মীর আফরোজ জামান: ঢাকা
অনুকূল কূটনৈতিক পরিবেশের অভাব, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্য ঘিরে ঢাকা-নয়াদিল্লির টানাপড়েনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যদিও ২০ থেকে ২৫ আগস্টের মধ্যে সফরের সম্ভাব্য সময় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে, এখনও চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারিত হয়নি।
বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রক স্পষ্ট করেছে, প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি হওয়া প্রয়োজন। এই পরিবেশ তৈরির অংশ হিসেবে ঢাকা ভারতের কাছে শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক আসামিকে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় দ্রুত ফেরত দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে শরীফ ওসমান হাদী খুনের মামলার অভিযুক্তদের বাংলাদেশে হস্তান্তরের দাবিও তোলা হয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, দিল্লি সফরের প্রস্তুতি চললেও হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি এখন সম্ভাব্য সফরের অন্যতম বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্যও ঢাকার অসন্তোষ বাড়িয়েছে। ঢাকা মনে করছে, এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আগে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আবহ স্বাভাবিক করা জরুরি।
অন্যদিকে নয়াদিল্লির পক্ষ থেকেও সফরটি নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী আগেই বলেছিলেন, নয়াদিল্লি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে অপেক্ষায় রয়েছে। একই সঙ্গে আগস্টের সম্ভাব্য সফরের তারিখ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
এ অবস্থায় সফরটি বাতিল হয়েছে—এমন কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো হয়নি। বরং পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে সফরের রাজনৈতিক পরিবেশ ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনার অগ্রগতিই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে। ভারতীয় ও বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে সম্ভাব্য সফরের সময়সীমা ২০–২৫ আগস্ট বলা হলেও চূড়ান্ত দিনক্ষণ এখনও ঘোষণা করা হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়; এটি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। দীর্ঘদিনের অস্বস্তি কাটিয়ে দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক কোন পথে যাবে, সেটি নির্ভর করছে কয়েকটি স্পর্শকাতর ইস্যুতে সমঝোতা ও রাজনৈতিক আস্থার ওপর।
বিশেষ করে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এখন দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি। বাংলাদেশ এই বিষয়ে অগ্রগতি চাইলেও ভারত জানিয়েছে, প্রত্যর্পণ অনুরোধ তারা তাদের আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী পর্যালোচনা করছে। ফলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেও বিষয়টির সমাধান দ্রুত হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরের সঙ্গে ব্রিকস সম্মেলনে তাঁর অংশগ্রহণের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ভারত প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকসের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, তবে বাংলাদেশ তখনও অংশগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
ফলে আগামী কয়েক দিনে ঢাকা-নয়াদিল্লির কূটনৈতিক যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সফরের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হওয়ার আগে হাসিনার প্রত্যর্পণ, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার প্রশ্নে কোনো অগ্রগতি হয় কি না—তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম দিল্লি সফরের ভবিষ্যৎ।
সফর তাই এখনও বাতিল নয়, তবে অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রশ্নে ঢাকা-দিল্লির টানাপড়েনই সফরটি চূড়ান্ত হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Comments :0