Post Editorial

আকাদেমির গৈরিকীকরণ এক নাটকীয় শুরুয়াৎ

সম্পাদকীয় বিভাগ

চন্দন সেন

এই লেখাটির যন্ত্রণা যেদিন মস্তিষ্ক পীড়ন করছে সেদিন ঘটনাক্রমে বাইশে শ্রাবণ, রবীন্দ্র-প্রয়াণ দিবস।  একদিকে শেকলভাঙা বর্ষার অবিরাম ধারাপাত, অন্যদিকে বিশ্বকবির বন্দনায় কবি শুভপ্রসাদ: – 
‘‘…তোমার আকাশ দাও, কবি, দাও
দীর্ঘ আশি বছরের
আমাদের ক্ষীয়মাণ মানসে ছড়াও
সূর্যোদয় সূর্যাস্তের আশি বছরের আলো,
বহুধা কীর্তিতে শত শিল্পকর্মে উন্মুক্ত উধাও
তোমার কীর্তিতে আর তোমাতে যা দিকে দিকে
একাগ্র মহৎ,
সে কঠিন ব্রতের গৌরবে,
আমাদের বিকারের গড্ডল ধুলার দিনরাত অন্যায়ে কুৎসিতে
শুনি যেন সুন্দরের গান
দেখি যেন একনিষ্ঠ দীর্ঘায়ুর প্রগতির এক ছবি…’’
না প্রগতির এক ছবির দেখা মিলছে না। আজকের আকাদেমি,—  ৮০ বছর ধরে বেঁচে থাকা কলকাতার অন্যতম অহংকার অ্যাকাডেমি  অব ফাইন আর্টস (প্রতিষ্ঠা - ১৯৩৩), যার ঠিকানা দুই নম্বর ক্যাথিড্রাল রোড, প্রাচীনতম চারুকলা সমিতিগুলোর মধ্যে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। গত শতকের ৫০-এর দশকে লেডি রাণু মুখার্জির আন্তরিক চেষ্টায় আর পশ্চিমবঙ্গের সেই সময়ের মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর পৃষ্ঠপোষণায় অ্যাকাডেমি  অব ফাইন আর্টস কলকাতার জাদুঘর থেকে স্বতন্ত্র হয়ে ক্যাথিড্রাল রোডের এই বড় বিশিষ্ট জায়গায় স্থানান্তরিত হয়েছিল। তারপর থেকে কলকাতার অন্যতম অহঙ্কার এই বেসরকারি বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। এখানে সংরক্ষিত আছে ‘বেঙ্গল স্কুল’ -এর বিভিন্ন চিত্রকর্ম আর বস্ত্রশিল্পের মূল্যবান সংগ্রহের বিচিত্র মিশ্রণ। প্রধানত লেডি রানু মুখার্জি এগুলো দান করে গেছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। অন্যদিকে আকাদেমির একটি বিশাল ঘর আলো করে এখনো আছে অনন্য সব চিত্রকলা,— যার মধ্যে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সাত ভাই চম্পা’, যামিনী রায়ের ‘শিব ও গণেশ’ সহ বেশ কিছু শৈল্পিক বিস্ময়। বাংলার বস্ত্রশিল্পের আশ্চর্য মুনশিয়ানা নিয়ে রয়েছে, বালুচরি, জামদানি পোশাক, প্রাচ্যের চমৎকার কিছু গালিচা ইত্যাদি অনেক অবিস্মরণীয় সম্পদ। এখানে এখনো অনুসন্ধিৎসুরা রবীন্দ্রনাথের ‘ভানুসিংহের পদাবলী’ -এর পাণ্ডুলিপি দেখতে পান। সহজেই খুঁজে পান রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথের শিল্পকর্ম, এছাড়াও সুনয়নী দেবী, অতুল বসু, নন্দলাল বসু, রামকিঙ্কর বেইজ আর বিনোদবিহারী মুখার্জির দুর্লভ শিল্পকর্ম। এই আকাদেমিতেই অসংরক্ষিত চিত্রশালায় নতুন যুগের শিল্পী, বিশেষ করে অপেশাদার শিল্পীদের প্রদর্শনীর ব্যবস্থা আছে। যারা শহরের আরও জাঁকজমকপূর্ণ আরও আন্তর্জাতিক গ্যালারিগুলোতে সুযোগ পাননা তাদের কথা ভেবেই আকাদেমিতে প্রশস্ত গ্যালারিগুলোতে নিয়মিত প্রদর্শনীর ববস্থা আছে। 
আকাদেমি বা অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস এখন মূলত কলকাতার সবচেয়ে জনপ্রিয় নাট্যকেন্দ্র। যেখানে শিশির ভাদুড়ি, শম্ভুমিত্র, তৃপ্তি মিত্র, উৎপল দত্ত, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোজ মিত্র, শাওলী মিত্র প্রমুখ প্রয়াত থিয়েটারি টাইটানদের স্মরণীয় অভিনয়ের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। আকাদেমির নাট্যকেন্দ্রে এমন অজস্র নাটকের অভিনয় হয়ে গেছে যা বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে বিশেষ উল্লেখযোগ্য বিবেচিত হয়। অভিজ্ঞ প্রবীণ থেকে তরুণ প্রজন্ম আকাদেমির মঞ্চকে ঘিরে নতুন নতুন নাট্যসৃজনের স্বপ্ন দেখে এখনো। একইভাবে যারা ছবি আঁকে তাঁরাও স্বপ্ন দেখেন আকাদেমির শিল্প প্রদর্শনীর কক্ষে তাদের স্বপ্ন ও শ্রমের কাজগুলোর প্রদর্শনী হবে। সরকার অধিগৃহীত রবীন্দ্রসদন বা শিশির মঞ্চ বা নন্দন চলচ্চিত্র কেন্দ্রের মতই, এদের গায়ে গা লাগানো বেসরকারি আকাদেমি বা অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস কলকাতার বা পশ্চিমবাংলার কিংবা ভারতের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অনুরাগী মানুষদের গত কয়েক দশক ধরেই সাগ্রহ উপস্থিতির সাক্ষ্য বহন করেছে। বিদেশ থেকে যে বিশিষ্ট সংস্কৃতিজনেরা আসেন তাঁরাও অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের প্রদর্শনী ঘর, থিয়েটার কেন্দ্র ও সভাঘরের বাইরে বিস্তীর্ণ পরিসরের নান্দনিক সৌন্দর্য ও বিশিষ্টজনদের উপস্থিতির গৌরবদীপ্ত চলমান ট্র্যাডিশনের সাক্ষী থাকতে চান। 
এ রাজ্যের স্বাধীনতা-উত্তরকালে যে যে রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় এসেছে যেমন,  কংগ্রেস, যুক্তফ্রন্ট, বামফ্রন্ট, তৃণমূল, ২০২৫ পর্যন্ত এই দলগুলোর মধ্যে কেউই আকাদেমি বা অ্যাকাডেমিকে তাদের দলবৃত্তের রঙে রাঙাবার সাহস বা কদর্য ইচ্ছা দেখাননি। ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় বা জ্যোতি বসু কিংবা অজয় মুখার্জি বা তাদের অধীনস্ত সরকার আকাদেমি বা অ্যাকাডেমির গায়ে দলীয় রং করাতে চাননি। সদ্য বিদায়ী তৃণমূল সরকার বারবার চলচ্চিত্র উৎসবে নন্দন বা অন্যান্য সরকারি প্রেক্ষাগৃহের রং না বদলালেও, স্মরণীয় শিল্পী বা সংস্কৃতিজনেদের প্রাপ্য সম্মান দেননি। প্রয়াত স্মরণীয় শিল্পীদের ছবিও কম দেখা যেত— যতটা দেখা যেত সমস্ত প্রেক্ষাগৃহ জুড়ে মুখ্যমন্ত্রীর বিশাল বিশাল ছবি ও কাট-আউট। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর বাঙালি হিসাবে লজ্জিত হতে হয়েছে এসব ঘটনায়। রবীন্দ্রোত্তর যুগে অন্যতম সেরা কবি শঙ্খ ঘোষ ছাড়া গত ১৫ বছরে প্রায় সব কবি, সাহিত্যিক, বিশিষ্ট শিল্পী, গায়ক-গায়িকাদের একটা বড় অংশ চাটুকার হয়ে প্রচুর পদ-পদবি-অর্থের পারিতোষিক গ্রহণ করে গেছেন বিগত প্রায় দেড় দশক ধরে। ২০২৬ -এ নতুন সরকার আসার পর যারা ভেবেছিলেন শিল্প-সংস্কৃতিক্ষেত্রে এই জোর-জুলুম আর তোষামুদি আবহের বদল হবে তাদের প্রত্যাশাকে মিথ্যে করে দিয়ে নতুন সরকারের শাসকদলের নামে, বিগত সরকারের শাসকদলের পোষা গুন্ডা বা দুর্নীতিবাজরা খেলা শুরু করে দিয়েছে। তারা আনুগত্য বদলেছে, জার্সি বদলেছে সাহস বরং আরও তীব্র হয়েছে। যে বেসরকারি আকাদেমি বা অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস আত্মপ্রচার সর্বস্ব প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীও তাঁর দলের প্রকাশ্য অপকর্মের বাইরে রেখেছিলেন, নতুন সরকার আসার পর সেই আকাদেমি এই প্রথম শাসক দলের রঙে হঠাৎ রঙিন হয়ে উঠল। শাসক দলের ইচ্ছায় সরকারি বাসের রং গেরুয়া হচ্ছে, সরকারের শাসন ভবনের রং গেরুয়া হচ্ছে, কিন্তু কেউ ভাবতেই পারেনি প্রাক্তন শাসকদলের কিছু চতুর ব্যক্তির মদতে কিংবা তাদের রাতারাতি বদলে যাওয়া আনুগত্যের কৌশলে ৮০ বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ আকাদেমি বা অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের প্রবেশদ্বারে গেরুয়া রং জ্বলজ্বল করবে, বুঝিয়ে দেওয়া হবে নিও-ফ্যাসিবাদ প্রথমেই শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির জায়গাগুলো মানে মানুষের মনে চেতনা ও বোধের সুস্থতা আনার জায়গাগুলোকে আক্রমণ করতে চায়। তাই যে জায়গাগুলোতে কোনোদিন শাসকের রং ছিল না সেখানে উগ্রভাবে রং দিতে হবে। প্রত্যক্ষ রাজনীতি যারা করেন তাদের তুলনায় দলীয় পতাকা বা পোস্টার হাতে বার হন না এমন লোকের সংখ্যা বেশি। যারা সুস্থ রাজনীতি করেন আর যারা প্রত্যক্ষ রাজনীতি করেন না, উভয় পক্ষের একটা বিশেষ মিল আছে, - গান, কবিতা, থিয়েটার বা ভাস্কর্যের জায়গায় কোনও দলীয় রং তারা কেউ দেখতে চান না।
কলকাতার বেশ কিছু বিশিষ্ট মানুষ আকাদেমির প্রবেশ পথটির আকস্মিক গৈরিকীকরণের বিরুদ্ধে একটি আবেদনপত্র জমা দিয়ে এসেছিলেন মাত্র ক’দিন আগে শাসক দলের পক্ষ থেকে আলোচনার আমন্ত্রণ পেয়ে। তাদের বলা হয়েছিল, ঘটনাটি অন্যায়,— আগের শাসকদলের গুন্ডারাই ছদ্মবেশে এইসব করেছে। ১৫ দিনের মধ্যেই এর প্রতিবিধান করা হবে। ১৫ দিনের মধ্যে কিছুই হলো না। গেরুয়া রং এখনো উজ্জ্বলভাবে বিরাজমান— হয়তো আগের শাসকদলের যে গুন্ডাদের কথা বলা হয়েছিল তারা ইতিমধ্যেই তাদের একমাত্র প্রভুকে ত্যাগ করে, জামা-কাপড়, পতাকা বদলে ‘ভালো লোক’ হয়ে গেছে। সুস্থ সংস্কৃতির পক্ষে দাঁড়িয়ে এবং নতুন সরকারের দলীয় নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের এই ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী আবহে ডাক উঠছে প্রবল গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের (ইতিমধ্যে আক্রান্ত নাট্যকর্মীদের শরীর বা চেহারা মিডিয়ায় প্রকাশিত)। ১১ আগস্ট মঙ্গলবার অপরাহ্নে নাটক ও সংস্কৃতি জগতের বিশিষ্টজনেরা ডাক দিয়েছেন সংস্কৃতিক্ষেত্রে গুন্ডামি ও গৈরিকীকরণের প্রতিবাদে সম্মিলিত হতে। আশা করা যায় প্রতিবাদ সোচ্চার থেকে সোচ্চারতর হবে। 
Highlights
কিছু বিশিষ্ট মানুষ আকাদেমির প্রবেশ পথটির আকস্মিক গৈরিকীকরণের বিরুদ্ধে একটি আবেদনপত্র জমা দিয়েছিলেন। তাদের বলা হয়েছিল, ঘটনাটি অন্যায়, - আগের শাসকদলের গুন্ডারাই ছদ্মবেশে এইসব করেছে। ১৫ দিনের মধ্যেই এর প্রতিবিধান করা হবে। কিছুই হলো না। গেরুয়া রং এখনো উজ্জ্বলভাবে বিরাজমান। হয়তো আগের শাসকদলের যে গুন্ডাদের কথা বলা হয়েছিল তারা ইতিমধ্যেই তাদের প্রভুকে ত্যাগ করে, জামা-কাপড়, পতাকা বদলে ‘ভালো লোক’ হয়ে গেছে।

Comments :0

Login to leave a comment