SC on 'Vande Mataram'

বাধ্যতামূলক হতে পারে না বন্দে মাতরম

সম্পাদকীয় বিভাগ

মোদীর নেতৃত্বে সংখ্যালঘু বিদ্বেষী হিন্দুত্ববাদী আরএসএস-বিজেপি সরকার প্রথমে ‘বন্দে মাতরম’-কে ‘জাতীয় গান’ হিসাবে ঘোষণা করে। পাশাপাশি সমস্ত সরকারি অনুষ্ঠানে ছ’টি স্তবকই গাওয়ার এবং জাতীয় সঙ্গীত ‘জনগণমন’-র আগে গাওয়ার নির্দেশিকা জারি করে। পরবর্তীকালে জাতীয় সম্মানের অবমাননা প্রতিরোধ আইন সংশোধনী ২০২৬ তৈরি করে। তাতে বলা হয় ‘বন্দে মাতরম’ (পুরো গান)-এর অবমাননা বা গানে বাধা সৃষ্টি করা ফৌজদারি অপরাধ। তার জন্য তিন বছর জেল, জরিমানা অথবা দু’টোই হতে পারে। অর্থাৎ হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি আপাদমস্তক হিন্দুত্ববাদী সরকার কেবল মাত্র হিন্দু দেবদেবীদের বন্দনা সংবলিত গানকে শুধু জাতীয় গান হিসাবে ঘোষণা করেনি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্য ধর্মাবলম্বীদেরও হিন্দু দেবদেবীর বন্দনা করা বাধ্যতামূলক করেছে। এমনকি আইন সংশোধন করে যারা জাতীয় গান গাইবে না বা গাইলেও শেষ চার স্তবক গাইবে না তাদের বিরুদ্ধে সরকার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন রাজ্যে ডাবল ইঞ্জিনের সরকারগুলি স্কুল ও মাদ্রাসায় বন্দে মাতরম-এর পুরো ছ’স্তবকই গাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ফলে যদি কেউ ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে গাইতে না চায় তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবে সরকার।
লক্ষণীয় বিষয় হলো মোদী সরকার সচেতন ও পরিকল্পিতভাবে ধর্মীয় বিরোধ চাগিয়ে তুলতে জাতীয় সঙ্গীত জনগণমন-কে আড়াল করে জাতীয় গান বন্দে মাতরম নিয়ে বাজার গরম করার আয়োজন করেছে। জাতীয় সঙ্গীতকে কার্যত গুরুত্বহীন করে দিয়ে বন্দে মাতরমকে সামনে হাজির করছে এবং সর্বত্র আগে দীর্ঘক্ষণ ধরে পুরো বন্দে মাতরম গাওয়া নির্দেশ দিয়েছে। জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হবে পরে অল্প সময়ের জন্য। এতে জাতীয় সঙ্গীতের অবমাননা হচ্ছে কিনা প্রশ্ন উঠতেই পারে। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী সকল ভারতবাসী যাতে হিন্দু দেবদেবীর বন্দনা সহ পুরো বন্দে মাতরম গাইতে বাধ্য হয় সেই জন্য আইন সংশোধন করে সাজা দেবারও বন্দোবস্ত করা হয়।
এখন গুরুতর প্রশ্ন হলো এই আইনের সাংবিধানিক বৈধতা আগে একটা ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কি অন্য ধর্মাবলম্বী ভারতীয়দের হিন্দু দেবদেবী বন্দনা করতে বাধ্য করতে পারে? সংবিধান কি সেই অধিকার কোনও সরকারকে দিয়েছে। ভারতের সংবিধান তার সকল নাগরিককে যেমন স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্মাচরণের অধিকার দিয়েছে এবং ধর্ম পরিচয়হীনভাবে থাকার অধিকার দিয়েছে। এদেশে সকলেরই বাক্‌ স্বাধীনতা, মত প্রকাশের অধিকার আছে। অন্তরাত্মার স্বাধীনতা, সমতা, অধিকার আছে। কোনও মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি, শিখ-কে সরকার বাধ্য করতে পারে না হিন্দু দেবদেবীর বন্দনা করতে। তাই স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রনেতা ও জাতীয় নেতারা সবদিক বিচার বিশ্লেষণ করে ঐকমত্যের ভিত্তিতে জনগণমন-কে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে বেছে নিয়েছেন। আর বন্দে মাতরম-এর প্রথম দুই স্তবক গাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মোদী সরকার কার্যত সংবিধানকে অস্বীকার করে ধর্মীয় অস্থিরতা তৈরির আয়োজন করেছে। যার বিরুদ্ধে মামলায় দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট পর্যবেক্ষণ হলো বন্দে মাতরম না গাওয়া কোনও অপরাধ নয়। কেউ যদি গাইতে না চান গাইবেন না। তাই বলে তার বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। জেল-জরিমানার তো প্রশ্নই নেই।

Comments :0

Login to leave a comment