষ মুখার্জি,তাপস দাস,রাজু ছেত্রী সহ কয়েক জন নেতৃত্ব বাদুড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিকের সহিত দেখা করে পূর্নাঙ্গ তদন্তের দাবি করেন। অভিযোগ তোলেন, বাদুড়িয়া পৌরসভায় তৃণমূলের বোর্ড চলাকালীন কার্যত কোন টেন্ডার হয় না। নিয়ম রক্ষার জন্য কেবল মাত্র একটি কাজের জন্য তিনটি ফর্ম পূরণ হয় অনলাইনে। বাইরের কোনো ঠিকাদারকে আসতে দেওয়া হয় না। কার্যত পৌরসভার কাউন্সিলররা বেনামে ঠিকাদারী করে। এক দু শতাংশ লেস মেরে কাজ করে। এমপ্লয়মেন্ট জেনারেশন স্কীমের কাজ হয় না বললেই চলে। দলীয় তৃণমূল কর্মীদের ডেলি ওয়েজ এবং ক্যাজুয়াল কর্মী হিসেবে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ করা হয়েছে। যাদের মধ্যে অনেকেই পৌরসভায় আসে না। এদের বেতন এমপ্লয়মেন্ট জেনারেশন ও বিভিন্ন খাত ভেঙে দেওয়া হয়। অনেক কাজ না করেই বিল উঠে যায়। আবাসন প্রকল্প (হাউস ফর অল) স্কীমে ৮ হাজার বাড়ি নির্মাণ হয়েছে। অনেক বাড়ি নির্মাণ না করে টাকা উঠে গেছে। এছাড়াও উপভোক্তার বাড়ি তিন লাখ আটষট্টি হাজার টাকায় নিজের করার কথা কিন্তু উপভোক্তার কাছ থেকে চেক বইয়ে স্বাক্ষর করে নিয়ে, চেয়ারম্যান নিজে অথবা কাউন্সিলর বা চেয়ারম্যানের মনোনীত ব্যক্তির নিম্ন মানের কাজ করে এক একটি বাড়ি থেকে লক্ষাধিক টাকা আত্মসাৎ করেছে। বেআইনী নিয়োগ থেকে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। এছাড়াও বাদুড়িয়া পৌরসভাকে তৃণমূলের জমিদারী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মেদিয়ায় ইছামতি নদীর ঘাট জেলা পরিষদের অকশান করার কথা। চেয়ারম্যান নিজে লোক বসিয়ে কয়েক বছর ইজারা না নিয়ে অর্থ আদায় করে আত্মসাৎ করেছেন। ১২ নং ওয়ার্ডে কলোনিতে পূঁড়া রোডের পাশে একটি জলাশয় ভরাট করে নিজের অফিস তৈরি করেছেন। যেখান থেকে শাসন এবং শোষন দুইই চালানো হতো। পূঁড়া কলোনি সহ শায়েস্তানগর গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত কাদার বিল সহ একাধিক জায়গায় নামে বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি করেছেন চেয়ারম্যান। আর এ সব কুকর্ম করার মদতদাতা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকা বাদুড়িয়ার বিধায়ক বুরহানুল মুকাদ্দিন ওরফে লিটন। তার মদতে বাদুড়িয়া পৌরসভা অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য। তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ তাদের কথা বলার অধিকারটুকু হারিয়েছে।
বুধবার পূঁড়া গ্রামে গেলে সংবাদমাধ্যমের কাছে হাজারো অভিযোগে সোচ্চার হলেন গ্রামের শোষিত বঞ্চিত নীপিড়িত মানুষ। তাদের অভিযোগ, ২০১৫ সাল থেকে আমরা কেউ ভোট দিতে পারি নি। প্রতিবাদ করলে কপালে জুটতো বেধড়ক মার। ভোটের দিন হাতে খোলা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বাইকবাহিনী দাপিয়ে বেড়াতো। বুথ দখল ছাপ্পা ভোট কখনো পূঁড়া দেখে নি। যা কিনা এই দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের সৌজন্যে সাক্ষী থেকেছে পূঁড়া।
Comments :0